যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনার সিকেএম সিনড্রোম ক্লিনিক-এ আসা অধিকাংশ রোগীই জানেন না তারা আসলে কী রোগে ভুগছেন। শুধু তা-ই নয়, একটি নতুন সমীক্ষা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষই এই সিনড্রোমের শিকার, অথচ তাদের সিংহভাগই জীবনে এই রোগের নাম শোনেননি। ২০২৩ সালে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (এএইচএ) প্রথম এই রোগটির নামকরণ করে, কার্ডিওভাসকুলার-কিডনি-মেটাবলিক বা সংক্ষেপে সিকেএম সিনড্রোম।
ব্রিঘাম অ্যান্ড উইমেনস হসপিটালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মুথিয়াহ বাডুগানাথান জানান, সিকেএম মূলত কোনও একক রোগ নয়; এটি হৃদরোগ, কিডনির সমস্যা এবং স্থূলতা বা ডায়াবেটিসের মতো মেটাবলিক বা বিপাকীয় জটিলতার একটি বিপজ্জনক সমন্বয়। অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ রক্তশর্করা, অস্বাভাবিক কোলেস্টেরল এবং কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া; এই সাধারণ লক্ষণগুলোই মূলত তিনটি রোগকে একসঙ্গে বাড়িয়ে তোলে। চিকিৎসকেরা এই পুরো রোগচক্রের তীব্রতা অনুযায়ী একে ৪টি ধাপে ভাগ করেছেন:
প্রথম ধাপ: অতিরিক্ত চর্বি বা মেদ (যাদের বিএমআই ২৫ বা তার বেশি অথবা নারীদের কোমরের মাপ ৮৮ সেমি ও পুরুষদের ১০২ সেমি বা তার বেশি)।
দ্বিতীয় ধাপ: রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড নামক চর্বির আধিক্য, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা ক্রনিক কিডনি ডিজিজ। এই ধাপে সাধারণত কোনও বাহ্যিক লক্ষণ প্রকাশ পায় না, রুটিন রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এটি ধরা পড়ে।
তৃতীয় ধাপ: লক্ষণহীন হৃদরোগ (যেমন অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস বা হৃদযন্ত্র বিকল) বা আগামী ১০ বছরে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি ২০ শতাংশের বেশি থাকা।
চতুর্থ ধাপ: স্ট্রোক, হৃদযন্ত্র বিকল বা করোনারি হার্ট ডিজিজে আক্রান্ত হওয়া। এই ধাপটি কিডনি রোগসহ (ফোরবি) বা কিডনি রোগ ছাড়া (ফোরএ) হতে পারে, যা সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা।
ওহাইয়ো স্টেট ইউনিভার্সিটি ওয়েক্সনার মেডিক্যাল সেন্টারের এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ডা. জোশুয়া জোসেফ ব্যাখ্যা করে বলেন, অতিরিক্ত ওজন ও উচ্চ রক্তশর্করার কারণে রক্তে প্রদাহ তৈরি হয়। এর ফলে কিডনির রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বর্জ্য ও অতিরিক্ত তরল ফিল্টার করার ক্ষমতা হারায়। শরীরে জমে থাকা এই তরল রক্তের আয়তন বাড়িয়ে দেয়, যা হৃৎপিণ্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি করে রক্তচাপ আরও বাড়িয়ে দেয়। এভাবে কিডনি ও হৃদপিণ্ড অচলের এক ধ্বংসাত্মক চক্র শুরু হয়। আধুনিক ২৪ ঘণ্টার ব্যস্ত জীবনযাত্রা, অস্বাস্থ্যকর খাবার, কম ঘুম, পরিবেশ দূষণ এবং প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের তামাক ব্যবহারের অভ্যাসই ৯০ শতাংশ আমেরিকানকে এই রোগের ঝুঁকিতে ফেলেছে। এমনকি বাকি ১০ শতাংশ মানুষ সুস্থ জীবনযাপন না করলে এই ঝুঁকিতে পড়বেন।
চিকিৎসা কী?
ডা. বাডুগানাথান জানান, এর মানে এই নয় যে ৯০ শতাংশ মানুষেরই ওষুধের প্রয়োজন। বরং জীবনযাত্রার পরিবর্তনই এর মূল প্রতিরোধক। চিকিৎসকরা এর জন্য ভূমধ্যসাগরীয় বা মেডিটেরেনিয়ান ডায়েট, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, ধূমপান বর্জন এবং পর্যাপ্ত ঘুমের পরামর্শ দিচ্ছেন। এছাড়া উচ্চ ধাপে থাকা রোগীদের জন্য মেটফরমিন, স্ট্যাটিন বা এসিই ইনহিবিটরের মতো প্রচলিত ওষুধের পাশাপাশি বর্তমানে একাধিক অঙ্গের ওপর একসঙ্গে কাজ করে এমন নতুন ওষুধ যেমন, জিএলপি-১, এসজিএলটি২ ইনহিবিটরস এবং এনএসএমআরএ ব্যবহার করা হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই নতুন যুগে সিকেএম কাঠামোর মাধ্যমে রোগীদের হাসপাতালে যাওয়া কমিয়ে দীর্ঘায়ু করা সম্ভব।
সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট