২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাজনৈতিক নেতারা। কেউ একে উচ্চাভিলাষী, কেউ স্বপ্নবিলাসী, আবার কেউ গতানুগতিক বাজেট বলে মন্তব্য করেছেন। বিশেষ করে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রেখে বাজেট কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
তবে কয়েকজন নেতার মতে, প্রস্তাবিত বাজেট জনবান্ধব। কারণ এতে সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় মেগা প্রকল্পের প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তারা। তবে সঠিক পরিকল্পনা না থাকলে এসব উদ্যোগ ‘স্বপ্নবিলাসী’ হয়ে যেতে পারে বলেও মত দিয়েছেন অনেকে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট উপস্থাপনের পর বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
আয়বৈষম্য মোকাবিলায় দিকনির্দেশনা নেই: আবদুর রব
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে আয়বৈষম্য মোকাবিলার কার্যকর দিকনির্দেশনা প্রতিফলিত হয়নি। তার মতে, বাজেটে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান সংকট ও আয়বৈষম্য মোকাবিলায় সুস্পষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপের প্রতিফলন পর্যাপ্ত নয়।
তিনি বলেন, বাজেট প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়ায় সমাজের সব শ্রেণির মানুষের অর্থবহ অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এটি সত্যিকার অর্থে গণমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেটে পরিণত হয়।
‘স্বপ্নবিলাসী’ বাজেট: মান্না
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, দেশের ইতিহাসে এবারের বাজেটের আকার সবচেয়ে বড়। তার কাছে এটি একটি স্বপ্নবিলাসী বাজেট বলে মনে হয়েছে। কারণ, এত বড় ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই।
তবে সরকারের সাড়ে তিন মাসের বাজেট নিয়ে তিনি সমালোচনায় যেতে চান না। তার ভাষ্য, বিগত দিনের লুটপাট ও দুর্নীতির প্রশ্ন রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হামে শিশুমৃত্যু, রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়া এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি।
তিনি বলেন, এত কিছুর পরও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক। বাজেটে চাল-ডালের দাম কমানোর কথা বলা হয়েছে। সরকার এসব লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
বাস্তবায়নযোগ্য নয়: শামীম হায়দার পাটোয়ারী
জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী মনে করেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয়।
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। ফলে সরকারকে উন্নয়ন বাজেট বা এডিপি বাস্তবায়নে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। এমনকি বেতন ও সরকারি রাজস্ব ব্যয়ও ঋণনির্ভর হয়ে যেতে পারে। এর প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়বে।
উচ্চাভিলাষী ঘাটতি বাজেট: রুহিন হোসেন প্রিন্স
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, এটি একটি উচ্চাভিলাষী ঘাটতি বাজেট। সাধারণ মানুষের প্রধান প্রশ্ন হলো, মুদ্রাস্ফীতি কমবে কি না। বাজেটে মুদ্রাস্ফীতি কমানোর যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা দেশের অর্থনীতিবিদদের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকও যথাযথ বলে মনে করছে না।
তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সার্বজনীন রেশনিং ব্যবস্থা চালু কিংবা শ্রমজীবী মানুষের জন্য জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণার কোনো উদ্যোগ বাজেটে নেই। কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
তার মতে, বাজেটে ১০টি প্রধান লক্ষ্য ঘোষণা করা হলেও সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য যে পদক্ষেপগুলোর কথা বলা হয়েছে, তা দিয়ে সামগ্রিকভাবে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলে মনে হয় না।
আশাবাদ আছে, অভিজ্ঞতার শিক্ষা নেই: বজলুর রশিদ ফিরোজ
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, এই বাজেটে আশাবাদ আছে, কিন্তু অভিজ্ঞতার শিক্ষা নেই। এটি এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় বাজেট হলেও অর্থসংস্থানের পরিকল্পনা আগের পথেই রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ধনীদের প্রত্যক্ষ করের পরিবর্তে সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ করের চাপ বাড়িয়ে বাজেটের অর্থসংস্থান করা হবে। ফলে বাজেট ঘাটতি, দেশি-বিদেশি ঋণ গ্রহণ, ঋণের সুদ পরিশোধে বিপুল বরাদ্দ এবং কথার চমক—সবই এতে রয়েছে।
বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা, ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এ বছর ঋণের সুদ বাবদ পরিশোধ করতে হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা, যা বাজেটের সবচেয়ে বড় খাত। এসব তথ্য বিবেচনায় রেখে বাজেট প্রস্তাব ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তা না করে নতুন আশার কথা শুনিয়ে সরকার পুরোনো পথেই হাঁটছে।
অর্থনীতির সংকট উত্তরণের ইঙ্গিত নেই: মঞ্জু
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে যে খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে উত্তরণের কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত এই বাজেটে নেই।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট অর্থনীতির দুর্বলতা কাটাতে পারবে না, বরং ঝুঁকি আরও বাড়াবে। দারিদ্র্য নিরসন ও রাজস্ব আয়ের পরিস্থিতিকে হতাশাব্যঞ্জক উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণকে কৌশলে বোকা বানানোর জন্য সরকার একটি গতানুগতিক উচ্চাভিলাষী বাজেট দিয়েছে।
তার ভাষ্য, আড়াই লাখ কোটি টাকার ঘাটতি নিয়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের মাধ্যমে জনগণের কাঁধে বিপুল পরোক্ষ করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে।
বাস্তবায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ রাজস্ব সংগ্রহ: সাইফুল হক
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, নতুন বাজেটে ‘সামর্থ্যের মধ্যে জনপ্রত্যাশা পূরণে আধাআধি প্রচেষ্টা’ রয়েছে।
তিনি বলেন, বিশাল ঘাটতি পূরণ এবং রাজস্ব সংগ্রহই হবে বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে প্রবৃদ্ধির কোনো হিসাবই কাজে আসবে না।
কালো টাকা সাদা করার প্রস্তাব অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নকে নতুন করে উৎসাহ দেবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতাও বাড়বে।
সাইফুল হক বলেন, টাকার অঙ্কে বাজেটের আকারে বড় উল্লম্ফন ঘটলেও বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। কারণ, ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তার ওপরই মূলত বাজেট বাস্তবায়নের সাফল্য নির্ভর করবে।
‘আশাবাদে ভারাক্রান্ত’ বাজেট
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ও দলীয় মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, বাজেটে এত বেশি আশাবাদের প্রতিফলন ঘটেছে যে একে ‘আশাবাদে ভারাক্রান্ত’ বলে মনে হচ্ছে। এই বাজেট বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। তবে বাজেটটি সুলিখিত।
তিনি বলেন, বাজেট বক্তৃতায় জুলাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে। সেখানে সমাজ-সংস্কৃতির বুনন, অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন, জনমিতিক লভ্যাংশ, দীর্ঘজীবিতা লভ্যাংশ এবং গণতান্ত্রিক লভ্যাংশের কথা বলা হয়েছে।
গাজী আতাউর রহমান বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা, মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ জিডিপির ২ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করা এবং মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৪০ শতাংশে নেওয়ার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন করা চ্যালেঞ্জিং হবে।