ঢাকাSunday , 19 July 2026
  1. অন্যান্য
  2. আবহাওয়া
  3. খেলা
  4. চাকরি
  5. জীবনযাপন
  6. তথ্যপ্রযুক্তি
  7. প্রেস রিলিজ
  8. বাণিজ্য
  9. বাংলাদেশ
  10. বিনোদন
  11. বিশ্ব
  12. ভিডিও
  13. মতামত
  14. রাজনীতি
  15. শিক্ষা
আজকের সর্বশেষ সবখবর

হুমায়ূন-স্মৃতির ঐশ্বর্য

UttorbongoBD
July 19, 2026 10:40 am
Link Copied!


কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তার ‘জীবনস্মৃতি’-তে ‘স্মৃতি’ নিয়েই স্পষ্টাস্পষ্টি বলে গেছেন, “স্মৃতির পটে জীবনের ছবি কে আঁকিয়া যায় জানি না। কিন্তু যেই আঁকুক সে ছবিই আঁকে। অর্থাৎ যাহাকিছু ঘটিতেছে, তাহার অবিকল নকল রাখিবার জন্য সে তুলি হাতে বসিয়া নাই। সে আপনার অভিরুচি-অনুসারে কত কী বাদ দেয়, কত কী রাখে। কত বড়োকে ছোটো করে, ছোটোকে বড়ো করিয়া তোলে। সে আগের জিনিসকে পাছে ও পাছের জিনিসকে আগে সাজাইতে কিছুমাত্র দ্বিধা করে না। বস্তুত তাহার কাজই ছবি আঁকা, ইতিহাস লেখা নয়।” সত্যিই তো তাই! জীবনের তুচ্ছতাকে যারা মহৎ করে তুলতে পারেন অনুভূতির আবরণে, তাদের জীবনস্মৃতি কি কেবল ইতিহাস হয়? না, নিশ্চয়ই। শুধু ছবি নয়, রসপূর্ণ সংগীত, কাব্য কিংবা সোনার প্রতিমার নৃত্যে তা অনুরণন হয়; হয় আত্মার ক্রন্দন—এক যুগ হতে অন্য যুগে পাওয়া যার বেঁচে থাকার স্পন্দিত শিহরন। হুমায়ূন-স্মৃতির ঐশ্বর্য এমন; যেন অদ্ভুত নস্টালজিক, মেলানকোলিক সুর হয়ে কথা কয় প্রাণের ভেতর। তার স্মৃতিচারণের ভঙ্গিটি ছিল ভীষণ জাদুকরী; উদাসী ও বিষণ্ন, রসপূর্ণ তো বটেই। জীবনের ছোটোখাটো ঘটনা, পারিবারিক আনন্দ-বেদনা, ভ্রমণ আর জীবনসংগ্রামের গল্পগুলোকে এমন ভঙ্গিতে সাজিয়েছেন যা পড়তে পড়তে পাঠক মুখোমুখি হন নিজের ধূসর অতীতের সঙ্গে। ফুরোয় কথা, ফুরোয় না স্বাদ।

শুরুটা হয়েছিল আশির দশকের শেষের দিকে এবং তা আমৃত্যু এক অদ্ভুত মায়ায় প্রবহমান ছিল। মহাত্মা গান্ধী তার ‘দ্য স্টোরি অব মাই এক্সপেরিমেন্টস উইথ ট্রুথ’ গ্রন্থে নিজের জীবনের ভুল, দুর্বলতা ও সত্যের অন্বেষণকে এক চরম নির্মোহ ও পবিত্র আত্মোপলব্ধির আলোয় মেলে ধরেছেন। ঠিক তেমনি এক তীব্র নস্টালজিক বোধ থেকে হুমায়ূন আহমেদও স্মৃতির মধ্য দিয়ে নিজেকে বিভাজিত করেছেন বহু খণ্ডে। আত্মস্মৃতিতে নিজেকে তিনি কখনো অতিমানব হিসেবে উপস্থাপন করেননি, বরং নিজের ভুলত্রুটি, সীমাবদ্ধতা এবং অতি সাধারণ আবেগগুলোকে এত স্পষ্ট ও অকপটে প্রকাশ করেছেন যে, পাঠক সহজেই সত্যতা পেয়েছে তার আত্মার নিবিড় গোপন কথাগুলোর মাঝে। তার স্মৃতিচারণ হাসায় কখনো, কাঁদায় কখনো; কখনো আবার সময়কে দেখায় গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের স্মৃতির বিষাদ গণিকাদের মতো। আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি পড়ার উত্তেজনাও পাওয়া যায় সে বিস্মৃতির অতলে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন তার অর্ধেক জীবন নিয়ে, হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন তার পুরো জীবনেরই উপাখ্যান। একদম শুরুর দিকে ‘এলেবেলে’-র দুই খণ্ডে লেখক তার প্রাত্যহিক জীবনের নানা হাস্যরসাত্মক, অদ্ভুত ও সাধারণ ঘটনাকে অত্যন্ত রম্য ও প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরলেও, তার ভেতরে সূক্ষ্ম একাকী মানুষটাকে আলাদা করা যায় তখন থেকেই। প্রথাগত আত্মজীবনীর পরিধিকে আরও বিস্তৃত করে যখন লিখলেন ‘হোটেল গ্রেভার ইন’, সুদূর মার্কিন মুলুক এলো চোখের সম্মুখে। নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে গবেষণাকালীন প্রবাস জীবনের একাকিত্ব, তীব্র শীত, খণ্ডকালীন চাকরির বিচিত্র অভিজ্ঞতা যেন মহাকালের ধুলোয় ধূসর হয়ে যাওয়ার প্রকোপ হতে বাঁচিয়ে এনেছেন তিনি। গ্রন্থটি পড়ার সময় পাঠকের মনে হবে তারা এমন এক মানুষের জীবন-যুদ্ধের চড়াই-উতরাই দেখছেন যার সঙ্গে অপরিচয় নেই কোনো আপন-পর কারো।

হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতির ভূমিতে সবচেয়ে গভীর ও নান্দনিক স্থান জুড়ে রয়েছে তার শৈশব ও কৈশোরের সোনালি দিনগুলো। একজন সৃজনশীল মানুষের বেড়ে ওঠার পেছনে তার শৈশবের পরিবেশ কতটা ভূমিকা রাখে, তা হুমায়ূন-স্মৃতি না পড়লে অনুধাবন করা কঠিন। তার বাবা ফয়জুর রহমান ছিলেন পুলিশের একজন কর্মকর্তা, যার চাকরির সুবাদে পরিবারটিকে বারবার বদলি হতে হয়েছে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। এই যাযাবর জীবন হুমায়ূন আহমেদ ও তার ভাইবোনদের সামনে খুলে দিয়েছিল অফুরন্ত বিস্ময়ের জগৎ আর সে জগৎ হতে আমরাও পেয়েছি অজস্র বিস্ময়ের ভাগ। রবীন্দ্রনাথ যেমন তার ‘ছেলেবেলা’ গ্রন্থে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে হারিয়ে যাওয়া শৈশব আর ভোরের আলোর মতো মায়াবী দিনগুলির এক অপরূপ চিত্রপট এঁকেছেন, কবি শামসুর রাহমানের ‘স্মৃতির শহর’ ও ‘কালের ধুলো’-য় যেমন পাওয়া যায় পুরান ঢাকার অলিগলির বিচিত্র সব জীবন, তেমনি হুমায়ূন আহমেদের ‘আমার ছেলেবেলা’ গ্রন্থটিও আমাদের ঘুরিয়ে আনে সিলেট, জগদ্দল, পঞ্চগড়, রাঙামাটি, চট্টগ্রাম, বগুড়া, কুমিল্লা ও পিরোজপুরের মতো বৈচিত্র্যময় জনপদে। হুমায়ূনের শৈশব ও কৈশোরের বন্ধনহীন বিহঙ্গ-জীবন অতীতের যে কোমল রূপ দেখায়, সে রূপের সঙ্গে জীবনের অপ্রাপ্তির কোনো যোগ নেই। তিনি মূলত সাহিত্যের সব ফর্মে যে একজন সফল গল্পকারই হয়ে উঠতে চেয়েছেন, স্মৃতিকথা বর্ণনে সে আকাঙ্ক্ষাই প্রবল। ফলত দীর্ঘ দিবস-দীর্ঘ রজনীর বিরহব্যথার আগেও যে গল্প জমেছিল স্মৃতির খাতায়, সে গল্প বলার জন্য তার প্রয়োজন ছিল শত-সহস্র রাত। তাই ‘আমার ছেলেবেলা’ গ্রন্থের যা কিছু বলা হয়ে ওঠেনি, তার সমাপ্তি ঘটিয়েছেন ‘কিছু শৈশব’ গ্রন্থে। বইটি পড়তে পড়তে পাঠক হারিয়ে যেতে পারবে অচিন গহিন পথে। যে পথে কিছুদূর এগুতেই ভিজতে পারবে জ্যোৎস্না জলে আর একটু গেলেই বৃষ্টির অপূর্ব উচ্ছ্বাস। এ বইয়ের পাতায় পাতায় সন্ধান আছে টিনের চালা ঘরের, এর আগল খোলা দ্বারে যে মানুষটার মুখ দেখা যায় সে বড্ড অপরিপক্ব কেউ, যার কাছে কখনোই পৌঁছায় না জীবন-যুদ্ধে নামার শমন। মফস্বলের ধুলোমাখা পথ আর ঘোর লাগা দুপুরে হাঁটতে হাঁটতে জগদ্দলের গভীর অরণ্যের মাঝে তিনি আমাদের দেখান অদ্ভুত এক বাড়ি। যে বাড়ির সামনে বয়ে চলে কাচের মতো স্বচ্ছ জলের নদী আর বহুদূরে কুয়াশায় ঢাকা কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় অবধারিত খেলা করে সোনালি উজ্জ্বল রোদ। প্রকৃতির নির্জনতা আর রূপকথার মতো পরিবেশে আমরা তাকে বেড়ে উঠতে দেখেছি, দেখেছি প্রেমে—ফলত পেয়েছি এক বিস্ময়কর মানবিক জাদুকর।

তবে শৈশবের অনাবিল আনন্দের সমান্তরালে জীবনে পরম বেদনার অধ্যায়গুলোকেও তিনি তার স্মৃতিচারণের ক্যানভাস থেকে দূরে রাখেননি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং তার বাবার নির্মম মৃত্যু তার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ট্র্যাজেডি। স্বাধীনতা যুদ্ধের সেই বিভীষিকাময় দিন এবং বাবার স্মৃতিকে উৎসর্গ করে জীবনের শেষভাগে রচনা করেন অত্যন্ত আবেগঘন বই ‘একাত্তর এবং আমার বাবা’। এই গ্রন্থে একদিকে যেমন উঠে এসেছে যুদ্ধকালীন তীব্র অনিশ্চয়তা, অতিপ্রাকৃত ভয় ও এক মধ্যবিত্ত পরিবারের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই, তেমনি অন্যদিকে ফুটে উঠেছে একজন সৎ, দেশপ্রেমিক ও সংস্কৃতিমনা পুলিশ কর্মকর্তার পোর্ট্রেট, যিনি নিজের জীবন দিয়েও নিজ আদর্শ ও মাটিকে ভালোবাসতে দ্বিধাগ্রস্ত হননি। বইটি পড়তে গেলে মনে হবে এলি উইজেলের লেখা ‘নাইট’ নামক আত্মস্মৃতি পড়ছি। হলোকাস্ট বা নাৎসি বন্দিশিবিরে বেঁচে থাকার ভয়ংকর অভিজ্ঞতা বলেছিলেন তিনি। হুমায়ূন বলেছেন ৭১-এর দমবন্ধ অসহনীয় স্মৃতি। যুদ্ধকালে প্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকা সকল মানুষের স্মৃতি যেন একই বেদনার, আতঙ্কের ও প্রিয়জন হারাবার হাহাকারে পূর্ণ। হুমায়ূন-জীবনের সবচেয়ে ভারী ও বিষাদময় স্মৃতি অধ্যায়টি পাওয়া যায় ‘লীলাবতীর মৃত্যু’ গ্রন্থে। তার কন্যাসন্তান লীলাবতীর অকাল মৃত্যুর গভীর শোক ও হাহাকার কীভাবে তার পিতৃহৃদয়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছিল, তার সঙ্গে মৃত্যু, ধর্ম, আধ্যাত্মিকতার বিচিত্র প্রসঙ্গের প্রতি সাবলীল বক্তব্য আছে এই গ্রন্থে। বইটি পড়ার সময় পাঠকের বোধে পরিণত ভাবনার উদয় হওয়াটাই স্বাভাবিক।

হুমায়ূন আহমেদ নিজেকে প্রায়শই ‘গর্তজীবী’ মানুষ বলে দাবি করতেন। তিনি মনে করতেন, ভ্রমণের তীব্র শারীরিক কষ্ট সহ্য করে দেশ-বিদেশ ঘোরার চেয়ে নিজের কল্পনার চোখ দিয়ে অনেক বেশি সুন্দরভাবে বিশ্বকে চিনে নেওয়া যায়। কিন্তু তার যাপিত জীবনের বাস্তব চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। জীবনের এক দীর্ঘ সময় তিনি পৃথিবীর নানা দেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন এবং সেই ভ্রমণের বিচিত্র অভিজ্ঞতাগুলোকে লিপিবদ্ধ করেছেন বেশ কয়েকটি বইয়ে। ‘মে ফ্লাওয়ার’ এবং ‘অনন্ত অম্বরে’ বই দুটিতে আমেরিকাকে বিচিত্র বৈচিত্র্যে এঁকেছেন তিনি। আমেরিকার রুক্ষ কিন্তু অপূর্ব সুন্দর মোজাবে মরুভূমি পাড়ি দেওয়া কিংবা বিশ্ববিখ্যাত গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের গিরিখাতে দীর্ঘ ৪৫ মাইল হেঁটে হুয়ালপাই ট্রাইব ইন্ডিয়ান রিজারভেশন থেকে পাওয়া সার্টিফিকেট—সবই তার অসম সাহসিকতার সঙ্গে পরিব্রাজক রূপের প্রকাশ। তিনি যখন ওয়াশিংটন ডি.সি. এর স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউটে গিয়ে অ্যাপোলোর আনা চাঁদের পাথর স্পর্শ করেছিলেন, তখন তার মনের ভেতর যে গভীর আবেগ ও রোমাঞ্চের সৃষ্টি হয়েছিল, তা তার অনুভবের প্রগাঢ় প্রকাশে স্পন্দিত করেছে পাঠককে। এই ভ্রমণের প্রতিটি কদম, প্রতিটি নতুন মানুষের সঙ্গে আলাপন তাকে সমৃদ্ধ করেছিল এবং তার ভেতরে জন্ম দিয়েছিল বিচিত্র স্বাদের কথকতার। তার খুব প্রিয় একটি শহর ছিল আমেরিকার আটলান্টিক সিটি। জীবনের নানা কঠিন ও জটিল সন্ধিক্ষণে, যখনই তিনি মানসিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছেন, তখনই প্রিয় মানুষদের সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েছেন মুক্তির আশায়। তার ‘দেখা না দেখা’ বইটিতে তিনি তার দেখার জগতের সঙ্গে না দেখার জগতের যে অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন তা পাঠককে মোহিত করে নতুন বোধে। আমেরিকা ছাড়াও হুমায়ূন আহমেদ ভারত, থাইল্যান্ড, তুরস্কের ইস্তাম্বুল, শ্রীলঙ্কা ও চীনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও শহর চষে বেড়িয়েছেন। তার ‘পায়ের তলায় খড়ম’ বইটিতে আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসসহ চীন, ইস্তাম্বুল পরিদর্শনের সচিত্র বিবরণ পাওয়া যায়। নিজস্ব রসাত্মক ও সাবলীল ভঙ্গিতে একইভাবে ‘রাবণের দেশে আমি এবং আমরা’-তে তিনি তার শ্রীলঙ্কা ভ্রমণের বিচিত্র অভিজ্ঞতার গল্প শুনিয়েছেন। কিন্তু ভ্রমণের সব অভিজ্ঞতাই যে সবসময় মধুর হতো, তা নয়। যেমন তীব্র শীতের দেশ সুইডেন তার মনের কোণে এক গভীর বিষাদের জন্ম দিয়েছিল। যে বিষাদে সুইডেনকে তিনি বলেছেন আত্মাহীন দেশ। তীব্র ঠান্ডার মাঝে মানুষের ভেতরের উষ্ণতার অভাবে সে দেশ পরিদর্শনে ব্যথিত হয়েছেন তিনি। তিনি সন্ধান করেছেন বিচিত্রতার। যা তিনি পেয়েছেন তা-ই পরম মমতায় তুলে ধরেছেন তার বিভিন্ন গ্রন্থে, যার মধ্যে ‘যশোহা বৃক্ষের দেশে’ উল্লেখযোগ্য একটি সুন্দর প্রয়াস। এই গ্রন্থটিতে প্রকৃতির সান্নিধ্যে ভ্রমণপিপাসু মনের পরিতৃপ্ত সৌন্দর্য আরোহণ হয়, তা পাঠক পেয়েছে পুরো মাত্রায়। সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো হয়তো তার ভ্রমণ গদ্যে নানা দেশের সংস্কৃতি, রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থার গভীর চুলচেরা বিশ্লেষণ অনুপস্থিত, কিন্তু মুজতবা আলীর মতোই একজন মুগ্ধ বা কৌতূহলী পর্যটকের দৃষ্টি রয়েছে সবগুলো ভ্রমণ গদ্যেই। বহু দেশ ছেঁকে দেখা এসব লেখায় ইতিহাস, দর্শন, বহুভাষিক জ্ঞান এবং গভীর পাণ্ডিত্যের বদলে হুমায়ূন আহমেদের সরল মানবিক আবেগ ও স্নেহ-তৃষ্ণ অনুভূতিই এই গ্রন্থগুলোকে স্বতন্ত্র করেছে। তিনি কেবল একজন পরিব্রাজকই ছিলেন না, ছিলেন একজন অত্যন্ত সফল ও জনপ্রিয় নাট্যকার এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা। তার চলচ্চিত্র নির্মাণের পেছনের শ্রম, আনন্দ, হতাশা এবং শুটিং সেটের নানা চমকপ্রদ ও নেপথ্যের ঘটনা নিয়ে রচিত তার বিশেষ বই ‘ছবি বানানোর গল্প’। একটি চলচ্চিত্র তৈরি করতে গিয়ে একজন পরিচালককে কতটা কাঠখড় পোড়াতে হয় এবং কীভাবে প্রতিকূলতার মাঝেও সৃজনশীলতা বজায় রাখতে হয়, তা এই বইটিকে অনন্য করে তুলেছে।

হুমায়ূন আহমেদ নিজেকে কখনো বাইরে খুঁজতে চাননি। ভেতরেই খুঁজেছেন বারবার। সেই খুঁজে ফেরা জীবনের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ব্যর্থতা, হতাশা, একাকিত্ব ও সংকটের গল্পগুলো কখনো আড়াল করার চেষ্টাও করেননি তিনি। তার ‘আমার আপন আঁধার’ কিংবা ‘এই আমি’ গ্রন্থ দুটিতে নিজের মনের অন্তস্তলের দ্বন্দ্ব, হতাশা ও মানসিক সংকটে যে হুমায়ূনকে দেখতে পাওয়া যায়, সে হুমায়ূন ক্লান্ত, পারিপার্শ্বিক আঘাতে চূর্ণ। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা একজন লেখকের পেছনের একাকিত্ব ও ব্যক্তিগত বেদনার দুঃখগুলো এই বইগুলোতে উন্মোচিত করেছে জীবনের এক ভিন্ন পাঠ। এছাড়া ‘সকল কাঁটা ধন্য করে’ বইটিতে তিনি তার জীবনের সব বাধা-বিপত্তি, কুৎসা ও কঠিন সময়কে জয় করে এগিয়ে যাওয়ার গল্পও শুনিয়েছেন। একজন জনপ্রিয় লেখক হিসেবে তথাকথিত বুদ্ধিজীবী মহলের তীব্র সমালোচনা ও অবমূল্যায়ন তাকে কতটা ব্যথিত করত, এবং সেই বেদনাকে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি কীভাবে অবিরাম লিখে গেছেন, তার যন্ত্রণাকাতর বিবরণ এই বইগুলোর পাতায় পাতায়। তার ‘বসন্ত বিলাপ’ ও ‘হিজিবিজি’ বই দুটোর প্রতিটি ছত্রে ছত্রে মিশে আছে বিষণ্নতাকে জয় করে জীবনকে ভালোবাসার নতুন চিরন্তন সূত্র। হুমায়ূন আহমেদ নিজেকে দুর্বল ভাবতেন না বলেই তীব্র রসবোধ দিয়ে সকল সমালোচনা আর কটূক্তিকে একপাশে সরিয়ে রেখে কেবল সাধারণ পাঠকের ভালোবাসাকেই জীবনের একমাত্র পরম সত্য বলে গ্রহণ করেছিলেন।

তার জীবনের শেষের দশকের বইগুলোতে স্মৃতিচারণের ঢং কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে আরও বেশি পরিণত ও শান্ত রূপ ধারণ করেছে, যার মধ্যে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন বিদায়ের সুর লুকিয়ে ছিল। এ সময় তিনি তার স্মৃতিকথার বইগুলোর নাম দিতে শুরু করেন তার প্রিয় সব লেখার সরঞ্জামের নামে। ‘বলপয়েন্ট’, ‘কাঠপেন্সিল’, ‘ফাউন্টেনপেন’ এবং ‘রঙপেন্সিল’—এই চারটি বই মূলত তার জীবনের শেষ ভাগের এক একটি অমূল্য রত্ন। বিমল করের ‘উড়ো খই’-এর মতো হুমায়ূন আহমেদের এই টুকরো স্মৃতির গদ্য পড়ার পর শেষ হয়েও হয় না শেষ, রয়ে যায় কিছু একটা অশেষ।

র‌্যান্ডি পাউশ-এর দেওয়া বিশ্বখ্যাত শেষ বক্তৃতা ‘দ্য লাস্ট লেকচার’-এর মতো হুমায়ূন আহমেদ তার জীবনের শেষ দিনগুলোর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাস জীবন ও চিকিৎসার কঠিন সময়ের অত্যন্ত চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন ‘নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ’ বইটিতে। মরণব্যাধি ক্যান্সারের কেমোথেরাপির তীব্র যন্ত্রণা ও শারীরিক কষ্টের মাঝেও নিউইয়র্কের চমৎকার রোদ, চারপাশের প্রকৃতির সৌন্দর্য আর মানুষের প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসা কীভাবে তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, তার এক অনন্য ও নস্টালজিক আত্মকথন এই গ্রন্থটি। মৃত্যুর খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়েও একজন মানুষ কীভাবে এতটা নির্ভার ও উদাসী হয়ে লিখতে পারেন, তা এই বইটি না পড়লে বিশ্বাস করা কঠিন।

মূলত হুমায়ূন আহমেদের আত্মজৈবনিক গ্রন্থগুলোতে স্মৃতিকথার মাধ্যমে যে জীবন দেখিয়েছেন সে জীবন আসলে কোনো জটিল তত্ত্ব নয়; জীবন হলো এক একটি অতি সাধারণ মুহূর্তের সমষ্টি, যা পরম মমতায় ভালোবাসলে সুন্দর হয়ে ওঠে, আবার একই সঙ্গে তা এক বুক হাহাকারও রেখে যায়। আজ তিনি সশরীরে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া সেই স্মৃতির বিপুল ঐশ্বর্য আমাদের শেখায়— “Keep your face always toward the sunshine—and shadows will fall behind you.”





Source link

×

FIFA World Cup Live

FIFA World Cup সরাসরি দেখতে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।

📺 লাইভ দেখুন
error: Content is protected !!
🔴 LIVE html