ঢাকাSaturday , 6 June 2026
  1. অন্যান্য
  2. আবহাওয়া
  3. খেলা
  4. চাকরি
  5. জীবনযাপন
  6. তথ্যপ্রযুক্তি
  7. প্রেস রিলিজ
  8. বাণিজ্য
  9. বাংলাদেশ
  10. বিনোদন
  11. বিশ্ব
  12. ভিডিও
  13. মতামত
  14. রাজনীতি
  15. শিক্ষা

চারদিনে শিশু রামিসা হত্যার বিচার ‘বিরল দৃষ্টান্ত’

UttorbongoBD
June 6, 2026 10:00 pm
Link Copied!


রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার বিচার কার্যক্রম মাত্র চার কার্যদিবসে শেষ হয়েছে। অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্ক শেষে আগামী ৭ জুন রায়ের দিন ধার্য করেছেন আদালত।

বিচার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ক্ষেত্রে এত কম সময়ে বিচার কার্যক্রম শেষ হওয়ার নজির অত্যন্ত বিরল।

ঘটনার শুরু গত ১৯ মে। সেদিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা বাসা থেকে বের হলে প্রতিবেশী সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার কৌশলে তাকে তাদের কক্ষে নিয়ে যান বলে অভিযোগ। পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতো রামিসা। সে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। একই ভবনের একটি সাবলেট কক্ষে থাকতেন সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্না।

মামলার তদন্তে উঠে এসেছে, রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে শরীর থেকে মাথা এবং দুই হাত কাঁধের কাছ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, মরদেহ খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয় এবং বাথরুমের একটি বালতিতে রাখা হয় কাটা মাথা। এরপর সোহেল রানা জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু করেন পরিবারের সদস্যরা। একপর্যায়ে সোহেল ও স্বপ্নার কক্ষের সামনে রামিসার স্যান্ডেল দেখতে পান তার মা। ডাকাডাকি করে কোনও সাড়া না পেয়ে প্রতিবেশীদের নিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে মাথাবিহীন মরদেহ এবং বাথরুমের বালতিতে কাটা মাথা দেখতে পান। এ সময় স্বপ্না আক্তার কক্ষের ভেতরেই উপস্থিত ছিলেন।

ঘটনার দিন রাতেই তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ১৯ মে দিবাগত রাতে, অর্থাৎ ২০ মে শিশুটির বাবা হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

আদালতে আসামির স্বীকারোক্তি

পরদিন আদালতে হাজির করার পর সোহেল রানা স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মতি দেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান তার জবানবন্দি রেকর্ডের আবেদন করেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালত জবানবন্দি গ্রহণ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। একইদিন পৃথক আবেদনের পর সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হক।

মামলাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। দেশজুড়ে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি গুরুত্ব পায়। একটি জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানক এ ঘটনার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন এবং সর্বোচ্চ শাস্তির কথা উল্লেখ করেন।

এ ঘটনার পর ২২ মে ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা দেন যে, বার থেকে কোনও আইনজীবী আসামিদের পক্ষে দাঁড়াবেন না। তবে বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় কোনও আসামি আইনজীবী না পেলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার পক্ষে আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করা। সেই বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র আসামিদের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ দেয়। একইসঙ্গে মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করে অভিযোগপত্র দাখিলের জন্যও সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়।

পাঁচদিনের মাথায় চার্চশিট

ঘটনার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায়, ২৪ মে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই অহিদুজ্জামান দুই আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। ওইদিনই ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হকের আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত বলে মত দেন এবং তা ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর নির্দেশ দেন। একইদিন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনম অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন।

এরপর ঈদুল আজহার ছুটি শুরু হলেও মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তির স্বার্থে বিচারিক কার্যক্রম চালু রাখা হয়। আদালতের অবকাশকালীন কার্যক্রম সীমিত থাকলেও এ মামলার শুনানির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

চার কার্যদিবসে বিচারিক কার্যক্রম শেষ

১ জুন আদালত দুই আসামির উপস্থিতিতে অভিযোগ গঠন করেন। একইসঙ্গে ২ জুন বাদীসহ ১৮ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সমন জারি করা হয়।

২ জুন মামলার বাদীসহ ১৬ জন সাক্ষী আদালতে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দেন। আসামিদের উপস্থিতিতেই তাদের জেরা ও সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর বিচারক ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য দিন ধার্য করেন।

৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে প্রধান আসামি সোহেল রানা নিজের দায় স্বীকার করে আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন বলে আদালত সূত্র জানিয়েছে। অন্যদিকে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার নিজেকে নির্দোষ দাবি করে অব্যাহতি চান। শুনানি শেষে বিচারক ৪ জুন যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ধার্য করেন।

৪ জুন রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুল রহমান দুলু এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী মূসা কালিমুল্লাহ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে, ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণে দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তাই তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত। অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী সোহেল রানার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং স্বপ্না আক্তারের জন্য সাত বছরের সাজা প্রার্থনা করেন। সবশেষে আদালত আগামী ৭ জুন রায়ের দিন ধার্য করেন। অভিযোগ গঠন থেকে যুক্তিতর্ক শেষ হওয়া পর্যন্ত পুরো বিচার কার্যক্রম মাত্র চার কার্যদিবসে সম্পন্ন হয়।

এ নিয়ে বিচার অঙ্গনে চলছে নানামুখী আলোচনা। অনেকে বলছেন, এটা কি বাংলাদেশের ইতিহাসে হত্যা মামলার সবচেয়ে দ্রুততম বিচার?

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ‘‘বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ক্ষেত্রে এত কম সময়ে বিচার সম্পন্ন হওয়ার ঘটনা আগে দেখা যায়নি। তার মতে, এ মামলার প্রতি মানুষের ব্যাপক প্রত্যাশা ছিল এবং বিচারিক ব্যবস্থা সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়েছে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘শিশু নির্যাতনবিরোধী আইন সংশোধনের পর বিচার শুরু হলে ধারাবাহিকভাবে মামলা পরিচালনার বিধান কার্যকর হওয়ায় দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হয়েছে।’’

কম সময়ে বিচারের কিছু দৃষ্টান্ত

বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুল রহমান দুলুও এটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে ব্যতিক্রমী দ্রুত বিচার হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে তিনি বলেন, ‘‘ভারতবর্ষে ১৮৮২ সালে নদীয়ার মুলুক চাঁদ চৌকিদারের ৯ বছরের মেয়ে হত্যা মামলার বিচার একদিনে শেষ হয়েছিল বলে ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখ পাওয়া যায়।’’

ঐতিহাসিক নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৮৮২ সালের ১৬ মে নদীয়া জেলা দায়রা আদালতে মামলাটির বিচার একদিনে সম্পন্ন হলেও সেটিই পুরো বিচারিক প্রক্রিয়ার সমাপ্তি ছিল না। পরবর্তী সময়ে অভিযুক্ত কলকাতা হাইকোর্টে আপিল করেন। পরে মামলাটি আলিপুর সেশনস কোর্টে স্থানান্তরিত হয়ে ২১ জুলাই ১৮৮২ পুনরায় বিচার শুরু হয়। ফলে সম্পূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া অন্তত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলেছিল।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দ্রুত বিচার সম্পন্ন হওয়ার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নজির রয়েছে। ভারতের মহারাষ্ট্রের নাগপুরে ২০১৩ সালে একটি ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত হত্যা মামলার বিচার ২৩ দিনের মধ্যে শেষ করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। কর্ণাটকের চিত্রদুর্গায় এক নারী হত্যা মামলায় মাত্র ১৩ দিনের মধ্যে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেওয়া হয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এসব ঘটনাকে দেশটির দ্রুততম হত্যা মামলার বিচারগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করেছে।

অপরদিকে ভারতে একদিনে বিচার সম্পন্ন হওয়ার যে জাতীয় রেকর্ডের কথা বেশি আলোচিত হয়, সেটি হত্যা মামলা নয়। বিহারের আরারিয়ায় একটি পকসো মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্ক, দোষী সাব্যস্তকরণ এবং সাজা ঘোষণা, সবকিছু একই দিনে সম্পন্ন হয়েছিল।

বাংলাদেশেও দ্রুত বিচার সম্পন্ন হওয়ার সাম্প্রতিক উদাহরণ রয়েছে। মাগুরার শিশু আছিয়া ধর্ষণ-হত্যা মামলার বিচার ১৪ কার্যদিবসে সম্পন্ন হয়েছিল, যা দেশের ইতিহাসে দ্রুততম সম্পন্ন হওয়া হত্যা মামলাগুলোর একটি হিসেবে আলোচিত হয়। সেই তুলনায় রামিসা হত্যা মামলার বিচার আরও কম সময়ে শেষ হয়েছে।

তবে আইনজ্ঞদের মতে, বিচার দ্রুত হওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই ন্যায়বিচারের মৌলিক শর্তগুলোও সমানভাবে নিশ্চিত করতে হয়। অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, আইনজীবীর সহায়তা, সাক্ষীদের জেরা এবং প্রমাণ উপস্থাপনের অধিকার নিশ্চিত করেই দ্রুত বিচার পরিচালনা করতে হয়।

রামিসা মামলায় রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীর মাধ্যমে সেই সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে, রামিসা হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম বাংলাদেশের বিচার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠেছে। তবে এটি শুধু দ্রুত বিচারের উদাহরণ নয়, বরং শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের দ্রুত প্রতিক্রিয়া, জনমতের চাপ, আইন সংশোধনের প্রভাব এবং বিচারিক ব্যবস্থার সক্ষমতারও একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন দেশবাশীর দৃষ্টি ৭ জুনের রায়ের দিকে।





Source link

🔴 LIVE