আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকেই কখনও ভেবেছেন, চুলগুলো এত কোঁকড়ানো কেন? কারও মাথাভর্তি ঢেউ খেলানো চুল, কারও আবার একেবারে কুণ্ডলী পাকানো কার্ল। আবার অনেকে সোজা চুলকে কোঁকড়ানো করতে বা কোঁকড়ানো চুলকে সোজা করতে পার্লারে ছুটে যান। কিন্তু চুলের এই স্বাভাবিক গঠন বদলানো এত সহজ নয়।
কারণ, চুল সোজা হবে নাকি কোঁকড়ানো তার সিদ্ধান্ত অনেকটাই হয়ে যায় জন্মের সময়ই। আর এই রহস্য লুকিয়ে রয়েছে চুলের বাইরের অংশে নয়, বরং ত্বকের গভীরে থাকা হেয়ার ফলিকল বা কেশকূপে।
চুলের গোড়াতেই লুকিয়ে আসল রহস্য
অস্ট্রেলিয়ার গবেষকেরা জানিয়েছেন, চুলের আকৃতি নির্ভর করে হেয়ার ফলিকলের গঠন ও বৈশিষ্ট্যের ওপর।
ত্বকের নিচে থাকা কেশকূপ থেকেই চুল তৈরি হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। সেই ফলিকল যদি সোজা ও লম্বাটে হয়, তাহলে সাধারণত চুলও সোজা হয়। আর ফলিকল যদি বাঁকানো বা অসম আকৃতির হয়, তাহলে সেখান থেকে বের হওয়া চুল হয় ঢেউ খেলানো বা কোঁকড়ানো।
অর্থাৎ, চুলের আকৃতি অনেকটা নির্ভর করে তার ‘জন্মস্থান’-এর ওপর। ফলিকল যেন এক ধরনের ছাঁচের মতো কাজ করে।
কেরাটিনের অসম বণ্টনেও তৈরি হয় কার্ল
তবে শুধু ফলিকলের আকৃতিই নয়, চুলের ভেতরের গঠনও গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, হেয়ার ফলিকলের এক পাশের কোষ যদি দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং অন্য পাশের কোষ তুলনামূলক ধীরে বৃদ্ধি পায়, তাহলে চুলের দুই পাশে কেরাটিন ও অন্যান্য প্রোটিনের পরিমাণ সমান থাকে না।
এই অসমতা থেকেই চুল বাঁক নিতে শুরু করে এবং তৈরি হয় কোঁকড়ানো বা ঢেউ খেলানো আকৃতি।
অন্যদিকে, ফলিকলের দুই পাশের কোষের বৃদ্ধি ও কেরাটিনের গঠন সমান হলে চুল সাধারণত সোজা হয়।
ডাইসালফাইড বন্ডের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ
চুল মূলত তৈরি হয় কেরাটিন নামের এক ধরনের প্রোটিন দিয়ে। এই প্রোটিন অণুর মধ্যে থাকে ডাইসালফাইড বন্ড নামের রাসায়নিক বন্ধন।
সোজা চুলে এই বন্ধনগুলো তুলনামূলকভাবে সমান্তরাল থাকে। কিন্তু কোঁকড়ানো চুলে এগুলো বাঁকানো ও অসম অবস্থানে থাকে। এই গঠনই চুলকে কার্ল বা কুণ্ডলী পাকানো রূপ দেয়।
জিনও ঠিক করে দেয় চুলের ধরন
চুলের আকৃতির পেছনে জিনেরও বড় ভূমিকা রয়েছে।
গবেষণায় ‘টিসিএইচএইচ’ এবং ‘ইডিএআর’ নামের দুটি জিনের কথা উঠে এসেছে, যেগুলো চুলের গঠন নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।
এর মধ্যে ‘টিসিএইচএইচ’ জিন চুল কোঁকড়ানো হওয়ার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত বলে গবেষকেরা মনে করেন। এই জিনের প্রভাবে হেয়ার ফলিকলে কেরাটিনের বণ্টন অসম হতে পারে।
অন্যদিকে, এশীয় জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে ‘ইডিএআর’ জিন তুলনামূলক বেশি সক্রিয় দেখা যায়, যা চুলের বৈশিষ্ট্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষকেরা আরও একটি জিন ‘কেআরটি৭১’-এর সন্ধান পেয়েছেন, যা কেরাটিন তৈরির সঙ্গে যুক্ত। এই জিনের সক্রিয়তা চুলের কোঁকড়াভাব এবং ঘনত্বের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তাহলে কার দোষ
কোঁকড়ানো চুল সামলাতে গিয়ে অনেকেই বিরক্ত হয়ে যান। চুলে জট, পরিচর্যার ঝামেলা কিংবা স্টাইল করার সমস্যা নিয়ে অনেকেরই অভিযোগ থাকে। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, এর জন্য নিজের ভাগ্যকে দোষ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
চুলের ধরন নির্ধারণ হয় ত্বকের গভীরে থাকা ফলিকলের গঠন, কেরাটিনের বিন্যাস এবং পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পাওয়া জিনের সমন্বয়ে।
অর্থাৎ, আপনার কোঁকড়ানো চুলের আসল রহস্য লুকিয়ে আছে চুলের গোড়ায় এবং জিনের ভেতরে।