প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) একটি সম্মেলনে অংশ নিতে ভারতের রাজধানী দিল্লির উদ্দেশে রওনা হন রবিবার। কিন্তু দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার সঙ্গে ঘটে যায় এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। পাসপোর্ট ও ভিসা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ইমিগ্রেশনে প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় তাকে। অপেক্ষার প্রহর শেষ না হওয়ায় পাসপোর্ট ফেরত নিয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন। এ ঘটনায় দুই দেশেই চলছে তোলপাড়। এখন প্রশ্ন উঠেছে যে, এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কেমন প্রভাব পড়বে, কিংবা আদৌ পড়বে কিনা?
আবারও আলোচনায় সম্পর্কের সমীকরণ
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক স্থবির হয়ে পড়ে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সম্পর্কের উন্নতি হয়নি বিন্দুমাত্র। শীতল সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে দেশে নির্বাচনের আগে গিয়ে। নির্বাচনকে ঘিরে ভারতের বার্তা অনেকটা সম্পর্ক রিসেট করার ছিল। এজন্য দিল্লি এগিয়ে এসে বিএনপি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা দেয়।
দুই দেশের মধ্যে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং সম্পর্কের উন্নতি ছিল মূল কূটনৈতিক বার্তা। কিন্তু তার মধ্যেও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সমীকরণ নিয়ে বারবার হচ্ছে আলোচনা। সীমান্তে হত্যা, পুশইন ইস্যুতে উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই দেশে আসেন ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। তার ‘দুই শক্তি এক করার’ বক্তব্য নিয়েও হয়েছে ব্যাপক সমালোচনা। যখন শীতল সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার পথ খুঁজে নিচ্ছিল— তখনই আবারও সম্পর্কের সমীকরণ নিয়ে হিসাব কষতে হচ্ছে দিল্লি বিমানবন্দরে ড. জাহেদের সঙ্গে হওয়া হেনস্তার ঘটনাকে ঘিরে।
দিল্লি বিমানবন্দরে কী হয়েছিল
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান রবিবার (১৪ জুন) দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে হেনস্তার শিকার হন। ইমিগ্রেশনে প্রায় আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকার কারণে তিনি প্রবেশ না করে কলম্বো হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন।
সরকারের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং দিল্লিতে কূটনৈতিক সূত্র জানায়, দিল্লি বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে সাধারণ পাসপোর্টেই প্রবেশ করতে গিয়েছিলেন তথ্য উপদেষ্টা। তার কাছে প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা হিসেবে কূটনৈতিক পাসপোর্ট থাকার কথা থাকলেও তিনি নেননি। ভারতে প্রবেশের তালিকায় তার বর্তমান পাসপোর্ট রেস্ট্রিক্টেড করা আছে— যার কারণে প্রবেশের সময় উপদেষ্টাকে আটকে দেওয়া হয়।
জানা গেছে, ইমিগ্রেশনে দীর্ঘ সময় ড. জাহেদকে বসিয়ে রেখে নানা বিষয়ে জেরা করা হয়। এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে তিনি পাসপোর্ট ফেরত চান। কিন্তু হেনস্তার শিকার হওয়াতে উপদেষ্টা জাহেদ দিল্লিতে প্রবেশ করেননি। এই ঘটনায় দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তারাও দীর্ঘ সময় ধরে বিমানবন্দরে অবস্থান করেন।
সূত্র জানায়, উপদেষ্টা জাহেদের বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে যোগাযোগ করা হয়। পরিচয় নিশ্চিতের পর ড. জাহেদকে ইমিগ্রেশন করার অনুরোধ করা হয়, কিন্তু তিনি না করে দেশে সরকারের উপরমহলের সঙ্গে কথা বলে ফেরত আসার সিদ্ধান্ত নেন। আজ সোমবার সকালে তিনি ঢাকায় এসে পৌঁছান। তবে বিমানবন্দরে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনও কথা বলেননি।
ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব
ড. জাহেদের সঙ্গে হওয়া হেনস্থা নিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার (ডেপুটি হাইকমিশনার) পাওয়ান বাঢ়েকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছে। তলব করে দিল্লি বিমানবন্দরের ঘটনার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা। এছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক উইং এই ঘটনার বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছে। বিস্তারিত তথ্যের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
এছাড়া এই ঘটনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মনে করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
প্রকৃত ঘটনার ওপর নির্ভর করে সম্পর্ক কোনদিকে যেতে পারে
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দিল্লি বিমানবন্দরে এমন ঘটনা কাম্য নয়। তবে প্রটোকল মেনে সবকিছু পালন করা হলেও যদি এমন ঘটনার জন্ম নেয়, তাহলে দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ থাকে। তবে এখনই তা অনুমান করা যাবে না।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এমন ঘটনা যদি নিয়মিত হয়, তাহলে তাহলে বুঝতে হবে— দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে প্রভাব পড়ছে। এখন হঠাৎ একটা ঘটনা ঘটেছে, এর পেছনে কতগুলো অসঙ্গতিপূর্ণ কারণও মিলছে, সরকারের প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার একজন ব্যক্তির যাওয়ার ব্যাপারে কতটুকু সমস্যা হয়েছিল তা নিয়ে। সুতরাং সেখানে আটকও হতে পারেন, আবার অন্য কিছু হতে পারে। সুতরাং, এটা অস্বাভাবিক কিছু না, এটাকে ওইভাবে দেখাটা ঠিক হবে না। এছাড়া ড. জাহেদের একটা বিষয় হচ্ছে, তিনি নানা সময় বিভিন্ন কথাবার্তা বলেছেন। সে কারণে অনেকেই হয়তো তাকে পছন্দ করে না। ’’
তিনি বলেন, ‘‘এখানে কারও ব্যক্তিগত কারণ থাকতে পারে। কেউ হয়তো তাকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এটার সঙ্গে দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারটা সেরকম করে দেখার সুযোগ নেই। দুই দেশের সম্পর্কের ওপরে এটা একটা বিরাট প্রভাব ফেলবে, আমি সেটা মনে করি না। তবে এমন ঘটনা কেন হয়েছে, সেটা আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে, সেটা তদন্ত করে দেখতে হবে, যাতে এরকম না হয় ভবিষ্যতে, সেটার জন্য আমাদেরকে সচেষ্ট থাকতে হবে।’’
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সফিউল্লাহ বলেন, যিনি গেলেন উনি কিভাবে গেলেন সেটা তো একটা ব্যাপার। গণমাধ্যমে অনেক কিছু আসছে, উনি সাধারণ পাসপোর্টে গেছেন, উনি ভারতের ভিসা নিয়ে যান নাই। উনি সার্ক ভিসায় গেছেন। সাধারণত যখন কোনও ভিআইপি সফরে যান, তখন তার ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটা নোট ভার্বাল দিয়ে ভিসা নিতে হয় দূতাবাস থেকে, ইন্ডিয়ার ক্ষেত্রে হাইকমিশন থেকে ভিসা নিতে হয়। ভিসা নিলে হাইকমিশন তাদের গভর্মেন্টকে জানিয়ে দেয় যে, ভিআইপি আসছেন— বাংলাদেশ থেকে কোনও একটা মিটিংয়ের জন্য। তারা তাদের সরকারকে অ্যালার্ট করে এটা জানিয়ে দেয়। আর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যেটা হয়, যখন ভিসা হয় তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমাদের সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ হাইকমিশনারকে জানিয়ে দেয় যে, মিনিস্টারের প্রোগ্রাম আছে। তখন আমাদের যে হাইকমিশন আছে দিল্লিতে, তারা ওই দেশের পররাষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানায়— একটা নোট দিয়ে ফ্লাইটে আমাদের মন্ত্রী আসবেন।
তিনি বলেন, এখন এসব ফরমালিটি উনি (উপদেষ্টা) করছেন কিনা আমি জানি না। যে স্টেপগুলা আছে ভিআইপি মুভমেন্টের এগুলো উনি করেছেন কিনা আমি জানি না। এসব পদক্ষেপ নেওয়ার পরে যদি ভারত তাকে দুই -আড়াই ঘণ্টা এয়ারপোর্ট আটকে রাখে, তাহলে বুঝতে হবে যে এটা অসৌজন্যমূলক ব্যবহার, এটা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য সহায়ক নয়। এটা বুঝিয়ে দেওয়া যে, তোমাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো না। সেজন্য তোমাকে আমরা দুই -আড়াই ঘন্টা জেরা করলাম, এরপর আটকে রাখলাম। এটা একটা সিম্বলিকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করা হয় যে, তোমার সাথে আমাদের সম্পর্ক মানে যে পর্যায়ে হওয়ার কথা, সে পর্যায়ে নাই।
সাবেক এই কূটনীতিক আরও বলেন, উনি যে ফরমালিটিজগুলো আছে সেগুলো যাওয়ার আগে কমপ্লিট করেছেন কিনা, তার ওেপর নির্ভর করে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এমন ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য কতটা ক্ষতিকর। এটা যথেষ্ট ক্ষতিকর ব্যাপার। কারণ নতুন হাইকমিশনার ডেজিগনেট কথা বলেছেন এখানে এসে, তা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে আমাদের একজন প্রতিমন্ত্রী যদি ভারতে এয়ারপোর্ট থেকে ফিরে আসেন, সেটা তো বাংলাদেশের জন্য ভারতের জন্য সম্পূর্ণ ক্ষতিকর, নাজুক একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করার মতো ব্যাপার। এখন আমাদের জানতে হবে দেখতে হবে— ব্যাপারটা খতিয়ে দেখতে হবে যে, আসলে আমাদের যিনি গেলেন, তিনি সবকিছু কাজ কমপ্লিট করে গিয়েছিলেন কিনা। যদি সবকিছু করে যাওয়ার পরেও তারা আটকায় রাখে, তাহলে বুঝতে হবে যে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য ভারত এখনও প্রস্তুত না।