যশোরের শার্শায় পূর্বশত্রুতার জেরে ঈদের ছুটিতে বাড়িতে বেড়াতে আসা এক পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে জখমের মামলার প্রধান আসামি উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোস্তফা কামাল মিন্টুকে গ্রেফতার করতে গিয়ে মবের মুখে পড়ে পুলিশ। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে বিএনপি নেতার অনুসারী ও এলাকাবাসীকে জড়ো করে পুলিশের কাছ থেকে তাকে ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) শার্শা উপজেলার শ্যামলাগাছি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে বিএনপি নেতার দাবি, মামলা ও ওয়ারেন্ট ছাড়াই পুলিশ তাকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। এ সময় এলাকাবাসী বাধা দিয়েছে।
শুক্রবার দুপুরে সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বিকালে শার্শা থানা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের যৌথ দল শ্যামলাগাছি গ্রামে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোস্তফা কামাল মিন্টুকে গ্রেফতার করতে যায়। তার বাড়ির সামনের মোড় থেকে তাকে আটক করা হয়। এ সময় মিন্টুর সমর্থকেরা গ্রামের একাধিক মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে এলাকাবাসীকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। মাইকের ঘোষণা শুনে কয়েক শ নারী-পুরুষ ঘটনাস্থলে জড়ো হয়ে পুলিশ সদস্যদের ঘিরে ফেলেন। একপর্যায়ে মব সৃষ্টি করে মোস্তফা কামাল মিন্টুকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এ ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।
এলাকার একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, গ্রামের মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয় যে, মোস্তফা কামাল মিন্টুকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তুলে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। তাকে মুক্ত করতে গ্রামবাসীকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়। এরপর কয়েক শ নারী-পুরুষ ঘটনাস্থলে জড়ো হয়ে পুলিশকে ঘিরে ফেলেন। গ্রেফতার করা হলেও জনরোষের মুখে মিন্টুকে রেখে পুলিশ চলে যায়।
মিন্টুর সমর্থকদের দাবি, পুলিশ সদস্যকে মারধরের ঘটনায় মিন্টু জড়িত নন। তাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। পুলিশ কারও প্রভাবে অবৈধভাবে তাকে গ্রেফতার করতে এসেছিল। এলাকাবাসী পুলিশের সেই কর্মকাণ্ড প্রতিহত করেছে।
যশোরের শার্শা উপজেলার শ্যামলাগাছি গ্রামের মশিয়ার রহমানের ছেলে মামুন হাসান জুয়েল বর্তমানে ট্যুরিস্ট পুলিশের সদর দপ্তরে নায়েক পদে কর্মরত। কোরবানির ঈদের ছুটিতে গ্রামে বেড়াতে এসে তিনি হামলার শিকার হন। এ ঘটনায় তার ছোট ভাই মেহেদী হাসান রয়েল গত ৪ জুন শার্শা থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও পাঁচ থেকে ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে শার্শা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও শ্যামলাগাছি গ্রামের আবদুল মজিদের ছেলে অ্যাডভোকেট মোস্তফা কামাল মিন্টুকে। অন্য আসামিরা হলেন মিন্টুর ভাই লাল্টু হোসেন ও পিন্টু হোসেন, আবদুস সালামের ছেলে সুজন হোসেন ও সবুজ হোসেন এবং আলাউদ্দিনের ছেলে টিটন হোসেন।
এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, গত ২৯ মে বিকেল সোয়া ৪টার দিকে মামুন হাসান মোটরসাইকেলে করে বাড়ি থেকে শার্শা বাজারে যাচ্ছিলেন। পথে শ্যামলাগাছি গ্রামের হাবিবের চায়ের দোকানের সামনে পৌঁছালে আসামিরা পূর্বশত্রুতার জেরে তার গতিরোধ করেন। পরে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে তাকে বেধড়ক মারধর করে আহত করা হয়।
এদিকে, পুলিশ সদস্য মামুন হাসান কর্মস্থলে থাকলেও গ্রামে থাকা তার পরিবারের সদস্যদের নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আসামিদের ভয়ে পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে থাকতে পারছেন না। শুক্রবার দুপুরে শ্যামলাগাছি গ্রামে তাদের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি। বাড়ির প্রধান ফটকে তালা ঝুলতে দেখা যায়।
মামুন হাসানের ছোট চাচা সফিয়ার রহমান বলেন, তার ভাইয়ের বালুর ব্যবসা ছিল। প্রায় ১৫ লাখ টাকা মূল্যের উত্তোলিত বালু ছিল। ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর আসামিরা সেই বালু বিক্রি কিংবা সরিয়ে নিতে দেয়নি। তারা ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিল। পরে ২ লাখ টাকা দিতে রাজি হলেও বালু বিক্রি করতে দেওয়া হয়নি। এ কারণে তারা ক্ষুব্ধ ছিল। ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে গেলে মামুন হাসানের সঙ্গে শার্শা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লিটনের দেখা হয়। সেখানে বালু বিক্রিতে বাধা দেওয়ার বিষয়টি তিনি জানান। তার পাশে থাকা কেউ বিষয়টি মিন্টুকে জানিয়ে দেয়। এরপর ক্ষুব্ধ হয়ে আসামিরা তাকে মারধর করে বলে দাবি করেন তিনি।
সফিয়ার রহমান বলেন, মামলা হওয়ার পর পুলিশ মিন্টুকে গ্রেফতার করতে গেলে আসামিরা তাদের পরিবারের ওপর আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এতে পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কে রয়েছেন এবং বাড়িতে থাকতে পারছেন না।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোস্তফা কামাল মিন্টু বলেন, পুলিশ সদস্যকে মারধরের ঘটনায় তিনি জড়িত নন। তাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ফাঁসানো হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। ওয়ারেন্ট ছাড়াই পুলিশ জোরপূর্বক তাকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় এলাকাবাসী জড়ো হয়ে তাকে মুক্ত করে। সুনির্দিষ্ট মামলা ও ওয়ারেন্ট ছাড়া পুলিশের এমন আচরণ অপেশাদার বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার দাবি, পুলিশ প্রভাবিত হয়ে তাকে গ্রেফতার করতে এসেছিল।
শার্শা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, পুলিশ সদস্যকে মারধরের ঘটনায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে। ওই মামলার প্রধান আসামি মোস্তফা কামাল মিন্টু। তাকে গ্রেফতারের সময় মব সৃষ্টি করে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।