ঢাকাTuesday , 23 June 2026
  1. অন্যান্য
  2. আবহাওয়া
  3. খেলা
  4. চাকরি
  5. জীবনযাপন
  6. তথ্যপ্রযুক্তি
  7. প্রেস রিলিজ
  8. বাণিজ্য
  9. বাংলাদেশ
  10. বিনোদন
  11. বিশ্ব
  12. ভিডিও
  13. মতামত
  14. রাজনীতি
  15. শিক্ষা
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দেবব্রত বিশ্বাস : রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্রাত্য পুরুষ

UttorbongoBD
June 23, 2026 1:05 am
Link Copied!


“যে রবীন্দ্রনাথের সংগীতচিন্তা আমার চিন্তাধারার ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল, সেই রবীন্দ্রনাথের নির্দেশ অমান্য করে, নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে মাঝারি কর্তাদের বিধিনিষেধ মেনে আর রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করার মতো ধৃষ্টতা আমার নেই, প্রবৃত্তিই নেই। এই ব্যাপারে যুক্তিহীন কতগুলি নিয়ম যতদিন বলবৎ থাকবে, ততদিন নিজেকে দূরে সরিয়েই রাখব”— দেবব্রত বিশ্বাস, (ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত, পৃ. ১৩০)

এই কথাগুলোই ছিল দেবব্রত বিশ্বাসের সমগ্র সংগীতজীবনের সারসত্য। প্রতিষ্ঠানের চোখে তিনি ছিলেন ব্রাত্য, কিন্তু মানুষের কাছে ছিলেন অনিবার্য। তাঁর ভরাট কণ্ঠ, স্বতন্ত্র গায়কি আর আবেগময় পরিবেশনায় রবীন্দ্রসংগীতকে তিনি বাঙালি মধ্যবিত্তের সংকীর্ণ সাংস্কৃতিক পরিসর থেকে নিয়ে এসেছিলেন সাধারণ মানুষের জীবনে, পৌঁছে দিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়।

রবীন্দ্রসংগীতের ‘শুদ্ধতা’ রক্ষার নামে তৎকালীন প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন একা, ঋজু মেরুদণ্ড নিয়ে এবং আপসহীনভাবে। সমালোচনা, বিতর্ক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধার মুখে বারবার ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন, তবু থেকেছেন নিজ দর্শন ও বিশ্বাসে অবিচল। অর্থ, খ্যাতি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির মোহ—এসবের কোনো কিছুই দেবব্রত বিশ্বাসকে কোনোদিন স্পর্শ করেনি। যা তিনি অন্তরে ধারণ করতেন, সেই বিশ্বাসেই গেয়ে গেছেন আমৃত্যু।

১৯১১ সালের ২২ আগস্ট অবিভক্ত বাংলার বরিশালে এক ব্রাহ্ম পরিবারে জন্ম নেন দেবব্রত বিশ্বাস। বাবা দেবেন্দ্রকিশোর বিশ্বাস, মা অবলাদেবী। পিতৃপুরুষের ভিটা ছিল কিশোরগঞ্জের ইটনা গ্রামে। তাঁর ঠাকুরদা ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করায় গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন, সেই বিতাড়নের উত্তাপ পরবর্তী প্রজন্মেও পোহাতে হয়েছে দেবব্রতকে। রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের চোখে তিনি ছিলেন ‘ম্লেচ্ছ’। শৈশবের এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও অপমান পরবর্তী জীবনে অন্যায় ও সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি জুগিয়েছিল তাঁকে। ‘জর্জ’ নামেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত—জন্মের সময় ইংল্যান্ডের সিংহাসনে ছিলেন পঞ্চম জর্জ, সেই অনুষঙ্গেই বাবা এই নামটি রেখেছিলেন।

দেবব্রত বিশ্বাস
কিশোরগঞ্জ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক, আনন্দমোহন কলেজ হয়ে কলকাতা সিটি কলেজে আই.এ., তারপর বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষে ১৯৩৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ পাস করেন। ১৯৩৪ সালে যোগ দেন হিন্দুস্থান ইনসিওরেন্স কোম্পানিতে, যা পরে জীবনবিমা নিগম নামে পরিচিতি পায়। সেখান থেকেই ১৯৭১ সালে অবসর নেন। সংগীতে কোনো প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না তাঁর—মায়ের কণ্ঠে ব্রহ্মসংগীত ও রবীন্দ্রসংগীত শুনতে শুনতে বেড়ে ওঠা। ১৯২৮ সালে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের শতবার্ষিকী উৎসবে প্রথমবার দেখেন রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে নিবিড় পরিচয় ঘটে রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীচৌধুরানীর হাত ধরে। পাম অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে পিয়ানোর সাহচর্যে তিনি রবীন্দ্রসংগীতের ভেতরের আলোটুকু অনুভব করতে শিখলেন। বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ শৈলজারঞ্জন মজুমদারের পরিচালনায় কনক দাসের সঙ্গে এইচএমভি থেকে প্রকাশিত “সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান” এবং “হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব”—গান দুটির মাধ্যমে প্রথম দ্বৈত রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ডের মাধ্যমে এই জগতে তাঁর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু।

১৯৩৮ সালে পিতৃবিয়োগ ও তীব্র আর্থিক অনটনের মধ্যেই দেবব্রতর জীবনচেতনা বামপন্থার দিকে দৃঢ়ভাবে ঝুঁকতে শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাংলায় গড়ে ওঠা প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মঞ্চে তিনি নিয়মিত গাইতে শুরু করলেন স্বদেশি গান ও রবীন্দ্রনাথের দেশাত্মবোধক গানগুলো। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় কবি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের লেখা গানে সুরারোপ করলেন দেবব্রত—ঐতিহাসিকভাবে যার নাম হলো ‘নবজীবনের গান’।

দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিয়েছিলেন সেই গান। বিজন ভট্টাচার্যের নাটক ‘নবান্ন’ এবং গণনাট্য সংঘের ছায়ানাটক ‘শহীদের ডাক’-এর সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও তিনি ছিলেন প্রথম সারির সৈনিক। পণ্ডিত রবিশঙ্কর, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের মতো প্রতিভাধর মানুষদের সঙ্গে এই সময়েই গড়ে ওঠে গভীর বন্ধুত্ব। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় গণনাট্যের তরুণ গায়ক কলিম শরাফীকে নিজের ঘরে লুকিয়ে রেখে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। ১৯৪৭-এর দেশভাগ তাঁর মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে—যে পূর্ববঙ্গের মাটিতে জন্ম ও শৈশব, তা রাতারাতি ‘বিদেশ’ হয়ে যাওয়া তিনি মানসিকভাবে মেনে নিতে পারেননি।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীতে নতুন রেকর্ডের মাধ্যমে রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের পর জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছালেন দেবব্রত। কিন্তু ১৯৬৪ সাল থেকে বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের সঙ্গে দ্বন্দ্ব তীব্র আকার নিতে থাকে। বোর্ড একের পর এক রেকর্ড অননুমোদিত করতে লাগল—কখনো অতিরিক্ত বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের অভিযোগে, কখনো গানের গতি নিয়ে, কখনো স্বরলিপির প্রশ্নে। কিন্তু ঠিক কোথায় কী ভুল, তা কখনো স্পষ্ট করা হয়নি। বিচারটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অনুভূতিনির্ভর, কোনো সুনির্দিষ্ট মানদণ্ডের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়।

দেবব্রত বিশ্বাস
১৯৭৪ সালে বোর্ডের সেক্রেটারিকে লেখা দীর্ঘ চিঠিতে দেবব্রত রবীন্দ্রনাথের নিজের কথাই তুলে ধরলেন। গায়কের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ দিলীপকুমার রায়কে বলেছিলেন, “গানের গতি অনেকখানি তরল, কাজেই তাতে গায়ককে খানিকটা স্বাধীনতা তো দিতেই হবে।” আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটি তিনি তুলে ধরলেন— “সরস্বতীকে শিকল পরাইলে চলিবে না… সংসারে কেবল মাঝারির রাজত্বেই এমন নিদারুণতা সম্ভব।”

যে রবীন্দ্রনাথের নামে নিয়মের বেড়াজাল তৈরি হচ্ছিল, সেই রবীন্দ্রনাথই যে শিল্পীর স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন—এই সত্যটাই বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন দেবব্রত। ১৯৭৭ সালে বোর্ড কিছুটা নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিলেও পরিস্থিতি আর আগের জায়গায় ফেরেনি। দেবব্রত তখন জানালেন, বোর্ডের পরীক্ষকরা বয়সে ও অভিজ্ঞতায় তাঁর চেয়ে কম—তাদের হাতে নিজের ব্যাখ্যা ও প্রকাশের স্বাধীনতা তুলে দিতে রাজি নন তিনি। তিনি চেয়েছিলেন বিশ্বস্ত বন্ধু জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রকে রেকর্ড অনুমোদনের দায়িত্ব দেওয়া হোক। কিন্তু ২৫ অক্টোবর ১৯৭৭-এ জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র প্রয়াত হলেন—বন্ধ হয়ে গেল শেষ সম্ভাবনাটুকুও। বোর্ডের অনুমোদন না পেয়ে রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে রচিত নিজের ‘গুরু বন্দনা’ গানটিও প্রকাশ করতে পারেননি তিনি। পাহাড়সম বেদনার ভার বুকে নিয়ে ১৯৮০ সালে লিখলেন— “কে রে হেরা আমারে গাইতে দিল না।”

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্বদেশে স্বজনদের লড়াইয়ের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ও সুরে দুটি গান রেকর্ড করেন দেবব্রত বিশ্বাস। ওপার বাংলার জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন তিনি। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশেও একাধিকবার এসে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেছেন।

জীবনের শুরুতে যিনি ছিলেন ‘ম্লেচ্ছ’, শেষ জীবনে নিজেই বললেন রবীন্দ্রসংগীত জগতে তিনি হয়ে গেছেন ‘হরিজন’। এই বিচিত্র পরিহাসই তাঁর গোটা জীবনের প্রতীক হয়ে উঠল। ১৯৮০ সালের ১৮ আগস্ট, ৬৯ বছর বয়সে কলকাতায় দেবব্রত বিশ্বাসের দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের অবসান ঘটে। দেবব্রত বিশ্বাস আজও প্রথাবিরোধী মানুষের কাছে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর শিল্পীস্বাধীনতার এক অবিনশ্বর নাম— সফদার হাশমির মতো তাই দেবব্রত বিশ্বাসকে নিয়েও একই কথাই বলা যায়, দেবব্রত বিশ্বাস মানে জাগা, জেগে থাকা, জাগানো।





Source link

×

FIFA World Cup Live

FIFA World Cup সরাসরি দেখতে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।

📺 লাইভ দেখুন
error: Content is protected !!
🔴 LIVE html