২০১২ কিংবা ১৩ সালের দিকে একদিন সকালে কুষ্টিয়া শহর থেকে লোকাল ট্রেনে কুমারখালী উপজেলাতে যাচ্ছি। ট্রেনের কামরায় কয়েকজন মানুষ জাতীয় নির্বাচন এবং সরকার পরিবর্তন নিয়ে কথা বলছেন কিন্তু তাদের আলাপের সারমর্ম হল, সরকার পরিবর্তন হলেই তাদের লাভ।
কারণ যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক একটা পে স্কেল ঘোষণা করবে এবং তাদের বেতন বৃদ্ধি পাবে। কান পেতে তাদের আলাপ শুনে যেটুকু বুঝলাম, তারা বিভিন্ন সরকারি কলেজের শিক্ষক। একযুগ পরে এসে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে একটা জেলা শহর থেকে ঢাকায় ফিরছি, স্টেশনে দুইজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের সাথে দেখা। একজন আমার পরিচিত।
প্রাথমিক সৌজন্যমূলক আলাপ সেরে আমার ঠিক পাশে দাঁড়িয়েই নতুন পে স্কেলে তাদের বেতন কত বাড়লো, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে কত বাড়বে মোবাইল স্ক্রিন স্ক্রল করে তার হিসাব মেলাচ্ছেন।
দু’জনের আলাপ শুনে আমি একটু আলপটকা বলে ফেললাম, ২০২৭ সালে সরকার বেতন দিতে পারলে হয়। উত্তরে একজন খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন, “সরকারের কখনও টাকার অভাব হয় না। মূলত উনি যেটা বলতে চেয়েছেন, সেটা হল আজ পর্যন্ত শুনেছেন সরকারি কর্মচারীরা বেতন পায়নি।”
ঠিকই তো রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অর্থের সংকট যতই হোক না কেন সরকারি কর্মচারীদের বেতন বন্ধ হয়েছে এমন কথা তো আমাদের জেনারেশনের সময়কালে শুনিনি।
এখন কথা হলো, সরকারি কিংবা স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ শিক্ষক এবং কথিত সরকারি কর্মকর্তারা নিজেদের বেতন এবং এবং আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা এবং সেবা নিয়ে যতটা আত্মবিশ্বাসী বিনিময়ে যাদের করের টাকায় এগুলি নিশ্চিত হয় তাদের ব্যাপারে কি তারা ততটা আন্তরিক?
দু-একটি ঘটনার কথা একটু উল্লেখ করতে চাই। ২০২০ সালের শেষের কিংবা ২১ সালের প্রথমে মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গেছি করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন নিতে।
সেদিনই ওই হাসপাতালে প্রথম যাওয়া। গিয়ে দেখি বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষের দীর্ঘ লাইন। কিন্তু না আছে কোনো বসার ব্যবস্থা, না আছে মাথার উপর কোনো তাবু। আমার ভাই তখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কর্মরত। থাকে মহাখালী অঞ্চলে।
তাকে বললাম, এই মাঠে তাবু টাঙ্গিয়ে বসার ব্যবস্থা করে মাইকে সিরিয়ালি ডাকলে তো আর মানুষের এতো কষ্ট করতে হয় না। তাতে কি অনেক টাকা খরচ হয়?
উত্তরে সে বলল, “তুমি যে ব্যবস্থাপনার কথা বলছো, তার প্রত্যেকটির জন্য বরাদ্দ রয়েছে। আমি জানি না মহাখালী সংক্রামক হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ অর্থ মন্ত্রণালয় কিংবা অধিদপ্তরে ফেরত গিয়েছিল কি’না। আর যদি যেয়েও থাকে, তাহলে কেন টাকা বাঁচলো সেজন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জবাদিহিতা করতে হয়েছে কি’না।”
সরকার নতুন যে পে স্কেল ঘোষণা করেছেন, সেই পে স্কেলে নিশ্চয় সেই কর্মকর্তারও বেতন বেড়েছে। এবার অন্য একটি ঘটনার কথা বলি, আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স এর জন্য আমাকে তিনবার আবেদন করতে হয়েছে এবং দুইবার পরীক্ষা দিতে যেতে হয়েছে এবং সেটার জন্য আমার কোনো দায় নেই।
আমি পাশ করার পর এক সার্ভার থেকে অন্য সার্ভারে দাটা ট্রান্সফারের সময় নাকি আমাদের ডাটা ডিলিট হয়ে গেছে। সংখ্যাটা একজন, দুজনের নয়; পঁয়তাল্লিশ হাজার সেবাগ্রহীতার। বিআরটিএ’র কর্মকর্তার অনুরোধে আমি দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিতে গিয়েছি।
যাইহোক যারা জেলা শহরে ড্রাইভিং এর জন্য পরীক্ষা দিয়েছেন, তারা জানেন এইটা একটা দিনব্যাপী প্রক্রিয়া। শুরুতে লিখিত পরীক্ষা দিয়ে অপেক্ষা করতে হয়, সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে মোখিক পরীক্ষা এবং সর্বশেষ প্রাক্টিক্যাল। আমি অন্য জেলার কথা জানি না, আমি যে জেলাতে পরীক্ষা দিয়েছি, সেখানে সেবা প্রার্থীদের বসার জন্য যে জায়গা, সেখানে একটি ফ্যানের ব্যবস্থা নেই।
অথচ জেলা প্রশাসনে পক্ষ থেকে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রতিটা পরীক্ষার দিন ওই জায়গা পরিদর্শন করেন, সেই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটেরও তো বেতন বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি আমি পাসপোর্ট নবায়নের জন্য ঢাকা পশ্চিম জোনে গিয়েছি যাবতীয় কাগজপত্র নিয়ে। কিন্তু যাবার পর আমাকে বলা হল, বিদ্যুৎ বিলের মূলকপি লাগবে।
আমি বললাম, “আমি তো নতুন বাসায় উঠেছি, আমাদের বন্টননামা হয় নাই, মিটার, বিল কোনোটাই আমার নামে না। আমি বললাম তবে বাসার বিলের ফটোকপি আছে।” বললেন, “না হবে না, ওই বাসার একটা বিল মূল কপি নিয়ে আসতে হবে, যেটা আমরা স্ক্যান করে রাখবো।” কিন্ত কিছুদিন আগেও আমার পরিচিতরা বিদ্যুৎ বিলের ফটোকপি দিয়ে পাসপোর্ট করে এসেছেন, আর আমারটা তো নবায়ন।
যাইহোক, ফিরে এসে বিদ্যুৎ বিলের মূলকপি নিয়ে গেলাম কিন্তু স্ক্যানের কোনো বালাই সেখানে নাই। আমি বললাম, ভাই বিদ্যুৎ বিলের কপিটা তো আমার লাগবে, উনি কপিটা ছিড়ে আমাকে দিয়ে দিলেন। আমি বললাম স্ক্যান করবেন না?
কিসের স্ক্যান?
আমি বললাম, “নিচে থেকে আমাকে জানানো হয়েছে, অরিজিনাল কপি আনতে হবে এবং আপনি স্ক্যান করে রাখবেন, যদি স্ক্যানের দরকার না হয়, তাহলে অরিজিনাল কপি’র কি দরকার? লোকটা আমার প্রতি একটু বিরক্তই হলেন।”
ধরে নিলাম, এনআইডি এর অরিজিনাল কপি যেহেতু সাথে রাখতে হয়, বিদ্যুৎ বিলের অরিজিনাল কপিও লাগবে। এখন এই নিয়ম সময় সময় পরিবর্তন হলে সেটা তো অনলাইন এপ্লিকেশন সাবমিশনের পর যে কনফার্মেশন মেসেজ দেওয়া হয়, সেখানে কি কি ডকুমেন্টস লাগবে তার একটা তালিকা দিয়ে দিলে হয়। সেজন্য কি অনেক টাকা খরচ হয়? আর একটা সাধারণ ক্যাটাগরির পাসপোর্টের জন্য যেখানে প্রায় ছয় হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে, সেখানে এইটুকু উদ্ভাবনী কিংবা শুধু সেবামূলক মানসিকতা যারা পোষণ করতে পারেন না, সেই কর্মকর্তাদেরও নতুন পে স্কেলে বেতন বেড়েছে।
আমি যে ঘটনাগুলির কথা বললাম, সেগুলি শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে উদহারণ হিসেবে বললাম। আমার সরকারি দপ্তরে প্রত্যক্ষ সেবা নেবার অভিজ্ঞতা তুলনামূলক কম। তবে যা শুনি, পত্রিকায় পড়ি এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে দেখি গড়পড়তা সব জায়গার অবস্থা তো একই রকম।
তাই ব্যক্তিগতভাবে এতো বিশদে এই অভিজ্ঞতা শোনালেও ক্ষতি ছিল না। কিন্তু আমি ভেবেছি, এই পরিস্থিতিগুলিতে আমি যতটা সংক্ষুব্ধ হয়েছি, গ্রামের কৃষক, জেলে, দিনমজুরও তো নানা সরকারি দপ্তরে যান, তাদের মনের অবস্থা কি হয়? আমি তো তূলনামূলকভাবে পড়াশোনার মানদণ্ডে একটু অগ্রসর। কিছুক্ষেত্রে প্রশ্ন তুলি, বিতর্কে জড়াই।
তারা তো সেটাও পারেন না। হয়ত কাজটি একদিনে হয় কিংবা একাধিক দিন যেতে হয়। দালালদের খপ্পড়ে পড়েন। মাথার ঘাম পায়ে ফেলা, বাড়ির হাঁস-মুরগির পাড়া ডিম বিক্রির টাকা খুইয়ে ক্ষোভে কিংবা দুঃখে বাড়ি ফেরেন।
এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা বলি। বছর দশেক আগে একটা টিমের সাথে ঝিনাইদহের একটা গ্রামে গিয়েছিলাম একটা কাজে। গাড়ি এবং পোশাক-আশাক দেখে হয়ত গ্রামের লোকেদের ধারণা জন্মেছিল, আমরা কোনো সরকারি কর্মকর্তাদের দল হবো।
দেশের বাইরে গিয়ে আমাদের দূতাবাস কর্মকর্তাদের অসহযোগিতার জন্য যে ক্ষোভ তাদের মধ্যে দেখেছিলাম, তাতে সেদিন নতুন করে বুঝেছিলাম, সরকারি সেবা নিয়ে কী পরিমাণ ক্ষোভ জনমনে রয়েছে। একজন তো বলেই বসলেন, নাম, চেহারা সব মনে রেখেছি…একবার সামনে পেলে হয়। এখানে একটা আইরনি আছে। এই গ্রামের মানুষেরাই আবার মেয়ের বিয়েতে সরকারি চাকুরিজীবী জামাই খোঁজ করেন। জামাইয়ের উপরি পাওনা নিয়ে গর্বও করেন।
আমার, আপনার আমাদের ট্যাক্সের টাকায় যাদের বেতন-ভাতা হয়, তাদের কাছ থেকে আমরা মর্যাদার সাথে আমাদের প্রাপ্ত সেবা না পেয়ে ক্ষুব্ধ হই কিন্তু তাদেরকেই আমরা ঘরের জামাই করতে চাই, পুত্রবধূ করতে চাই এই মনস্তত্ত্ব আমরা পেলাম কোথা থেকে? উত্তর হলো সমাজ এবং রাষ্ট্র থেকে।
কীভাবে পেলাম, সেইটা বিশদ আলাপ। সামাজিকভাবে নির্মিত এই মনস্তত্ত্ব পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কিন্তু রাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে এবং সেইটা রাষ্ট্রের দায়িত্বও বটে। সরকারি কর্মচারীরা যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নাগরিকদের সেবক সেইটা তাদেরকে মনে করিয়ে দেওয়া। জনগণ এবং তাদের মাঝে সম্পর্ককে মনিটর করা, তাদেরকে জবাদিহিতার আওতায় নিয়ে আসা। বাড়ির একটা ছোট বাচ্চাকে উপহার দেবার বেলায় আমরা অনেক সময় বলি, তোমাকে এটা দেবো যদি তুমি ওই কাজটা কর, তুমি যদি ভালো রেজাল্ট করো তাহলেই তোমাকে একটা সাইকেল কিংবা গিফট দিবো।
কিন্তু পে স্কেল ঘোষণার আগে কি কথিত সরকারি কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারীদের নিকট থেকে কোনো পরিকল্পনা কিংবা প্রতিশ্রুতি চাওয়া হয়েছে তারা জনগণকে সেবার ক্ষেত্রে কি কি উদ্ভাবনী কাজ করবেন কিংবা কি তাদের সংকল্প? আমরা অন্তত সেরকম কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ সংবাদমাধ্যমে দেখিনি।
তার মানে রাষ্ট্র এবং সরকার ধরে নিয়েছে, তাদের সেবাই জনগণ সন্তুষ্ট এবং শিক্ষক এবং সরকারি কর্মচারী যারা লাভবান হলেন, তারাও একটা সিগন্যাল পেলেন এখন তারা যা করছেন, যে মানের সেবা দিচ্ছেন, এইটা তাদের ন্যায্য পাওনা এর জন্য অধিকতর কোনো চিন্তা বা প্রচেষ্টা কোনোটারই কোনো প্রয়োজন নাই। কিন্তু বাস্তবতা কি আবারও পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন আছে?
এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য কি করা দরকার সেইটার নির্দেশনা আমাদের সংবিধানেই আছে। কিন্ত আমাদের সাংসদদের আলোচনা শুনলেই বুঝবেন, সংবিধান নামক গ্রন্থটি তারা পুরোপুরি পাঠই করে উঠতে পারেন না, তাদের পাঁচ বছরের সময়কালে এবং দায় আমাদেরও যে এমন লোকদেরকেই আমরা সংসদ নির্বাচন করি।
১৮ কোটি মানুষের দেশে সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারীদের সংখ্যা এখনও ১৮ লক্ষ পার হয়নি। কিন্তু তাদের হাতেই আমরা নানাভাবে জিম্মি। রাষ্ট্র যেখানে ব্যর্থ সেখানে নাগরিক হিসেবে আমার, আপনার, আমাদের দায়িত্ব প্রতিবাদ জানানো, বলা, লেখা। আসুন, প্রতিবাদ জানাই, বলি, লিখি। নিশ্চয় এই অবস্থার পরিবর্তন হবে।
অপূর্ব দাস, মানবাধিকার কর্মী
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।