জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, জনগণের ভেতর ক্ষমতা, আধিপত্য ও সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীকে প্রত্যাখ্যানের যে শক্তি, সেই শক্তি সংস্কৃতিচর্চা থেকে আসবে। কারণ সাংস্কৃতিক লড়াই সব লড়াইয়ের ভিত্তি।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের উদ্যোগে লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের জাতীয় কনভেনশনে তিনি এসব কথা বলেন। ‘কণ্ঠে মোদের কুণ্ঠাবিহীন নিত্যকালের ডাক’ এই প্রতিপাদ্য নিয়ে প্রায় ৪৫ জেলা থেকে প্রায় ৫৫০ জন সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি এই কনভেনশনে যুক্ত হন।
গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহ্বায়ক জামশেদ আনোয়ার তপনের সভাপতিত্বে এবং সদস্যসচিব মফিজুর রহমান লালটুর সঞ্চালনায় জাতীয় কনভেনশনের কার্যক্রম শুরু হয় গণসঙ্গীত, কবিতা আবৃত্তি ও প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের পাহাড়ি নৃত্য পরিবেশনার মধ্য দিয়ে।
আনু মুহাম্মদ বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতিকর্মীদের লড়াইয়ের তাগিদে এই কনভেনশন ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের লড়াইয়ের ভিত্তি তৈরি করে।
তিনি বলেন, “আমরা খেয়াল করি আর না করি, এই লড়াই চলছে। এই লড়াই শুধু মাঠে-ময়দানে হয়, তা নয়। এই লড়াই চায়ের দোকানে, পত্রিকায়, ফেসবুকে হয়। এই লড়াই চিন্তার লড়াই, চৈতন্যের লড়াই। অনেক উচ্চশিক্ষিত লোক পাবেন, যারা বলবেন—‘মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি ভালো, বন্দর বিদেশিদের দেওয়া উচিত, ফুলবাড়িতে উন্মুক্ত কয়লা তোলা উচিত।’ এই বলা একটি দাসত্বের সংস্কৃতি। যারা জনগণের পক্ষে, আধিপত্য ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, তারাও তো একটা সাংস্কৃতিক অংশ।”
তিনি বলেন, “নারীর জীবন কেমন হওয়া উচিত, নারী ঘরে থাকা উচিত, নাচ ভালো না, অন্য ধর্মের মানুষ খারাপ, অন্য জাতির মানুষ নিম্নমানের, বাংলা জাতি শ্রেষ্ঠ—এই চিন্তাগুলো সাম্প্রদায়িক চিন্তা। এর একটি মতাদর্শিক ভিত্তি আছে। এর বিরুদ্ধে লড়াই প্রতিদিনের লড়াই। শিল্পচর্চার মধ্য দিয়েও এই লড়াই হয়। গ্রাফিতি কিংবা গানের মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সমাবেশিত হয়েছিল সৃজনশীল তৎপরতা। সংস্কৃতির শক্তি ছিল। অথচ এরপর একটি অংশ দাঁড়ালো—তারা এই সৃষ্টির বিরুদ্ধে, শিল্পের বিরুদ্ধে, নারী ও যেকোনও জাতির বিরুদ্ধে। তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করা হয় রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষ থেকে। একটা গোষ্ঠী ফোন করলে পুলিশ এসে যেকোনও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দেয়।”
আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, জনগণের ভেতর ক্ষমতা, আধিপত্য ও সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীকে প্রত্যাখ্যানের যে শক্তি, সেই শক্তি সংস্কৃতিচর্চা থেকে আসবে।
দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি বলেন, ১৯৯৪ সালে লেখক-শিল্পীদের একটি কনভেনশন হয়েছিল ব্লাসফেমির বিরুদ্ধে। জামায়াত তখন এই ব্লাসফেমি নিয়ে ফতোয়া দিয়েছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ-জামায়াতের ঐক্য তৈরি হলো।
তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ লেখক-শিল্পীদের দমন করেছে, তাদের সংগঠনগুলোকে ধ্বংস করেছে। গণঅভ্যুত্থানে দেখেছি সেই সাংস্কৃতিক সংগঠনকে শক্তিশালী হতে। তাই লড়াইয়ের শক্তি আকাশ থেকে আসে না, জমিন থেকেই আসে।
তিনি বলেন, “তবে আমি মনে করি, এই লড়াইয়ে যত বৈচিত্র্যের ঐক্যকে শক্তিশালী করা হবে, ততই লিঙ্গ, শ্রেণী, জাতিগত শোষণ দূর হবে। সংগ্রাম শক্তিশালী হবে। বাংলাদেশের মানুষ লড়াই দিতে ও জীবন দিতে কার্পণ্য করে না। আমাদের ইতিহাস প্রতিরোধের ইতিহাস, আমাদের ইতিহাস প্রত্যাশাভঙ্গেরও ইতিহাস। প্রতিরোধের ইতিহাসকে বিনির্মাণ করতে সাংস্কৃতিকর্মীদের আরও সংগঠিত ও সক্রিয় হওয়া দরকার।”