বগুড়ায় যমুনা নদীর ভাঙনরোধে গত দেড় দশকে দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এরপরও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অভাবে অধিকাংশ প্রকল্প কাঙ্ক্ষিত সুফল বয়ে আনেনি। সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে গত ১৯ বছরে অন্তত দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়েও ভাঙন ঠেকানো যায়নি। এর মধ্যে নতুন করে আরেকটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে পাউবো। যার ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ২০০ কোটি টাকা।
এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় লোকজন। তারা বলছেন, গত ১৯ বছরে দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও যমুনা নদীর ভাঙন থামছে না। পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙনরোধে আবারও নতুন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। বিগত সরকারের সময়ে নদী ভাঙনরোধের নামে প্রকল্প থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। সঠিকভাবে কাজ না হওয়ায় যমুনার ভাঙনে বসতভিটা, ফসলি জমি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিলীন হয়েছে। ভিটামাটি ও জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে হাজারো পরিবার। এখনও ঝুঁকিতে আছে বহু পরিবার।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বগুড়া অংশে যমুনা নদী ৪৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রবাহিত হলেও ডান তীর রক্ষায় কাজ হয়েছে ১৯ কিলোমিটারজুড়ে। বাকি ২৬ কিলোমিটার নদী এখনও অরক্ষিত থাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। শুধু ডানতীর নয়, নদীর দুইপাড়ও ভাঙছে সমানতালে। ভাঙনরোধে বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড ছয়টি স্পার, একটি গ্রোয়েন বাঁধ ও দুটি হার্ডপয়েন্ট নির্মাণ করেছে। এ ছাড়া ছয়টি ক্রসবার ও একটি ফিসপাস নির্মাণ করা হয়েছে।
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, ভাঙনরোধে প্রায় সাড়ে ৯ কিলোমিটার নদী তীর প্রতিরক্ষায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে নতুন করে বগুড়া জেলার যমুনা নদীর তীর সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন নামে একটি প্রকল্পের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে যমুনা নদীর ডান তীর ভাঙন কমানো সম্ভব হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া যমুনা নদীটি বগুড়া অংশে ৪৫ কিলোমিটারজুড়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদীর শুরু থেকে ডান তীরে ভাঙন সবচেয়ে বেশি হলেও এখন বাম তীরও ভাঙছে। বগুড়া অংশে ৪৫ কিলোমিটারের মধ্যে ১৯ কিলোমিটার নদীর তীর প্রতিরক্ষার কাজ সম্পন্ন করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ২০০০ সাল থেকে শুরু করে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১৯ বছরে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নদী ভাঙনরোধে ছয়টি স্পার, একটি গ্রোয়েন বাঁধ, দুটি হার্ডপয়েন্ট নির্মাণ করা হয়েছে। নদী ভাঙনের কবল হতে রক্ষা পেতে ২০০২ সালে সারিয়াকান্দির হাটশেরপুর ইউনিয়নে হাসনাপাড়া বাজারের সামনে ৫৫৮ মিটার স্পার নির্মাণ করা হয়। এই ইউনিয়নের নিজবলাইল বাজারের সামনেও একইসঙ্গে একই ধরনের আরও একটি স্পার নির্মাণ করা হয় ওই বছর।
এ ছাড়া ধুনট সীমানা থেকে সারিয়াকান্দির হাটশেরপুর ইউনিয়নের হাসনাপাড়া বাজার পর্যন্ত ২০০৮ সাল হতে ২০১৮ সাল পর্যন্ত যমুনা নদীর ডানতীর সংরক্ষণের কাজ করা হয়। এর মধ্যে ২০০৬ সালে কালিতলা গ্রোয়েন বাঁধ হতে পারতিতপরল পর্যন্ত দুই হাজার মিটার এবং দেবডাঙা পয়েন্টে ১ হাজার ২০০ মিটার তীর সংরক্ষণ কাজ হয়েছে। ২০১৬ সালে রৌহাদহ হতে মথুরাপাড়া পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার তীর সংরক্ষণকাজ করা হয়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ড বগুড়ার উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যমুনা নদীর ভাঙনরোধে ইতিমধ্যে আমরা ছয়টি ক্রসবার ও একটি ফিসপাস নির্মাণ করেছি। বাকি ২৬ কিলোমিটার নদী এখন পর্যন্ত অরক্ষিত অবস্থায় আছে। যেখানে ভাঙন অব্যাহত আছে। ভাঙনরোধে সাড়ে নয় কিলোমিটার নদী তীর প্রতিরক্ষার জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে নতুন করে বগুড়া জেলার যমুনা নদীর তীর সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন নামে একটি প্রকল্পের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে।’
তিনি জানান, ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-সোনাতলা উপজেলার পাকুল্ল্যা, সারিয়াকান্দি উপজেলার কামালপুর ও ধুনট উপজেলার শহরাবাড়ি এবং ভান্ডারবাড়ি এলাকা। বর্তমানে উজান থেকে নেমা আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে এসব এলাকার বসতবাড়ি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। সেখানে ভাঙনরোধে সাড়ে নয় কিলোমিটার নদী তীর রক্ষার জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রকল্প প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে।
তবে সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটশেরপুরের আব্দুল আজিজ প্রামাণিক, সিরাজুল ইসলাম মইনুল হোসেন বলেন, বিগত সময়ে যমুনা নদীর ডান তীর রক্ষায় যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়, সেগুলোর বেশিরভাগই লুটপাট করা হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বন্যা শুরু হলেই জরুরি কাজের নামে লাখ লাখ টাকা বরাদ্দ এনে দুর্নীতি করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। এক শ্রেণির ঠিকাদার স্বল্প পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করে এখন কোটিপতি বনে গেছেন।
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, নতুন প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ২০০ কোটি টাকা। প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাল ধরা হয়েছে চলতি বছরের জুলাই থেকে আগামী ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্পটির মধ্যে রয়েছে যমুনা নদীর ডান তীরে বিভিন্ন স্থানে প্রায় সাড়ে নয় কিলোমিটার তীর প্রতিরক্ষার কাজ। দুই কিলোমিটার তীর প্রতিরক্ষা কাজের মেরামত ও পুনর্বাসন। ধুনট উপজেলার শহরাবাড়ি ও বানিয়াজান স্পার পুনর্বাসন। সাড়ে তিন কিলোমিটার যমুনা নদীর ড্রেজিং ও বগুড়া অংশে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পুনর্বাসন ও বাঁধ মেরামত। প্রকল্পটির বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনের সুপারিশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বগুড়া আয়োজিত গণশুনানির সুপারিশসমূহ, জেলা পানিসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্তের আলোকে পুনঃগঠিত ডিপিপির ওপর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি যাচাই সভা অনুষ্ঠিত হয়। যাচাই সভার সিদ্ধান্তে পুনঃগঠিত ডিপিপি গত ১৪ মে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে নদীভাঙন প্রতিরোধের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থাপনা, জনবসতি এবং কৃষিজমি রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে পাউবো।
এ বিষয়ে বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নতুন প্রকল্প অনুমোদন ও যমুনা নদীর ডান তীর রক্ষায় বাঁধ পুনর্বাসন কাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বগুড়া জেলার সোনাতলা, সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলা এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলায় নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনকবলিত এলাকায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। নতুন প্রকল্পটি অনুমোদন হলে ভাঙনরোধে স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হবে।’
প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নদী রক্ষা প্রকল্পের কাজের কোনও দুর্নীতির খবর আমার জানা নেই। যদি কেউ দুর্নীতির চেষ্টা করেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’