মধুরাগ
বেতার বলয়, পাতার বাঁশি, সুরটি বাজুক-বাজতে থাকুক
দুই হৃদয়ে জড়াক যাদুর আলো!
এই হাতের পরে হাত ঠেকাতে চাও, চোখের পরে চোখ?
ঠোঁটের মাঝে ঠোঁট ছোঁয়াতে চাও,
বুকের মধ্যে বুক? এই মোম শরীরে তাপ হতে কী চাও,
গলিয়ে দিতে পূর্ণ মোমের দেহ?
জানো তো সই? মনের বাড়ির আল পেরিয়ে-ঘাট পেরিয়ে,
পিচঢালা পথ, আগুন দুপুর, উদোম
দু’পা, উঠোন-বাড়ি মাঠ পেরিয়ে তবেই দূরে দেহের বাড়ি ওই!
ধ্যান
মহোদয়,
আমি সেই মুসাফির যার ঘর-বার নেই, নেই শেকড়ের টান,
স্থায়ী থিতুস্থান!
ঘুরেঘুরে সব পবিত্রালয় থেকে উড়িয়েছি ধ্যানের মাস্তুল ঐ
হৃদয় বরাবর!
সূর্য ডুবুক, নামবে না আবেদনে উত্থিত মোনাজাত-আপনার
হৃদয় কাবার থেকে—
যদ্যপি আসন ছেড়ে আঙুলে জড়াবেন চিবুক, আদরে ছুঁবেন
এই পদ্মদুহাত!
আমার ধ্যানের শরীরে জড়াবে বৃক্ষ শেকড়, চুলে বাঁধবে জটা,
ভালোবাসবেন সেই বিশ্বাসে!
মৌন মাতম
১
এই সত্যের অপেক্ষাতেই কেটে গেছে অগণিত কাল
প্রতিটি মৃত্যুর পূর্বে শেষ চাওয়া আর প্রতিবার প্রাপ্ত
জীবনের শর্ত দিয়েছিলাম, তাকাবেন। চলে গেল
শতেক জীবন, কী দীর্ঘ এই অতিক্রান্ত সময়!
স্থিরচিত্রে সামনে তাকানো চোখ দুটি এখন আমার
চোখে। কাটুক সময়, এই মিথ্যে সত্য হবে!
পৃথিবীর আয়ুব্যাপী আমি জন্ম নেব পুনঃ পুনর্বার।
২
আমি এক অদ্ভুত বধির,
যথার্থ বাক্য উচ্চারণে সমস্যা নেই,
কণ্ঠ কিয়দ কর্কশ হলেও হাজারো শব্দেরা প্রতি
অবসরে জড়ো হয় দুই ঠোঁটের মাঝে, কথারা আন্দোলনে
মত্ত মনোময়, কিন্তু আমি এক অদ্ভুত বধির! আপনার জন্য
সৃষ্ট অযুত অক্ষরের একটিও বলতে পারি না বাক্য ও বয়ানে!
বিকেল
আগুন হয়ে জ্বলে আছো মস্তিষ্কের সলতায়
মোমের শরীর গলে গলে হয়েছে নিঃশেষ!
কোথাও তো নিয়ে চলো, সখা!
যেখানে সবুজ ঘাস, ছাতিমের ছায়া,
পায়ের কাছে স্বচ্ছপ্রবাহের জলাধার,
বাতাসের বন্দিশে উড়বে খুলে দেওয়া চুল
চারিপাশে নিরঙ্কুশ নীরবতা,
নিয়ে চলো…!
ওই কাঁধে মাথা রেখে কাটাবো স্বর্ণসময়
দাও যদি,
হাতখানি ছুঁয়ে থাকবার অনুমতি দিও শুধু,
প্রতিজ্ঞা প্রিয়তম, কিচ্ছুটি চাইব না আর!
যতই মরে যাই প্রেমে! যতই মরে যাই কামে!
চাইব না, আদরে ছুঁয়ে দাও কপোল,
কপালে আঁকো চুম্বন টিপ!
স্পর্শে শীতল করো পুড়ে যাওয়া শরীর শ্মশান!
চাইব না,
জোঁক হয়ে জমে যাই তোমার যকৃতে
শুষে নিতে সবখানি সুখ! চাইব না—
মুখখানি লেপটে থাকি তোমার বুকের বিছানায়!
অনুকাব্য-৩
ব্যথাগুলো কথা হয়ে যাক
কথাগুলো কবিতা!
অক্ষরে অক্ষরে যদি কেউ
বুঝে না প্রণয়
কথায়ও বুঝবে সে কী!
যেজন দেখে না হৃদয়ের মেঘ
জমেছে কতটা মনের খাতায়
যেজন দেখে না কতটা অশ্রু
জমেছে দুটি চোখের পাতায়
সেজন থাক, ভালো থাক!
ভালো থাক মাঘীশীতে
হৃদয় কুসুম
ভালো থাক জুড়ে থাকা
উষ্ণতা ওম
ভালো থাক নিশিরাত
ভালো থাক ঘুম
ভালো থাক এইপাড়ে
রাত নির্ঘুম!
পঁচিশের পাঁয়তারা
মানুষেরা হারিয়েছে সৃষ্টিরস!
খোদার ঘোষণালব্ধ শ্রেষ্ঠত্ব—
এখন বরঞ্চ হায়েনার হাতে থাক!
সন্ন্যাসী সময় যাক পার হয়ে যাক!
আহা স্রষ্টা! আহা সৃষ্টি!
মানুষ অবয়ব! মাংসাশী!
এই যে শবদেহ! মৃতের অতীত,
তারা কি ছিল না তোমার স্বজ্ঞাতি?
কোনোদিন দেখা হয়নি চোখাচোখি?
কথা হয়নি মুখোমুখি অথবা আত্মায়?
আহা কি উত্তাপ! দাবানল!
উদ্গিরণ! জ্বলন্ত রক্তগিরি!
জ্বলে যায়, পুড়ে যায় তাপেরও শরীর!
কে কোথায় কেড়ে নেয় কবরের মাটি!
কাফনের ধুতি! গলিত শবদেহ সম্মান!
কোথায় বসেছে কবে মৃতের বিচারালয়?
প্রান্তিক পঁচিশ, মনে রেখো, মনে রেখো
ইতিহাস! এইখানে একদিন হয়েছিল
লাশের কারাবাস!
একাঙ্ক
এখনো যদি জমতে থাকি ভারী মেঘের মতন,
তা কেবল বাতাসের সক্ষমতায়।
উড়াতে উড়াতে আমাকে জড়ো করেছে
এক ফোঁটা তিলের ন্যায়,
তারপর উড়িয়েছে বহু যুগ।
অসময়ে যত্রতত্র যে অন্ধকার দেখো
সে আর কেউ নয় ‘আমি’ একদিনের শরৎ! স্বচ্ছ,
উচ্ছল আর উড়ন্ত কার্পাসের মতো হলকা কাশফুল!
অশ্রুর মতো গলে যাই যদি—
তবেই অমৃতস্বাদে গিলে যাবে সমগ্র আমায়।
ফোঁটা ফোঁটা রতি হয়ে যদি ঝরি—
সে রস শোষণের ক্ষমতায় তুমি শুধু মাঝারি আঁধার,
অগণিত ’আমি’ কেবল ব্যর্থ, উপচে পরা অথবা
অন্যান্য হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবো পাত্রের বাহিরে!
এ দায় একপক্ষের, নিদেন কালেও তা তোমার নয়।
এ জল জমিয়েছি আমি,
তিলকে পরিণত করেছি তাণ্ডবে।
বিন্দুতে বসিয়েছি বর্গমাইল, কেবল একা…!
তাই লবণাক্ত হই, নোনা হয়ে বিস্তীর্ণে ছড়ালে
পিঁপড়েরা আর আন্দোলনের বাহানা বানাবে না।
কাচের কন্যা
বারোয়ারি বেলির মতো সুগন্ধে মাতাই না অন্দর আয়তন
দলবেঁধে হই না প্রস্ফুটিত,
ক্ষণবাদে ম্লান হবো জেনে শুভ্র রং ভান ধরে মাতাল করি না
এলেবেলে বয়ে আসা ভোর
বাতায়নে তবু আমি হই কামসঙ্গী-গণিকারমণ! হায় বেলি,
তুমি যক্ষের রেখে আসা প্রিয়া,
পবিত্র অলকাভূষণ! কালো তিল ছোঁয় না তোমারও শরীর
আমার কপালজুড়ে ঝুলে থাকে
অন্ধকার টিপ, কপোলজুড়ে লেপটে থাকে কাজলের কালি!
খেদ
অবনত হয়ে আছি পতনের পানে,
কালো চামড়ার গভীরে যে মন
তার শুশ্রূষায় একটিও সারেনি প্রাণ,
বাঁচেনি কোনো মুমূর্ষু!
রূপান্তরিত শৈবাল হয়ে আছড়ে যাই বালুময় তট,
কেউ নেই প্রবাল ভাবে!
সহস্র সম্ভারে নিজেকে প্রমাণ করা
দুঃসাধ্য বৈ তো কিছু নয়!
প্রেমেরা কেবল পৌত্তুলিক হয়,
ব্রাহ্মণের পূজার থালায় ঘিয়ে জ্বলা প্রদীপ যেমন!
কালো বলে দীর্ঘ শরীরে কোনোদিন ভাসেনি
একটিও সৌভাগ্য তিলক! হাত পেতে পাইনি প্রেম!
কালো বলে বন্ধ ছিল দেবতার দ্বার,
কপাট খুলেনি সে কোনোকালে!
শীতের ধ্রুপদী
কোথায় একটা বেজে যায় স্বর্গসঙ্গীত!
বাদকবিহীন টুপটাপ শিশির পতন,
সারাবেলা মাছরাঙা সুর, রাইফুল গান!
ভোর বুঝি?
কোথাও একটা কুয়াশাআঁধার ঠেলে ঠেলে
উঁকি দেয় সূর্যমুখী হলুদাভ ডিমের কুসুম!
নাকি আলোর আঁধিয়ার, দিনের রাজকুমার?
নিষ্পাপ, তুলতুলে আদুরে অনুভব এক?
হরেক কল্পসুন্দর ঠেলে ঠেলে একদিন রূপার
পালকি নিয়ে আমার দুয়ারে জমে যায় শীতের
সকাল! অদৃশ্য চার বেহারা— আলোরঙ শরীর,
তুলোসম ভর, স্পর্শে আসে না! যেনবা ধোঁয়া,
মরীচিকা মেঘ!
যাচ্ছে বেহারা! যাচ্ছে, ঝুলিয়ে রূপার পালঙ্ক!
কেটে কেটে কুয়াশা প্রাচীর, সর্ষেরক্ষেত, হলুদ
পরাগ! আমি যেন তুষারকুমারী, শীতের ধ্রুপদী
কোনো এক! গায়েমেখে সূর্যের সোনালি পারদ
গুটি গুটি পায়ে পৌঁছে গেছি স্বর্গের সীমানায়!