ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে পুশইনের একের পর এক অপচেষ্টায় বিজিবি এবং স্থানীয় এলাকাবাসীর তীব্র প্রতিরোধে সীমান্তজুড়ে থমথমে ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। চলতি জুন মাসের শুরু থেকে বিশেষ করে জামালপুর, কুড়িগ্রাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মেহেরপুর এবং লালমনিরহাট সীমান্তে বিএসএফের এসব পুশইন প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছে। ক্ষুব্ধ সীমান্তবাসী লাঠিসোঁটা নিয়ে বিজিবির পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলায় এবং রাতে সার্চলাইট বন্ধ করে অনুপ্রবেশ করানোর চেষ্টা করায় সীমান্ত এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
সর্বশেষ জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার রামরামপুর সীমান্তে ভারত থেকে এক বৃদ্ধকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে বিজিবির সঙ্গে বিএসএফের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এ সময় উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। পতাকা বৈঠকে দুই বাহিনীই ওই ব্যক্তিকে নিজেদের নাগরিক হিসেবে গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। একপর্যায়ে বিএসএফের এক সদস্য গুলি করার কথা বললে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বিজিবির সদস্যরা পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘আপনারা গুলি করলে কি আমরা বসে থাকবো? আমাদের কি গুলি নাই? আমরা কি চুড়ি পরে বসে থাকবো?’
বুধবার (১০ জুন) সকাল ৬টার দিকে উপজেলার রামরামপুর সীমান্ত দিয়ে এক বৃদ্ধকে জোরপূর্বক পুশইনের চেষ্টা চালালে শূন্যরেখায় ভারতের নন্দীরচর বিএসএফ ক্যাম্প সদস্যদের সঙ্গে এমন বাক্যবিনিময় হয় বিজিবির। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বিজিবি ও স্থানীয়দের প্রতিরোধের মুখে পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এ সময় বিজিবির সঙ্গে সীমান্ত এলাকার বাংলাদেশি লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রতিরোধ করেন। বিজিবি ও স্থানীয়দের বাধার মুখে শূন্যরেখায় অবস্থান নেন ভারত থেকে পুশইনের শিকার ৬০ বছরের ওই ব্যক্তি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বৃদ্ধ লোকটি ভারতের চেন্নাইয়ের বাসিন্দা। একজন মুসলিম। সকালে তাকে কাঁটাতারের বেড়া পার করে দেয় বিএসএফ। দুই দেশের মানুষের ধাওয়ায় প্রাণ যায় যায় অবস্থা ছিল তার।
পুশইন ঠেকাতে শক্ত অবস্থান নেয় বিজিবি। তাদের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দারা যোগ দিয়েছেন। এ সময় দেখা যায়, ওই লোকটি বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঢুলে গেলে তাদের লাঠিসোঁটা নিয়ে ধাওয়া করেন বাংলাদেশিরা। পরে একপ্রকার নিরুপায় হয়ে আবার ভারতের ভূখণ্ডে চলে যান। তখন বিএসএফ ধুর ধুর করে তাড়িয়ে দেয়। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, আসলে তার কোনও দেশ নেই। কারও মধ্যে কোনও মানবতাও নেই। হয়তো মনে মনে ভাবছিলেন, আমার দেশ কোথায়? কোনটা আমার ভূখণ্ড। আমার জন্মভূমি কোথায়? নাকি নেই।
স্থানীয় সূত্র ও বিজিবি জানায়, ভারতের নন্দীরচর বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা ৬০ বছরের ওই ব্যক্তিকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করেন। বিষয়টি দেখে জামালপুর ৩৫ বিজিবির সদস্যরা এবং সীমান্তবর্তী এলাকার লোকজন সেখানে অবস্থান নেন। বাধার মুখে ওই ব্যক্তি শূন্যরেখায় অবস্থান নিতে বাধ্য হন।
এর আগে গত ৮ জুন দিবাগত মধ্যরাতে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাঘারচর ও পাথরের চর সীমান্তের কুমারেরচর এলাকায় সার্চলাইট বন্ধ করে ১৮ জনকে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। এর আগের রাতেও বড়াইবাড়ী সীমান্তে আট জনকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়। জামালপুর ৩৫ বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামবাসীর কঠোর অবস্থানের কারণে দুটি চেষ্টাই ব্যর্থ হয় এবং বর্তমানে পুরো এলাকায় উত্তেজনা চলছে।
এদিকে কুড়িগ্রামের যাদুরচর ইউনিয়নের বকবান্ধা ও সুদুরটিলা সীমান্তে ট্রাকে করে মানুষ এনে পুশইনের চেষ্টা চালানো হয়। ঘটনাটি জানাজানি হলে স্থানীয় বাসিন্দারা লাঠিসোঁটা নিয়ে বিজিবির সমর্থনে সীমান্তে অবস্থান নেন, যার ফলে বিএসএফ পিছু হটতে বাধ্য হয়।
এ ছাড়া মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার তেঁতুলবাড়ীয়া সীমান্তে তিন জন পুরুষ, দুজন নারী ও এক শিশুসহ মোট ছয় জনকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়। বিজিবি ও গ্রামবাসীর বাধার মুখে তারা প্রবেশ করতে না পেরে দুই দেশের মধ্যবর্তী শূন্যরেখায় অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
এছাড়াও চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, লালমনিরহাট, সিলেট এবং জয়পুরহাট সীমান্তেও বিএসএফের একাধিক পুশইন চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে বিজিবি। অনুপ্রবেশের আশঙ্কায় সীমান্ত সংলগ্ন গ্রামগুলোর সাধারণ মানুষ লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রাত জেগে বিজিবিকে পাহারা দিতে সাহায্য করছে।
জামালপুর ৩৫ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল হাসানুর রহমান বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে এই সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পুশইনের চেষ্টা করে যাচ্ছে বিএসএফ। আজ সকালে এক ব্যক্তিকে ভারত থেকে শূন্যরেখায় ঠেলে পাঠায় তারা। কিন্তু বিজিবি এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে তা প্রতিরোধ করে। পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হলেও হয়নি। তবে পুশইন ঠেকাতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছে। এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের সদস্যরা সেখানে অবস্থান নিয়েছেন।’