১৩ জুন কলাকেন্দ্র গ্যালারিতে শুরু হয়েছে রাগা রহমানের প্রথম একক প্রদর্শনী Unfamiliar Affinity. প্রদর্শনীটি কিউরেটিং করেছেন, শিল্পী ও কিউরেটর ওয়াকিলুর রহমান। রাগা এর আগে বেশকিছু যৌথ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন।
রাগা রহমানের জন্ম বার্লিনে। মা জার্মানি এবং বাবা বাংলাদেশি। দুই দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য এমনকি সামাজিক অবকাঠামো রাগাকে সমৃদ্ধ করেছে, যার প্রতিফলন তার কাজে স্পষ্ট।
রাগা রহমানের কাজ গবেষণানির্ভর, যার ফলস্বরূপ একটি প্রবন্ধধর্মী, মিশ্র-মাধ্যমের রূপ তৈরি হয়। তিনি টেক্সট, ভিডিয়ো, সাউন্ড, ইনস্টলেশন এবং ইমেজ নিয়ে কাজ করেন।
রাগা বলেন, ‘আমার গবেষণা কেবল অ্যাকাডেমিক নয়। বরং আমি কালেকটিং স্টোরিস, আইডিয়াস, ইমেজারি, ও অন্যান্য ভিজ্যুয়াল ম্যাটেরিয়াল সংগ্রহ করি এবং কাজের মাধ্যমকে এমন একটি উপায় হিসেবে ভাবতে পছন্দ করি, যা সংগঠিতভাবে উচ্চৈঃস্বরে চিন্তা করার মতো, তবে তা একটি কাঠামোর মধ্যে। আমি আমার চিন্তা ও পর্যবেক্ষণগুলো শেয়ার করার ক্ষেত্রে, কোনো চূড়ান্ত উত্তর দেওয়ার চেয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করাকেই বেশি গুরুত্ব দিই। অপরিচিত, অসম্পূর্ণ বা এখনো সমাধানহীন মনে হওয়া ধারণাগুলো অনুসন্ধান করা এবং পৃথিবীর জটিলতাকে বোঝার চেষ্টা করা আমার কাজের মূল দিক।’
The Sky upon Dhaka শিরোনামে ২০২৩ সালে করা তার ফটো সিরিজের কাজ আমরা এ প্রদর্শনীতে দেখতে পাই।
বাংলাদেশের ছাদ কালচারের সাথে রাগার পরিচয় ঘটে টিন-এজে। বার্লিনে জন্ম নেওয়া, বড়ো হওয়া রাগার জন্য এটা একেবারেই নতুন ধারণা। বাংলাদেশের শহুরে জীবনে ছাদ কেবল একটি স্থাপত্য-অংশ নয়, এক বিশেষ আবেগের নাম। ছাদের সাথে মিশে আছে আমাদের শৈশবের খেলাধুলা, কৈশোরের বন্ধুত্বের স্মৃতি, ছাদ-প্রেম কিংবা বৃষ্টিতে ভেজার অসংখ্য মুহূর্ত। আবার সংসার জীবনের গৃহস্থালি কাজেরই একটি অংশ হয়ে ওঠে এই ছাদ। আবেগের গণ্ডি পেরিয়ে কাপড় শুকাতে ছাদ একটি অতি ব্যবহার্য স্থানে পরিণত হয়। এই সবকিছু রাগাকে দারুণভাবে আন্দোলিত করে।
সিরিজটি ঢাকাকে ওপর থেকে দেখার একটি বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গিও নির্মাণ করে। সাধারণত ঢাকা শহরকে আমরা যানজট, দূষণ, জনঘনত্ব ও অবকাঠামোগত সংকটের ভাষায় কল্পনা করি। কিন্তু এই ফটো সিরিজ সেই পরিচিত বয়ানকে সরিয়ে দিয়ে শহরের ছাদগুলোকে এক ধরনের অন্তর্বর্তী ভূখণ্ড হিসেবে পুনরায় কল্পনা করায়। কাজটির অন্যতম শক্তি হলো ‘ছাদ’কে একটি বিকল্প সামাজিক অবকাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
প্রদর্শনীর প্রতিটি কাজ স্বতন্ত্র অভিব্যক্তি বহন করে। তার কাজগুলোতে একধরনের অনুসন্ধান, উপলব্ধি এবং শেষ অবধি নিজের বোঝাপড়ার একটা যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। প্রতিটি কাজ তার স্বতন্ত্র চিন্তার প্রতিফলন।
Log lady & Other Tales শিরোনামে ২০২৫ সালে করা ভিডিয়ো আর্টে রাগা রহমানের দূরদর্শী চিন্তার প্রকাশ পাওয়া যায়।
এই কাজটি নিয়ে রাগা জানান, ‘গত গ্রীষ্মে আমি ঘনিষ্ঠ দুইজন বন্ধুর সঙ্গে একটি গাছের নিচে বসেছিলাম। তাদের একজন নিজের লেখা একটি গান গাইতে শুরু করে। এটি ছিল এমন একটি গান যা গাছকে উদ্বেগ, শোক এবং মানসিক অস্থিরতার মুহূর্তে সুরক্ষা ও আবেগগত আশ্রয়ের প্রতীক হিসেবে কল্পনা করায়। একই সময়ে আমি Emergent Strategy বইটি পড়ছিলাম, বইটি লিখেছেন adrienne maree brown। বইটির একটি অধ্যায় আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। ব্রাউন সেখানে সামাজিক আন্দোলনের জন্য প্রকৃতিকে একটি আদর্শ হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং প্রতিরোধের বিভিন্ন পদ্ধতি শেখার ক্ষেত্রে প্রকৃতির আচরণ থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।’
Emergent Strategy-এর মূল দর্শন প্রকৃতিকে পরিবর্তনের শিক্ষক হিসেবে দেখা। বইটি দেখায়, প্রতিকূল পরিবেশে প্রকৃতির অভিযোজন, পারস্পরিক নির্ভরতা ও ক্ষুদ্র পরিবর্তনের ধারাই ব্যক্তি ও সমাজের রূপান্তরের ভিত্তি হতে পারে।
পরিবর্তনই ধ্রুবক। তাই পরিবর্তনকে এড়িয়ে না গিয়ে তার সঙ্গে স্রোতের মতো মানিয়ে চলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বইটি দেখায়, একটি আন্দোলনের শক্তি মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের গভীরতা, সহানুভূতি ও বিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল। বইটির অন্যতম মূলনীতি বা নিয়ম যা অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে।
Move at the speed of trust: মানুষের সাথে কাজ করার সময় বিশ্বাসের গতি অনুযায়ী এগোতে হবে।
Focus on critical connections more than critical mass: বৃহৎ সংখ্যার চেয়ে মানুষের সাথে গভীর ও অর্থপূর্ণ সম্পর্কের ওপর বেশি মনোযোগ দিতে হবে।
Small is good, small is all: ছোটো ছোটো ইতিবাচক পদক্ষেপ বা পরিবর্তনই একসময় বড়ো আকার ধারণ করে এবং পুরো সিস্টেমকে প্রভাবিত করে।
তিনি আরও বলেন, ‘গাছকে সংবেদনশীল ও অনুভূতিশীল সত্তা হিসেবে কল্পনা করতে করতে আমি উদ্ভিদের ভাষা নিয়ে গবেষণায় প্রবেশ করি এবং সেখানেই পরিচিত হই জগদীশ চন্দ্র বসুর সঙ্গে।
তারও আগে রবীন্দ্রনাথের একটি কোটেশন আমার অনুসন্ধানী মনে প্রেরণা জাগায়। ক্রমাগত অনুধাবন করতে থাকি এবং বুঝতে পারি, গাছ নিজেই গল্পকারে পরিণত হয়। একই সঙ্গে সত্য ও প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবেও কাজ করে।’
গাছ শুধু প্রকৃতির অংশ নয়। তারা স্মৃতি, যত্ন, প্রতিরোধ, সত্য এবং সহাবস্থানের বিকল্প ভাষার বাহক। এই কাজটি মানুষ ও অমানবিক সত্তার সম্পর্ককে নতুনভাবে ভাবতে আমন্ত্রণ জানায়। এবং সেইসাথে পাশ্চাত্যে বেড়ে ওঠা একজন শিল্পীর অনুসন্ধানী মন নিয়ে প্রাচ্যের দ্বারস্থ হওয়ার অভিভূত যাত্রা, আমাদের ভীষণভাবে নাড়া দেয়।
The Wooden Choir-২০২৬।
কল্পনাভিত্তিক সাউন্ড-গবেষণায়, ঘরের ভেতর বিভিন্ন কাঠের ডালপালা সহযোগে একটি ইনস্টলেশন।
বলা যায়, লীলাময় কল্পনার মধ্য দিয়ে গাছসদৃশ হয়ে ওঠার এক দেহায়িত অভিজ্ঞতা। গাছকে মানবরূপে কল্পনা করার মাধ্যমে এই ইনস্টলেশন, অংশগ্রহণকারীদের স্থানটির সঙ্গে শারীরিকভাবে সম্পৃক্ত হতে এবং বিকল্প উপলব্ধির ধরন কল্পনা করতে আহ্বান জানায়। এই উপাদানগুলো সম্মিলিতভাবে উদ্ভিদকে কেবলমাত্র নিষ্ক্রিয় সত্তা হিসেবে দেখার প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। একই সঙ্গে এটি গাছকে শ্রবণের মধ্য দিয়ে একটি পরীক্ষামূলক খেলাধর্মী বিকল্প অনুশীলন হিসেবে উপস্থাপন করে, যা উদ্ভিদবিদ্যা ও বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাসের ঔপনিবেশিক জ্ঞান-ঐতিহ্যের বিপরীতে এক ধরনের সমালোচনামূলক অবস্থান গ্রহণ করে।
My Body is a Blanket ২০২৩-এ করা ৫ মিনিটের ভিডিয়ো পারফরম্যান্স। এই কাজটিতে সাদা, কালো, এবং লাল তিনটি শক্তিশালী রঙের ব্যবহার দেখতে পাই। যদিও শিল্পী মনে করেন, এটা কো-ইনসিডেন্স। আমার বরং তার অন্যান্য কাজ দেখে মনে হয়েছে, তার অবচেতন মনের অনুসন্ধানী স্বভাবের ধারণকৃত প্রকাশ।
একটি কাপড় ভাঁজ করার রূপকাত্মক অঙ্গভঙ্গিকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই পারফরম্যান্সটি, প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত অভিজ্ঞতা ও আবেগের আন্তঃসম্পর্ককে উন্মোচনের চেষ্টা করে। এই কাজটি একটি অ-বাচনিক ভাষার সৃষ্টি করে এবং এমন কিছু বিষয়কে বিন্যস্ত বা সুশৃঙ্খল করার একটি প্রচেষ্টা, যা প্রকাশে শিল্পীর ভাষাভাণ্ডারে যথেষ্ট উপযুক্ত শব্দ নেই। এই শারীরিক অঙ্গভঙ্গিই এক ধরনের দেহভিত্তিক কোরিয়োগ্রাফি হয়ে ওঠে, যেখানে কাপড়ের পরিবর্তিত ভাঁজ, আকৃতি ও বিন্যাস স্ক্রিনকে এক ধরনের চলমান ক্যানভাসে পরিণত করে। এর বৃত্তাকারতা ইঙ্গিত করে যে এই অনুসন্ধানের কোনো সুস্পষ্ট শুরু বা শেষ নেই। এটি একটি অবিরাম চলমান অভিজ্ঞতা।
mosha marar jonno kaman daga (firing a cannon to kill a mosquito) রাগার এই কাজটি বিশেষভাবে মনোযোগ আকর্ষণ করে।
ঢাকার মশার উৎপাত রাগার অনুসন্ধানী মনে বিরূপ ধারণা তৈরি না করে বরং এর সাথে একাগ্রতা প্রকাশ করায়। এই ভিডিয়ো ইনস্টলেশনটি সমসাময়িক নগরজীবনের একটি দৈনন্দিন অথচ প্রায় অদৃশ্য সহিংসতা মশা নিধনের প্রযুক্তি ও তার চিত্রভাষা নিয়ে করা। এখানে মশা মারার প্রক্রিয়াকে কেবল জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখা হয়নি। এটিকে একটি পারফর্মেটিভ, প্রায় যুদ্ধ-সদৃশ নান্দনিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করা হয়েছে।
ফগিং মেশিনের ধোঁয়া, যা সাধারণত কার্যকরী নিয়ন্ত্রণের প্রতীক, এখানে একটি স্বপ্নময় ও বিভ্রমমূলক দৃশ্যপট তৈরি করে। এটি বাস্তব শহরকে আচ্ছাদিত করে এমন এক স্থান নির্মাণ করে যেখানে দৃশ্যমানতা ও অদৃশ্যতার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়। এই ধোঁয়ার মধ্যে মশা আর কেবল একটি জৈবিক প্রাণী থাকে না বরং তা এক ধরনের অদৃশ্য, প্রায় ভূতুড়ে উপস্থিতিতে রূপ নেয়।
একই সঙ্গে, মশা মারার ব্যাট এবং ফগিংয়ের শরীরী ব্যবহার ভিডিয়ো গেমের কমব্যাট লজিক এবং মার্শাল আর্টের গতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে দৈনন্দিন এই কাজটি একটি কোরিওগ্রাফিক পারফরম্যান্সে রূপ নেয়, যেখানে মানুষ, যন্ত্র এবং অদৃশ্য শত্রুর মধ্যে সম্পর্ক ক্রমাগত পুনর্গঠিত হতে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় “শত্রু”র ধারণাটি স্থির থাকে না। সেটি ক্রমশ বিমূর্ত, অদৃশ্য এবং মানসিক এক উপস্থিতিতে পরিণত হয়।
শেষ পর্যন্ত কাজটি আমাদেরকে এমন একটি বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায় যেখানে দৈনন্দিন বেঁচে থাকার প্রযুক্তিই এক ধরনের পারফরম্যান্সে পরিণত হয় আর অদৃশ্য শত্রু আমাদের কল্পনার ভেতরেই আরও বেশি বাস্তব হয়ে ওঠে।
যদিও ব্যাট নিয়ে মশা মারার পারফরম্যান্সে, স্পেস ইউজের ক্ষেত্রে তার এক ধরনের সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করা যায়। ক্যামেরার ফ্রন্ট সাইডের বাইরেও পিছনে বেশ অনেকটা ফাঁকা স্পেস ছিল, যেটাকে উনি কোরিয়োগ্রাফিতে আরও নান্দনিকভাবে কাজে লাগাতে পারতেন। তার সাথে কথা বলে বোঝা যায়, শুরুর দিকের কাজ হওয়ায়, তিনি নিজেও এই ঘাটতি উপলব্ধি করতে পেরেছেন। পরবর্তীতে আরও অনেক কাজের মধ্য দিয়ে তার পরিপক্বতা বাড়বে, সেই প্রত্যাশা।
এক্সিবিশন সম্পর্কে কিউরেটর ওয়াকিলুর রহমান বলেন, ‘একজন বাবা, শিল্পী এবং গ্যালারি কিউরেটর হিসেবে, সমসাময়িক রাজনৈতিক ও নান্দনিক আলোচনার মধ্যে নিজের পরিচয়কে তিনি যেভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসিকভাবে মানিয়ে নিচ্ছেন, তা আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। তার শিল্পকর্মে বাঙালি বুদ্ধিবৃত্তিক রেফারেন্সের ব্যবহার তার পরিচয় ও বৈশ্বিক জ্ঞানের প্রতি গভীর মনোযোগ এবং আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করে।
পরিচিত ও অপরিচিত পরিস্থিতির প্রতি তার শিল্পীসুলভ আকর্ষণ দর্শকদের চারপাশের পৃথিবীকে নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।’
প্রদর্শনীটি শেষ হবে আজ মঙ্গলবার।