একজন মানুষকে আমরা কীভাবে চিনি? তার মুখ দেখে? নাকি তার ভেতরের মানুষটিকে? আমাদের মুখ কি কেবল শরীরের একটি অংশ, নাকি আমাদের পরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক? এমনই কিছু প্রশ্নকে কেন্দ্র করে লেখা হয়েছে ইতিহাসবিদ ফে বাউন্ড-আলবার্টির বই ‘দ্য ফেস: আ কালচারাল হিস্ট্রি’।
লন্ডনের কিংস কলেজের অধ্যাপক ফে বাউন্ড-আলবার্টি নিজেই ‘প্রসোপ্যাগনোসিয়া’ নামের একটি বিরল স্নায়বিক সমস্যায় ভুগছেন। এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের পক্ষে পরিচিত মানুষের মুখ মনে রাখা বা চিনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ পৃথিবীর আরেকটি ছোট অংশের মানুষের রয়েছে ঠিক উল্টো ক্ষমতা, তারা একবার কোনো মুখ দেখলেই সহজে ভুলে যান না। তাদের বলা হয় সুপার রিকগনাইজার। এই দুই বিপরীত অভিজ্ঞতাকে সূচনা হিসেবে ব্যবহার করলেও লেখক বইটিকে ব্যক্তিগত স্মৃতিকথায় সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি মানুষের মুখকে ঘিরে গড়ে ওঠা হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ইতিহাস অনুসন্ধান করেছেন।
মানুষের মুখ নিয়ে আমাদের ধারণা কখনোই স্থির ছিল না। প্রাগৈতিহাসিক যুগের ‘ভেনাস অব ব্রাসেমপুই’ ভাস্কর্য থেকে শুরু করে রেনেসাঁর প্রতিকৃতি, পাসপোর্টের ছবি, মুখভিত্তিক নজরদারি, প্লাস্টিক সার্জারি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম সৌন্দর্যের সংস্কৃতি—সবকিছুই এখানে একটি দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।
বইটির অন্যতম আকর্ষণীয় আলোচনা আয়নাকে ঘিরে। আজ আমরা দিনে অসংখ্যবার নিজের মুখ দেখি। কিন্তু ১৭শ শতাব্দীর আগে অধিকাংশ মানুষের সেই সুযোগ ছিল না। লেখকের প্রশ্ন, মানুষ যদি নিজের মুখ খুব কম দেখে, তাহলে তার আত্মপরিচয়, আত্মসচেতনতা ও নিজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হয়? এই প্রশ্ন থেকেই বইটি নতুনভাবে ভাবতে শেখায়—নিজেকে আমরা কতটা নিজের চোখে দেখি, আর কতটা অন্যের দৃষ্টিতে।
বইয়ের শেষাংশে লেখক বর্তমান সময়ের সৌন্দর্য-সংস্কৃতির দিকে নজর দেন। ফেসলিফট, বোটক্স, ফিলার, ফটো ফিল্টার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কীভাবে একটি নির্দিষ্ট মুখের আদর্শ তৈরি করছে, তা তিনি বিশ্লেষণ করেছেন। তার মতে, আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষ ক্রমেই একই ধরনের চেহারা অর্জনের চেষ্টা করছে। ফলে বৈচিত্র্য কমছে ও মুখের মাধ্যমে ব্যক্তিকে আলাদা করে চেনাও কঠিন হয়ে উঠছে।
লেখক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন—মুখই কি আমাদের প্রকৃত পরিচয়? তার মতে, সমাজকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে হবে, যেখানে মানুষের মূল্য তার চেহারা বদলে তার মানবিকতা, চিন্তা ও কাজ দিয়ে নির্ধারিত হবে। যদিও বর্তমান বাস্তবতা সেই স্বপ্নকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে।
প্রতিদিন আয়নায় নিজের মুখ দেখার অভ্যাসের মধ্যেও যে গভীর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অর্থ লুকিয়ে আছে, ফে বাউন্ড-আলবার্টির বই সেই অদৃশ্য ইতিহাসকেই সামনে নিয়ে আসে। বইটি শেষ করার পর আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকানোর অভিজ্ঞতাও হয়তো আর আগের মতো থাকবে না।