বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়, বরং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া প্রতিটি শিক্ষার্থীর মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতা, যোগাযোগ দক্ষতা ও সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তির মতো সফট স্কিল থাকতে হবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার ও ইউজিসি যৌথভাবে কাজ করছে। শিগগিরই দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সফট স্কিল উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করা হবে।
শনিবার (১ আগস্ট) ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান মিলনায়তনে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রথম বর্ষ স্নাতক (সম্মান) শিক্ষার্থীদের কেন্দ্রীয় ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. মামুন আহমেদ বলেন, “আমরা চাই, বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি জায়গায় পরিণত হোক, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু ডিগ্রি নয়, কর্মজীবনে সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাও অর্জন করবে। সে লক্ষ্যেই উচ্চশিক্ষাকে সময়োপযোগী ও প্রযুক্তিনির্ভর করা হচ্ছে।”
তিনি জানান, পর্যায়ক্রমে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়কে ডিজিটাল রূপান্তরের আওতায় আনা হবে। প্রতিটি ক্যাম্পাসে নিরবচ্ছিন্ন ওয়াই-ফাই সুবিধা নিশ্চিত করে প্রথমে ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ, পরে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ক্যাম্পাস গড়ে তোলা হবে। এতে দেশের শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক জ্ঞান, গবেষণা ও শিক্ষার সঙ্গে আরও সহজে যুক্ত হতে পারবেন।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাতন্ত্র্যের কথা তুলে ধরে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, আধুনিক শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং ইসলামী মূল্যবোধের সমন্বয়ের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশের উচ্চশিক্ষায় একটি বিশেষ অবস্থান তৈরি করেছে।
নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মেধার পাশাপাশি নিয়মিত পরিশ্রম ও চর্চার কোনো বিকল্প নেই। পরিবার, সমাজ ও দেশের প্রতি দায়িত্বশীল থেকে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। সরকার ও ইউজিসি এমন শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কাজ করছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ পরিবেশে আত্মমর্যাদার সঙ্গে পড়াশোনার সুযোগ পাবে।
বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপের পরিকল্পনা
উচ্চশিক্ষাকে কর্মসংস্থানের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান ইউজিসি চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, সরকারি, বেসরকারি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। পাশাপাশি তা আর্থিক সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার আগেই শিক্ষার্থীদের বাস্তব কর্মপরিবেশ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনূর রহমান ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদারে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, স্থায়ী স্টেডিয়াম নির্মাণ, সংযোগ সড়ক সংস্কার এবং শিক্ষক সংকট নিরসনে দ্রুত জনবল বরাদ্দের জন্য ইউজিসির সহযোগিতা কামনা করেন।
ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যুক্ত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন। বিশেষ অতিথি ছিলেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় জোর
অনুষ্ঠানে ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, সরকার দক্ষতাভিত্তিক ও কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে। এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে তরুণদের অধিকার, কর্মসংস্থান বা বৈষম্যের প্রশ্নে আর কোনো জুলাই আন্দোলনের প্রয়োজন হবে না।
তিনি জানান, নতুন শিক্ষা কাঠামো হবে দক্ষতাভিত্তিক, কর্মমুখী এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদাসম্মত। চাকরির পাশাপাশি উদ্যোক্তা তৈরিতেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, সামার স্কুল, ফ্যাকাল্টি এক্সচেঞ্জ, ইন্টার্নশিপ, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকর সংযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল, সৃজনশীল শিল্পের জন্য ৮০০ কোটি টাকার বরাদ্দ, বিদেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে ঋণসহায়তা এবং ৫০ হাজার শিক্ষার্থীকে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, শিক্ষা সংস্কার, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে দেশের তরুণরাই ভবিষ্যৎ উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।