ঢাকাWednesday , 15 July 2026
  1. অন্যান্য
  2. আবহাওয়া
  3. খেলা
  4. চাকরি
  5. জীবনযাপন
  6. তথ্যপ্রযুক্তি
  7. প্রেস রিলিজ
  8. বাণিজ্য
  9. বাংলাদেশ
  10. বিনোদন
  11. বিশ্ব
  12. ভিডিও
  13. মতামত
  14. রাজনীতি
  15. শিক্ষা
আজকের সর্বশেষ সবখবর

‘ঝিনুকধানী’ : নতুন কাব্য-আঙ্গিকের নন্দন ও নির্মাণ

UttorbongoBD
July 15, 2026 7:10 pm
Link Copied!


বাংলা কবিতায় আঙ্গিক-অন্বেষণের ইতিহাস দীর্ঘ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কবিতা শুধু ভাষার নয়, নির্মাণরীতিরও পরিবর্তন ঘটিয়েছে। কখনো দীর্ঘ বয়ানের মহাকাব্যিক বিস্তার, কখনো-বা ক্ষুদ্র পরিসরে গভীর অনুভবের ঘনীভবন—সময়ে সময়ে উভয় প্রবণতাই সমান্তরালে চলেছে। সমকালীন বাংলা কবিতার অন্যতম স্বতন্ত্র কণ্ঠ নকিব মুকশি তার সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘ঝিনুকধানী’-তে সেই দ্বিতীয় প্রবণতার দিকে একাগ্র মনোযোগ দিয়েছেন। তার পূর্বপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘প্রতিশিসে অর্ধজিরাফ’, ‘…দুধের গাই—এজমালি বাগান…’, ‘জুতার কিরণ’, ‘পৃথিবী এক সারোগেট মাদার’ ও ‘মাস্তুলের জ্বর’ ভাষার অপ্রত্যাশিত ব্যবহার, পরাবাস্তব চিত্রকল্প ও অস্তিত্ববিষয়ক কাব্যবীক্ষার জন্য পাঠকের কাছে তাকে বিশেষভাবে পরিচিত করেছে। আর প্রতিটি বই-ই একটি থেকে অন্যটি আলাদা সামগ্রিক রূপ ও বৈশিষ্ট্যে, ভাষা ও সিনট্যাক্সে, অলংকার ও ধ্বনিমাধুর্যে। ‘ঝিনুকধানী’ও নকিব মুকশির আলাদা এক কাব্যদ্বীপ, যেখানে তার কবিতা নতুন এক বাঁক নিয়েছে, রূপ নিয়েছে নতুন এক কাব্য-জনরায়।

বইটির শুরুতেই নকিব মুকশি তার প্রস্তাবিত কবিতার ধরন সম্পর্কে একটি ব্যাখ্যামূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি এই সংক্ষিপ্ত অথচ বহুস্তরবিশিষ্ট কবিতাগুলোর নাম দিয়েছেন ‘ঝিনুককবিতা’, যার মধ্যে অ্যাফোরিজম, এপিগ্রাম, ক্ষুদ্রকবিতা ও দার্শনিক সংকেতের একটি স্বতন্ত্র সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। ঝিনুক যেমন নিজের ভেতরে মুক্তা ধারণ করে, তেমনি এই কবিতাগুলোও ক্ষুদ্র পরিসরের মধ্যে লুকিয়ে রাখে চিন্তাদর্শন, গভীর ভাবনা, চিত্রকল্প ও ব্যঞ্জনার বহুস্তর। কবির লেখায় কিঞ্চিৎ চোখ রাখা যেতে পারে:

“ঝিনুককবিতা এমন সংক্ষিপ্ত কবিতা, যা বাহ্যিকভাবে ছোট হলেও অন্তর্গতভাবে প্রজ্ঞাদীপ্ত ও সিন্ধুবিস্তীর্ণ, যা অ্যাফোরিজমের দার্শনিক ঘনত্ব বা এপিগ্রামের ব্যঙ্গাত্মক মোচড় ও কবিতার শৈল্পিক উপাদান—অলংকার, আঙ্গিক, চিত্রকল্প, ভাষার কারুকাজ, ধ্বনিমাধুর্য কিংবা ছন্দ—একত্রে ধারণ করে। এতে থাকে চিন্তার গভীরতা, ভাষার সংহতি, বহুস্তরীয় কাব্যিক ব্যঞ্জনা। এই সংমিশ্রণ একে কেবল একটি বক্তব্য বা উক্তি নয়, বরং একটি কাব্যিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করে। এ ধরনের প্রতিটি কবিতা যেন একেকটি ঝিনুক, যা ভেতরে লুকানো মুক্তার মতো দর্শন ও চিন্তাদ্যুতি বহন করে।
উদাহরণ:
Fire sleeps in the stone,
Waiting for a touch—
Destruction is patient.

ঝিনুককবিতা কোনো নৈতিক দায় বহন করে না। এটি প্রজ্ঞাশাসিত ও কাব্যদর্শনাশ্রিত একধরনের পদ্য, যা প্রচলিত ইতিবাচকতার বিপরীতে দাঁড়াতে পারে, এমনকি সমাজ-রাষ্ট্র-শৃঙ্খলার ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করতে পারে। এর কারণ গভীর পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে বিকল্প সত্যের প্রতি এক অন্তর্দৃষ্টিমূলক আকর্ষণ।”

এই আঙ্গিকগত সচেতনতা ‘ঝিনুকধানী’-কে কেবল একটি কবিতার বই হিসেবে নয়, বরং একটি কাব্য-প্রস্তাবনা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বাংলা কবিতায় সংক্ষিপ্ত কবিতার ঐতিহ্য রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ‘কণিকা’, জীবনানন্দের কিছু ক্ষুদ্র কবিতা, শামসুর রাহমান, বিনয় মজুমদারের বিচ্ছিন্ন রচনার উল্লেখ করা যেতে পারে। এ ছাড়া ইমতিয়াজ মাহমুদসহ কারও কারও ক্ষুদ্র কবিতা রয়েছে, যার অধিকাংশ এপিগ্রাম বা ম্যাক্সিমের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। আবার মজনু শাহরও একটা ক্ষুদ্র কবিতার বই রয়েছে। কিন্তু এগুলো নকিব মুকশির ঝিনুককবিতার সুনির্দিষ্ট কাব্যপ্রস্তাবনার আদলে নয়, তার বৈশিষ্ট্যগামী নয়। তিনি সংক্ষিপ্ততার মধ্যে একটি স্বতন্ত্র কাব্যভাষা ও আঙ্গিক নির্মাণের চেষ্টা করেছেন।
বইয়ের কবিতাগুলো পড়তে পড়তে স্পষ্ট হয়, কবি মূলত ভাবের ঘনত্বে বিশ্বাসী। এখানে কবিতা কোনো ঘটনার বিবরণ নয়; উপলব্ধির ক্ষুদ্র বিস্ফোরণ। তার পঙ্‌ক্তিগুলো তাৎক্ষণিক অর্থ বিবৃত না করে পাঠককে গহিনতর দর্শনচিন্তার দিকে ঠেলে দেয়। পাঠকের অংশগ্রহণ ছাড়া এদের পূর্ণতা ঘটে না। এদিক থেকে ‘ঝিনুকধানী’ আধুনিক কবিতার এমন একটি বৈশিষ্ট্য ধারণ করে, যেখানে কবিতা পাঠকের সঙ্গে যৌথভাবে সম্পন্ন হয়।
দর্শনমোড়ানো কতিপয় কবিতাচরণ পড়া যাক।

‘পথই মূলত/ আকাশকে ছুঁতে পারে,/ পথিক কেবল/ গন্তব্য’ (পথ-পথিক)
‘মেঘের নিচে পাখি উড়লেও/ মানুষ ওড়ে মাটির নিচেও’ (উড়ান)
‘নাটাই ছিঁড়ে উড়ে যাওয়া ঘুড়ি/ একসময় নিজেকে আবিষ্কার করে মাটিতে—/ আস্ত কিংবা বিধ্বস্ত’ (সীমালঙ্ঘন)
‘অন্যের হামানদিস্তায়/ নিজের হৃদয় রাখলে থ্যাঁতলানো মাংস/ নিজের হামানদিস্তায়/ নিজেরই হৃদয় রাখলে বুদ্ধ-পরমহংস’ (আরোহণ)

এসব কবিতা কারও কারও কাছে অ্যাফোরিজম, এপিগ্রাম, ম্যাক্সিম, কাপলেট বলে ভ্রম হতে পারে। কিন্তু এর বৈশিষ্ট্য প্রকৃতপক্ষে তেমন নয়। বিশ্বসাহিত্যে অ্যাফোরিজম, এপিগ্রাম, ম্যাক্সিম, বা চিত্রকল্পনির্ভর ক্ষুদ্র কবিতার ইতিহাস অনেক পুরোনো হলেও মেনিফেস্টো ঘোষণা করে এমন সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ধারণ করে লেখা তেমন চোখে পড়ে না, বিচ্ছিন্নভাবে কোথাও হয়তো আছে। তবে এ-ও ঠিক, কবির প্রস্তাবিত ঝিনুককবিতার বৈশিষ্ট্য তার কিছু কবিতাও পুরোপুরি ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে হয়েছে। তারপরও এমন সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ধারণ করা অ্যাফোরিস্টিক কবিতার বই বাংলায় তো নয়ই, এমনকি বিশ্বসাহিত্যেও পাওয়া যাবে কি না সন্ধানসাপেক্ষ।

নকিব মুকশির কবিতার অন্যতম শক্তি তার চিত্রকল্প নির্মাণ এবং ব্যতিক্রমী রূপক-প্রতীকের ব্যবহার। তিনি প্রায়ই দৃশ্যমান বাস্তবতা থেকে এমন এক ব্যঞ্জনাময় অভিজ্ঞতা তৈরি করেন, যা পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করে। ‘নুড়িটি’, ‘চক্র’, ‘পাকা’, ‘হ্রস্বকৃত্য’ কিংবা ‘খেলা’—এ ধরনের কবিতাগুলোতে দেখা যায়, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা হঠাৎ করেই দার্শনিক তাৎপর্যে উত্তীর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনো কোনো কবিতায় ভাষা এতটাই সংযত যে কয়েকটি পঙ্‌ক্তির মধ্যেই একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবোধ ধরা পড়ে।

তবে ‘ঝিনুকধানী’-এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এর নীরবতা। এই কবিতাগুলো উচ্চকণ্ঠ নয়, ফিসফিসে। তারা ঘোষণা দেয় না, ইঙ্গিত করে। অনেক কবিতাই যেন বাক্যের চেয়ে বিরতির ওপর বেশি নির্ভরশীল। এ নীরবতাই বইটির নন্দনতাত্ত্বিক শক্তি। সমকালীন বাংলা কবিতার একাংশ যখন অতিরিক্ত ভাষিক বিস্তার, রাজনৈতিক স্লোগানধর্মিতা কিংবা আত্মবয়ানের ভারে ক্লান্ত, তখন নকিব মুকশির এই সংযম ও নৈর্ব্যক্তিক সময়নিরপেক্ষতা পাঠককে অন্য ধরনের পাঠ-অভিজ্ঞতার দিকে নিয়ে যায়।

অবশ্য এই আঙ্গিকের কিছু অন্তর্নিহিত ঝুঁকিও রয়েছে। সংক্ষিপ্ত কবিতা সহজেই উক্তি, বচন বা কাব্যিক স্ট্যাটাসে পরিণত হতে পারে। ‘ঝিনুকধানী’-র কিছু কবিতায় সেই সীমারেখা স্পর্শ করার প্রবণতা দেখা যায়। কোথাও কোথাও ভাবের সংকোচন এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে কবিতার অন্তর্নিহিত শক্তি পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়নি। আবার কিছু কবিতা দার্শনিক সংকেত হিসেবে আকর্ষণীয় হলেও কাব্যিক অনুরণনের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম শক্তিশালী। কিন্তু এ ধরনের সীমাবদ্ধতা আঙ্গিকগত পরীক্ষার অবধারিত অংশ; বরং এগুলোই প্রমাণ করে যে কবি নিরাপদ পুনরাবৃত্তির বদলে ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।

নকিব মুকশির কাব্যভুবনের সঙ্গে পরিচিত পাঠকের কাছে ‘ঝিনুকধানী’ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এটি তার পূর্ববর্তী গ্রন্থগুলোর সম্প্রসারণ নয়, বরং পুনর্বিন্যাস। আগে যেখানে তার কবিতায় ভাষার বিস্তার, চিত্রকল্পের বহুমাত্রিকতা এবং দীর্ঘতর কাব্যপ্রবাহ ছিল, সেখানে এই গ্রন্থে তিনি ভাষাকে প্রায় হাড়সার করে এনেছেন। যেন সমস্ত অলংকার, অতিরিক্ত ব্যাখ্যা ও বর্ণনা ঝরিয়ে রেখে শুধু মজ্জাটুকু ধরে রাখতে চেয়েছেন। এই পরিবর্তন কেবল শৈলীগত নয়; এটি কবির কাব্যদর্শনেরও পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।

‘ঝিনুকধানী’ শেষ পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ—কবিতার সংখ্যার কারণে নয়, কবির কাব্যিক অভিপ্রায় ও কাব্যদর্শনাশ্রিত শক্তিশালী স্বতন্ত্র ভাষাভঙ্গির কারণে। এটি বাংলা কবিতায় ক্ষুদ্রকায় অথচ গভীর ব্যঞ্জনাময় কবিতার সম্ভাবনাকে নতুনভাবে উন্মোচন করে। বইটি পাঠ করতে গিয়ে বারবার মনে হয়—কবি যেন শব্দের নয়, শব্দের পরবর্তী নীরবতার কবি। তিনি বৃহৎ বক্তব্যকে ক্ষুদ্র আয়তনে ধরে রাখতে চান; বিস্তৃত সমুদ্রকে একটি ঝিনুকের ভেতর সংরক্ষণ করতে চান। আর সে কারণেই ‘ঝিনুকধানী’ শুধু একটি কবিতার বই নয়, এটি সংক্ষিপ্ততার নন্দনতত্ত্বে বিশ্বাসী এক কবির কাব্যিক ঘোষণা; যেখানে প্রতিটি কবিতা একেকটি ঝিনুক, আর তার গভীরে পাঠকের জন্য অপেক্ষা করে আছে অনাবিষ্কৃত মুক্তা।





Source link

×

FIFA World Cup Live

FIFA World Cup সরাসরি দেখতে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।

📺 লাইভ দেখুন
error: Content is protected !!
🔴 LIVE html