ঢাকাSaturday , 27 June 2026
  1. অন্যান্য
  2. আবহাওয়া
  3. খেলা
  4. চাকরি
  5. জীবনযাপন
  6. তথ্যপ্রযুক্তি
  7. প্রেস রিলিজ
  8. বাণিজ্য
  9. বাংলাদেশ
  10. বিনোদন
  11. বিশ্ব
  12. ভিডিও
  13. মতামত
  14. রাজনীতি
  15. শিক্ষা
আজকের সর্বশেষ সবখবর

গণহত্যার দিনলিপি : ইরান, ২০২৬ ।। শেষ পর্ব

UttorbongoBD
June 27, 2026 11:05 am
Link Copied!


১০ জানুয়ারি ২০২৬ 

সকালে আমি অফিসের দিকে রওনা দিই। একজন ছাড়া বাকি মোটরবাইক কুরিয়াররা আগেই সেখানে ছিল। তারা জানায়, লোকটির ছোট ভাই, যার বয়স মাত্র ষোলো, তাকে আগের রাতে কারাজের ফারদিস থেকে গ্রেপ্তার করে প্রাপ্তবয়স্কদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে; সে তার কোনো খবর পাওয়া যায় কিনা তা দেখতে সেখানে গেছে। মি. শ(Sh) নিজাম আবাদে কী ঘটেছিল তা বর্ণনা করেন। তিনি আমাদের জানান, তাদের এলাকার তিনজন যুবক বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে; ভাহদাত পুলিশ স্টেশনের ছাদ থেকে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর কারণে সেখানে লোকজন হামলা চালিয়েছিল। তিনি বলেন, জীবনে এত ছোরা তিনি কখনো দেখেননি, শাসকগোষ্ঠীর বাহিনী তাদের হাতে যা কিছু ছিল তা দিয়েই লোকজনকে থামাতে এসেছিল। তিনি বলেন, “শুক্রবার তারা আর লোকজনকে বাইরে জড়ো হতে দিচ্ছিল না, কিন্তু তারপরেও বাড়ির জানালায় গুলি চালাচ্ছিল। আমাদের শেষ করে দেওয়ার জন্য তারা ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছিল। পর্দা টেনে দিয়েছিল, যাতে নীরবে আমাদের হত্যা করতে পারে।” 

অফিসে কেউই ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না। ইন্টারনেট নেই, আর সবাই শুধু এক ঘর থেকে আরেক ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রত্যেকেই নিহতদের ব্যাপারে নতুন নতুন খবর নিয়ে আসছে। অফিসের সেক্রেটারি বাড়ি চলে যায়; সে শুনেছে যে কেরমানশাহে তার পরিবারের সদস্যরা নিহত হয়েছে। কতজন? সে নিশ্চিত নয়; শুনেছে প্রায় পাঁচজন।
আমি আমার মাকে ফোন করি। তিনি প্রায় কথা বলতে পারছিলেন না, কিন্তু জানালেন যে গত রাতে ইসলামশাহরের ইমাম হোসেইন টাউনে তাদের ভবনের দারোয়ানের ছেলেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

আমার মা বলেন, “মিসেস বি(B) বলেছেন যে মর্গের অবস্থা ভয়াবহ। মিসেস বি(B)-র ভাই, যিনি একজন ডাক্তার, তিনি গত রাতে তাদের হাসপাতালে একাই তিরানব্বইটা মৃত্যু সনদে সই করেছেন। এগারোজন যুবতী। ছয়জন শিশু। বাকিরা পুরুষ, সবাই সরাসরি গুলিতে নিহত।” মা এসব কথা ফারসিতে না বলে আজেরি ভাষায় বলেন। তিনি ধরে নেন যে ফোনকলগুলো শোনা হচ্ছে, এবং সম্ভবত তিনি ভাবেন যে যারা শুনছে তারা তার মাতৃভাষা বুঝতে পারছে না। আমার মা শোকের সময়েও তার মাতৃভাষায় কথা বলেন। “বিজ চক জেফা চাকমিশিক (আমরা অনেক যন্ত্রণা সহ্য করেছি),” তিনি বললেন। “বিজ চক তাহজে মেলাতিক (আমরা ভীষণভাবে নির্যাতিত হয়েছি)।”

আমি এন(N)-কে ফোন করি। সে বলে, “গত রাতে ভিড়টা খুব ছড়ানো-ছিটানো ছিল। সেখানে কোনো পরিবার ছিল না। ভিড়টা অসংগঠিত ছিল, কিন্তু তারপরেও আশেপাশে অনেক লোক ছিল, এবং আগের রাতের তুলনায় সহিংসতা দশগুণ বেশি ছিল। লাঠি বা ছররা গুলি আর নেই। এবার সরাসরি আসল গুলি চালানো হয়েছিল।”
তারা সিরিয়া থেকে ভালোভাবে শিখেছে এবং সেই শিক্ষা কাজে লাগাচ্ছে।

এম(M) বলেন, “হ্যাঁ, ঠিক হোমস গণহত্যার মতোই। একমাত্র পার্থক্য হলো, তারা মানুষের ওপর ব্যারেল বোমা ফেলেনি। আমি নিশ্চিতভাবে বলছি যে, গত রাতে তারা হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। আমি নিজে মাত্র এক ঘণ্টায় অন্তত দশজন যুবককে নিহত হতে দেখেছি, অথচ যা ঘটছিল তার কেন্দ্রবিন্দুতে আমি ছিলামও না।”

আমি আমার কম্পিউটার বন্ধ করি। আমি আমার বাবা-মায়ের বাড়ির দিকে রওনা দেই। প্রচণ্ড ঠান্ডা আবহাওয়ার ভুয়া অজুহাতে স্কুলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও বন্ধ। আমি দেখি মা দরজার কাছে অপেক্ষা করছেন। তার কাছে আরও দুঃসংবাদ আছে। পাশের ভবনের দারোয়ানের এক আত্মীয়ের ছেলে ইসলামশাহরের ভাভান শহরে নিহত হয়েছে। পরিবারটি সম্প্রতি একটি গ্রাম থেকে সেখানে এসেছিল। মা বলেন, তাদের নিজেদের বিল্ডিংয়ের দারোয়ান বিল্ডিং ম্যানেজারের সাথে কাহরিজাক মর্গে গেছেন। তারা শুনেছেন যে কালো প্লাস্টিকের প্যাকেটে মোড়ানো তরুণদের একের পর এক লাশ স্তরে স্তরে সাজিয়ে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। তারা গেটে হিমায়িত আঠারো চাকার ট্রাক দেখেছেন। তারা কোনো উত্তর পাননি, খালি হাতে ফিরে এসেছেন।

আমি আমার মাকে কয়েকজন আইনজীবীর ফোন নম্বর দেওয়ার চেষ্টা করি, যাতে তিনি সেগুলো বুড়ো দারোয়ানকে দিয়ে দেন। আমার মা বলেন, “নম্বরগুলো একটা কাগজে লিখে রাখো। এখন তাদের অভিযোগ দায়ের করার বা ন্যায়বিচার চাওয়ার মতো অবস্থা নেই। ছেলেটা সবেমাত্র তার বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা শেষ করেছে; এমনকি সে এখনো তার সার্টিফিকেটটাও হাতে পায়নি। এই মুহূর্তে, ওরা শুধু তার লাশটা ফেরত পাওয়ার আশা করছে।”

আমি বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নিই। কয়েক মাস আগে ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার পর, হঠাৎ করে আমার একটা সিগারেটের তীব্র নেশা চাপল। কিছু কেনার জন্য আমি আমার বাবা-মায়ের পাড়ার মুদি দোকানে থামি। দোকানদারকে শুভেচ্ছা জানাই। সেও দারোয়ানের নিহত ছেলের কথা শুনেছে। তিনি বলেন, “গত রাতে সাত্তার খান স্ট্রিটে ওরা অনেককে মেরেছে। দরিয়ানি সুপারমার্কেটের দুটি শাখার মালিককে হত্যা করা হয়েছে। তেহরানের পূর্বে শিলা রেস্তোরাঁর একটি শাখার মালিক, আমাদের পরিবারের একজন সদস্যকেও হত্যা করা হয়েছে। তার লাশ শাসকগোষ্ঠী নিয়ে গেছে।” আমি সিগারেট কিনে গাড়িতে বসি। আমি ইচ্ছাকৃতভাবে ধীরে গাড়ি চালাই। ভ্যালি-এ আসর স্ট্রিট জুড়ে বিশেষ বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। বিক্ষোভকারীদের কিছু বিক্ষিপ্ত দল মূল রাস্তার দিকে হেঁটে যাচ্ছে, কিন্তু দমনকারী বাহিনীর সংখ্যা এত বেশি যে আজ রাতে কোনো সুসংগঠিত প্রতিবাদী দল গঠন করা সম্ভব নয়।
সূর্যাস্তের কাছাকাছি সময়ে এন(N) আমাদের এখানে এসে পৌঁছায়। সে খবর দেয় যে সাদেকিয়েহ, নাসিমশাহর, ইসলামশাহর, ঘা’মিয়েহ শহর এবং বাহরামাবাদ থেকে আঠারো বছরের কম বয়সী অনেক শিশুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সে বলে, শিশুদের প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্ধারিত ফাশাফুয়েহ কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এন(N) বলে,“যেকোনো মুহূর্তে ফাঁসি কার্যকর করা শুরু হয়ে যাবে।” 

এন(N) আমাদের বাড়িতে একজন স্যাটেলাইট মেকানিককে ফোন করে, যাতে আমরা হয়তো বিবিসি ফার্সি টেলিভিশন চ্যানেল থেকে কিছু খবরাখবর পেতে পারি। আমি আমার মাকে ফোন করি, যিনি আবারও তাঁর মাতৃভাষায় কথা বলতে শুরু করেন। তার মানে, তিনি কোনো ভালো খবর দিচ্ছেন না। “ওরা দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করেছে যে তার ছেলের লাশ ফেরত পাওয়ার জন্য শত শত মিলিয়ন তোমান দেওয়ার মতো টাকা তার কাছে আছে কি না। সে ‘না’ বলেছে। তারপর ওরা বিল্ডিং ম্যানেজারের কাছে গিয়ে বলেছে যে, লাশটা ফেরত পেতে এবং সোমবার তাকে দাফন করার জন্য পরিবারকে গিয়ে একটি বিবৃতিতে সই করতে হবে যে, ওই যুবক সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ছিল। পরিবার তাতে রাজি হয়ে গেছে।” আমার বাবা-মা সোমবার ওদের সাথে কবরস্থানে যেতে চান। আমি বলি আমিও যেতে চাই। আমার মা সঙ্গে সঙ্গে ফার্সিতে কথা বলা শুরু করেন, “এসবের কথা ভুলেও বলো না,” এবং ফোনটা রেখে দেন।

আমরা বাড়ির বাতিগুলো নিভিয়ে দিই। এখনো রাত দশটা বাজেনি, কিন্তু আমরা ঘুমানোর চেষ্টা করতে চাই, যদিও আমরা জানি যে সম্ভবত আমরা ঘুমাতে পারব না। আমার স্বামী, যিনি রাজনীতির খুব একটা খোঁজখবর রাখেন না, তিনিও গতকাল পাহলভীর সেই আহ্বানের কথা শুনেছেন, যেখানে তিনি জনগণকে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনগুলো দখল করে নিতে বলেছেন। তিনি ভাবেন, “মানুষ খালি হাতে কী করবে? উনি কি জানেন না এই শাসনব্যবস্থা কতটা বর্বর?”

আমি বলি,“আমি চাই খামেনিকে জীবিত অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হোক, যেমনটা মাদুরোর ক্ষেত্রে করা হয়েছিল বলে অনেকে আলোচনা করে। আর অন্য কোনো পথ দেখি না।”
তিনি জবাব দেন,“তুমি সরাসরি বিদেশি সামরিক হামলার পক্ষে বলতে লজ্জা পাচ্ছ; তাই ঘুরিয়ে মাদুরোর কৌশলের কথা তুলছ”
আমরা আর কোনো কথা বাড়ালাম না।

১১ জানুয়ারি ২০২৬

আমি সারাদিন ঘুমিয়ে কাটাই। আমি বাচ্চাদেরকে আমার স্বামীর সাথে তাদের দাদা-দাদির কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। সারাদিনের মধ্যে আমি একবারের জন্যও ঘরের বাতিগুলো জ্বলাইনি।

১২ জানুয়ারি ২০২৬

দুপুরেই আমরা অফিস বন্ধ করে দিই। একজন ক্লায়েন্টও আসেনি। আমি আমার বাবা-মায়ের বাসার দিকে রওনা হই। বিকেল প্রায় চারটা বাজে, অথচ তারা এখনো কবরস্থান থেকে ফিরে আসেননি। তারা ভবনের ম্যানেজার আর সেই বৃদ্ধ দারোয়ানের সাথেই গেছেন। আমি চা বানানোর জন্য চুলায় পানি বসিয়ে দিই। আমি হাজারতম বারের মতো সরকারের নিজস্ব ‘ফার্স নিউজ এজেন্সি’র ওয়েবসাইট চেক করি। এখন তারা কোনো রকম লজ্জা ছাড়াই স্তূপ করে রাখা লাশের ছবি প্রকাশ করছে; বলছে যে সন্ত্রাসীরা এসে মানুষকে হত্যা করেছে, এসবই নাকি বিপ্লব-বিরোধী শক্তির কাজ, এর পেছনে ইসরায়েলের হাত রয়েছে। লাশগুলো প্রদর্শন করা থেকে কোনো কিছুই যেন তাদের থামাতে পারছে না। একটি ছবির প্রতিবেদনে ফরেনসিক মেডিসিন সংস্থার সাইলোতে স্তূপ করে রাখা অসংখ্য লাশের স্তূপ দেখানো হচ্ছে। সামনের উঠোন থেকে আসা শব্দ শুনে আমি বুঝতে পারি যে আমার বাবা-মা ফিরে এসেছেন। সবাই ভবনের সামনে বসে আছে। ধুলোবালি মাখা, বিধ্বস্ত এবং স্তব্ধ। আমার খুব লজ্জা লাগে যে আমার বাবা-মায়ের এই বৃদ্ধ দারোয়ানের পারিবারিক নামটা (পদবি) আমি জানি না। ভবনের ম্যানেজার কান্নায় ভেঙে পড়েন। গতকাল তারা দারোয়ানকে তার ছেলের লাশ শনাক্ত করার জন্য একা ওই গুদামঘরের ভেতর যেতে বলেছিল। ম্যানেজার জোর করে দারোয়ানের সাথে ভেতরে ঢুকেছিলেন। তিনি বললেন, “সাতশো লাশ, আটশো লাশ—না, সংখ্যাটা তার চেয়েও অনেক বেশি ছিল। যেসব লাশ শনাক্ত করা গেছে, প্লাস্টিকের কভারের পায়ের দিকে তাদের নাম সেঁটে একপাশে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল; আর অন্যপাশে ছিল বেওয়ারিশ লাশগুলো। আমরা ২৫ নম্বর কভারে দারোয়ানের ছেলেকে খুঁজে পাই। তাকে চাঁদের মতো ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল। ঠিক চাঁদের মতো। শরীর থেকে এত রক্ত ঝরে গিয়েছিল যে তার মুখে আর কোনো রঙের আভা অবশিষ্ট ছিল না।”

বৃদ্ধ দারোয়ান সরকারের শর্ত অনুযায়ী সব প্রয়োজনীয় কাগজে স্বাক্ষর করে দিয়েছেন; তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে ১০ জনেরও কম মানুষের উপস্থিতিতে দাফনকাজ সম্পন্ন করবেন।
আমার মা বললেন, “বেহেশত-ই জাহরা কবরস্থানের দৃশ্যটা দেখতে বাম(Bam) ভূমিকম্পের দিনগুলোর মতো লাগছিল। আমি কেবল সেই ভূমিকম্পের সময়ই এমন দৃশ্য দেখেছিলাম। প্রত্যেকে তাদের প্রিয়জনদের—তাদের তরতাজা সন্তান, তাদের বাবা, তাদের স্ত্রীদের—কালো প্লাস্টিকের কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় সামনে নিয়ে বসে ছিল, এবং লাশবাহী গাড়িগুলো কখন এসে দাফনের জন্য নিয়ে যাবে সেই অপেক্ষায় ছিল। সেখানে উপস্থিত হাজার হাজার বিধ্বস্ত মানুষের একজনও এই দৃশ্য কখনো ভুলবে না। সবাই একে অপরের কাছে নিজেদের দুঃখের কথা বলছিল। সবাই সবার সাথে মিলে শোক প্রকাশ করছিল।

যখনই কেউ প্রিয়জনের লাশ শনাক্ত করে সেই গুদামঘর থেকে বের হচ্ছিল, তখনই অন্য সবাই এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরছিল। সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ একে অপরের বুকে মাথা রেখে অঝোরে কাঁদছিল। এই বিষয়গুলো কেউ কখনো ভুলতে পারবে না।”

বৃদ্ধ দারোয়ান ইতোমধ্যেই নিজের বাড়িতে ফিরে গেছেন। আগামীকাল তার পরিবারের সদস্যরা প্রদেশ থেকে আসবেন, যাতে সবাই একসঙ্গে শোক পালন করতে পারেন। শাসকপক্ষ তাদের হুমকি দিয়েছে—দাফন সম্পন্ন হওয়ার আগে মৃত্যুর খবর প্রকাশ করা যাবে না। বাড়ির সামনে শোকের প্রতীক হিসেবে কালো কাপড়ও টাঙানো যাবে না বলে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তার স্ত্রী কাঁদতেও পারছেন না। তিনি ছেলের সামরিক পোশাকটি সঙ্গে করে কবরস্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন। সারাদিন সেটি বুকে জড়িয়ে ধরে বসেছিলেন।

আমাদের সবারই মনে হচ্ছিল, বুধবারের মধ্যেই আমেরিকানরা এসে শাসনব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দেবে। ড. পি(P) বলেন,“ট্রাম্প বলেছেন, সাহায্য আসছে। লিংকন বিমানবাহী রণতরী রওনা দিয়েছে। বুধবার, না হয় সর্বোচ্চ শুক্রবারের মধ্যে, এই শাসনের অবসান হয়ে যাবে।”

আমি গাড়ি চালিয়ে বাড়ির পথে ফিরি। রাস্তার ওপর যেন মৃত্যুর ধুলো জমে আছে। বেশিরভাগ দোকানপাট বন্ধ। প্রচণ্ড ঠান্ডা। বাতাসও দূষিত।

১৩ জানুয়ারি ২০২৬

আমার স্ন্যাপ(রাইড শেয়ারিং অ্যাপ) গাড়ির চালক লাহিজান শহরের মানুষ। তিনি বলেন, তাদের এলাকার কয়েকজন প্রতিবেশী নিহত হয়েছেন। তার এক চাচাতো ভাই আহত হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে তাকে পাশের শহর কুচেসফাহানের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে তাকে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে—এমন পরিচয়ে ভর্তি করা হয়েছে।
চালক বলেন,“রাশত শহরে নাকি এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটে গেছে।”

১৪ জানুয়ারি ২০২৬

আমি আমাদের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো বিড়ালগুলোর পানির বাটিতে পানি ভরে দিই। হাজি খানম গত কয়েক দিন ধরে তাদের জন্য কোনো খাবার রেখে যাচ্ছেন না। ওপরে থাকা আমাদের প্রতিবেশী আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করেন, হাজি খানমের কোনো খবর জানি কি না। আমি বলি, তাদের দরজায় ঘণ্টা বাজানোর কথা ভাবছিলাম। আমরা একসঙ্গে সেদিকে যাই। সেদিন রাতে যার মাথায় আঘাত লেগেছিল, সেই ছেলেটিই দরজা খুলে দেয়। আমি তার খোঁজখবর জিজ্ঞেস করি। সে জানায়, এস(S)-এর সাহায্যে সে একটি জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্রে গিয়েছিল এবং বহির্বিভাগে অস্ত্রোপচার করিয়েছে। তার কপালের পাশ থেকে চারটি ছররা বের করা হয়েছে। তার মামা আব্বাসের মরদেহ মাশহাদে নিয়ে গিয়ে দাফন করা হয়েছে। সে বলে,“হাজির ওপর খুব কঠিন সময় গেছে। আমার বড় মামা কাহরিজাকের মর্গে গিয়ে মরদেহ শনাক্ত করার সাহস পাননি, তাই আমার বাবা গিয়েছিলেন। শত শত কাফনের ভেতর তিনি আমার মামাকে খুঁজে পান। আমরা ভেবেছিলাম, তাকে মাত্র একবার গুলি করা হয়েছিল। কিন্তু পরে দেখা গেল, তার গলাতেও একটি গুলি লেগেছিল।”তাদের পরিবারও এখনো কোনো স্মরণসভা বা শোকানুষ্ঠান আয়োজন করতে পারেনি। তার মা আপাতত মাশহাদে আছেন। ছেলেরা বাড়িতেই অবস্থান করছে। একদিকে তাদের আঘাতের কারণে, অন্যদিকে গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে তারা বাইরে যাচ্ছে না। ছেলেটি বলে,“আমরা রাজতন্ত্রপন্থী নই। কিন্তু এখন আর সেটাই মূল বিষয় নয়। এরা আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে।”
ছেলেটি বলতে থাকে: “ব্যাপারটা বেশ মজার। তোমার যে ডাক্তার বন্ধুটি হিজাব পরেন না, তিনিও রাজতন্ত্রপন্থী নন। আমি তার কাছে খুবই কৃতজ্ঞ; তিনি আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। সেদিন তাদের ক্লিনিকে অনেক লোক এসেছিল, তারা বলছিল যে তাদের দুর্ঘটনা ঘটেছে অথবা নির্মাণস্থলে লোহার রডের আঘাত পেয়েছে; তাদের সবার অপারেশন বিনামূল্যে করা হয়েছিল।”

আমি বাড়ি ফিরে এন(N)-কে ফোন করি। সে জানায় যে সে শুনেছে আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই ইন্টারনেট সংযোগ আবার চালু হয়ে যাবে। সে জিজ্ঞেস করে, আমি আসন্ন যুদ্ধের জল্পনা-কল্পনার খবরটা শুনেছি কি না।
“তোমার কি মনে হয় ওরা আমাদের আক্রমণ করবে?” আমি জিজ্ঞেস করি।
“তুমি চাও না ওরা তা করুক?” জবাবে সে আমাকে জিজ্ঞেস করে।
“আর কি কোনো উপায় বাকি আছে? তুমি ভাবো আমি ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে ভালোবাসি, কিন্তু আমি আসলে ভবিষ্যৎ কী বয়ে নিয়ে আসবে তা নিয়ে ভীত,” আমি বলি।
“তুমি কি জানো, লোকে বলছে মাত্র দুই দিনে বিশ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে? অথচ ইসরায়েল বারো দিনের যুদ্ধে মাত্র হাজার খানেকের মতো মানুষকে মেরেছিল, আর তাদের মধ্যেও অনেকে ছিল সামরিক বাহিনীর সদস্য।”

আমরা বিদায় নিলাম। আজকাল আমার আর কারও সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করে না। ইন্টারনেট আবার চালু হওয়ার কথা ভাবলেই আমি আতঙ্কে শিউরে উঠছি। আতঙ্ক হচ্ছে যখন সব ছোট ছোট শহর থেকে আর আমার বাবা-মায়ের বাড়ির দারোয়ানের মতো হাজার হাজার মানুষের কাছ থেকে একের পর এক খবর আসতে শুরু করবে। আতঙ্ক হচ্ছে ইন্টারনেট খুললেই যেসব ভিডিয়োর বন্যা বয়ে যাবে, সেগুলো দেখার। আমার কেবলই ভয় হচ্ছে যে, সেই ভিডিওগুলো দেখার পর আমি হয়তো আর স্বাভাবিক বা সুস্থ মস্তিস্কে বেঁচে থাকতে পারব না।

আমি আমার মাকে ফোন করি। তার গলার আওয়াজ শুনেই বুঝতে পারি যে তিনি কেঁদেছেন। তার নিজের পরিবারেরই দুজন তরুণকে হত্যা করা হয়েছে। একজনের বয়স ছিল সতেরো আর অন্যজনের পঁয়ত্রিশ। সেই দারোয়ানের মতোই, এদের বাবা-মাও হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি পরিবারের বাকি সদস্যদের জানাননি। দাফন শেষ হওয়ার দুদিন পর, পরিবারের অন্য এক সদস্যের স্মরণসভায় যোগ দিতে গিয়ে তাঁরা কেবল এই খবরটি জানতে পারেন। আমার মা বলেন, “ওরাও তেহরানের বাইরে থাকত। আমি কি তোমাকে বলিনি যে গরিবদের ক্ষেত্রে শাসকগোষ্ঠীর বন্দুক আরও বেশি নির্মম হয়ে ওঠে?”
“মা, ওরা সাদাত আবাদ এলাকায়, কাজ স্কোয়ারে বাবার বন্ধুর ছেলেকে মেরে ফেলেছে। তাতে ওদের কিছু যায় আসে না। আমরা সবাই ওদের কাছে কামানের খোরাক,” আমি তাকে বলি।
মা তার মাতৃভাষায় অভিশাপ দিতে লাগলেন। আমি ফোনটা রেখে দিই। আমি আর কারো সাথে কথা বলব না, নিজেকে কথা দিই। আমি এসব আর সহ্য করতে পারছি না। আমি কেন চাইব যে ইন্টারনেট আবার চালু হোক?
আমি এখন আলমারি থেকে আমাদের ওভারকোট আর দামি পোশাকের সব কালো কভার খুলে তুলে রেখেছি। আলমারিতে কালো কভার দেখতে আমার একদম ভালো লাগে না। ওগুলো আমাকে মর্গের কালো ব্যাগে মোড়ানো লাশের স্তূপের কথা মনে করিয়ে দেয়। ওগুলো আমাকে সেই গণহত্যার কথা মনে করিয়ে দেয়। এর কিছুই আমি সহ্য করতে পারি না।
পরবর্তী দিনগুলো পুরোপুরি অন্ধকার। নিস্তব্ধ।
আজ বাহমান মাসের ৩ তারিখ। গত রাত থেকে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নভাবে কোথাও কোথাও সংযুক্ত হতে শুরু করেছে। আমি জানি আমার বোন এন(N) গত কয়েকটা দিন ভীষণ উদ্বেগের মধ্যে কাটিয়েছে। কোনো খবর ছাড়া, আমাদের কারও কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে একদম সম্পূর্ণ অন্ধকারের মধ্যে ছিল সে। যখন আমার টেলিগ্রাম কানেক্ট হলো, আমি তাকে লিখলাম, “হাই।”
সে লিখল, “আমি কী বলব বুঝতে পারছি না।”
আমি লিখি, “ইন্টারনেট যখন বন্ধ ছিল, আমার কম্পিউটারে আমি কিছু জিনিস লিখে রেখেছিলাম, সেগুলো আমি তোমার কাছে পাঠাচ্ছি।”

 টীকা
১. তেহরান বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) সিস্টেম।
২. ইরানের বিখ্যাত অভিনেত্রী তারানেহ আলীদোস্তী এবং সম্প্রতি বিবিসি পার্সিয়ানে প্রচারিত একটি তথ্যচিত্রের সাক্ষাৎকারে তার দেওয়া বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
৩. আশুরার যুদ্ধে শিয়া সম্প্রদায়ের তৃতীয় ইমাম, ইমাম হোসেনের শত্রুপক্ষ।
৪. শিয়া সংস্কৃতিতে অত্যন্ত প্রতীকী তাৎপর্যপূর্ণ একটি স্থান, যেখানে শিয়াদের তৃতীয় ইমাম, ইমাম হোসেন এবং ইয়াজিদের বাহিনীর মধ্যে ঐতিহাসিক যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিল।
৫. ইরানের দুই মেয়াদের সাবেক রাষ্ট্রপতি। তাঁর প্রথম মেয়াদের জয়টি কারচুপিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়, যা অত্যন্ত বিতর্কিত ছিল এবং ২০০৯ সালের বিখ্যাত ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ (সবুজ আন্দোলন) বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।
৬. তেহরান শহরের উত্তরাঞ্চলের একটি স্কয়ার বা চত্বর। 
৭. শহরের উত্তরাঞ্চলের আরেকটি স্কয়ার বা চত্বর।
৮. ২০২২ সালে ‘মাহসা জিনা আমিনি’ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা বিক্ষোভে নিহত হওয়া একজন তরুণ আন্দোলনকারী।

মূল: ওয়ার্ল্ড লিটারেচার টুডে





Source link

×

FIFA World Cup Live

FIFA World Cup সরাসরি দেখতে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।

📺 লাইভ দেখুন
error: Content is protected !!
🔴 LIVE html