দীর্ঘদিন ধরে মনে করা হয়েছে, ‘ইলিয়াড’ ও ‘ওডিসি’ নামে দুটি মহাকাব্য একজন অন্ধ কবি লিখেছিলেন। কিন্তু আজ অনেক গবেষকের ধারণা ভিন্ন। তাদের মতে, হোমার হয়তো একজন ব্যক্তি নন। হয়তো বহু প্রজন্মের কবি ও গায়কদের সম্মিলিত কণ্ঠের প্রতীক। এই প্রশ্নই সাহিত্যজগতে পরিচিত ‘হোমেরিক প্রশ্ন’ নামে।
দুই হাজার সাতশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ‘ইলিয়াড’ ও ‘ওডিসি’ মানুষের কল্পনা ও সাহিত্যকে প্রভাবিত করে আসছে। যুদ্ধ, পরিবার, ভালোবাসা, দেবতা, বীরত্ব ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা অভিজ্ঞতা এই দুই মহাকাব্যে একসঙ্গে উঠে এসেছে। তাই এগুলো শুধু প্রাচীন সাহিত্য নয়, বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম ভিত্তিও।
কিন্তু এত বিশাল ও জটিল দুটি মহাকাব্য কি সত্যিই একজন মানুষের লেখা? আঠারো শতকে জার্মান পণ্ডিত ফ্রিডরিখ অগাস্ট উলফ এই প্রশ্ন তুলেছিলেন। তার মতে, বিভিন্ন সময়ে রচিত অনেক লোকগাথা ও মৌখিক কাহিনি পরে একত্র হয়ে এই মহাকাব্যের রূপ পেয়েছে। এরপর থেকেই হোমারের পরিচয় নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়।
এই বিতর্কে বড় পরিবর্তন আনেন মার্কিন গবেষক মিলম্যান প্যারি। তিনি বলকান অঞ্চলে গিয়ে মৌখিক কাব্যগানের ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা করেন। সেখানে তিনি দেখেন, নিরক্ষর গায়কেরাও দীর্ঘ দীর্ঘ মহাকাব্য তাৎক্ষণিকভাবে পরিবেশন করতে পারেন। তারা পুরোনো গল্প, ছন্দ ও নির্দিষ্ট বাক্যবন্ধ ব্যবহার করে নতুনভাবে গান তৈরি করেন। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্যারি বলেন, ‘ইলিয়াড’ ও ‘ওডিসি’ও সম্ভবত একই ধরনের মৌখিক ঐতিহ্য থেকে জন্ম নিয়েছে।
বর্তমানে অধিকাংশ গবেষক একমত যে, এই মহাকাব্য দুটি প্রথমে মৌখিকভাবে রচিত ও প্রচারিত হয়েছিল। পরে কোনো এক সময় সেগুলো লিখিত আকারে সংরক্ষিত হয়। তবে একজন অসাধারণ কবি সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যকে একত্র করে চূড়ান্ত রূপ দিয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে মতভেদ এখনো রয়েছে।
অনেক গবেষকের মতে, ‘হোমার’ আসলে একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নাম। অসংখ্য মানুষের গল্প, স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও কণ্ঠ মিলেই এই দুই মহাকাব্যের জন্ম। তাই হোমারকে একজন মানুষের বদলে একটি দীর্ঘ সাহিত্যিক ধারার প্রতীক হিসেবেও দেখা যায়।
হোমারের রহস্য শুধু গবেষকদেরই আকর্ষণ করেনি। যুগে যুগে কবি ও লেখকেরাও তাকে নতুনভাবে কল্পনা করেছেন। কেউ তার আত্মার সঙ্গে কথোপকথনের গল্প লিখেছেন, কেউ তাকে কবিতার চিরন্তন অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখেছেন। রোমান কবি এনিয়াস থেকে ইতালীয় কবি পেত্রার্ক, গ্রিক কবি সোলোমোস, আলেকজান্ডার পোপ কিংবা আইরিশ কবি প্যাট্রিক কাভানাহ—অনেকেই তাদের লেখায় হোমারকে ফিরিয়ে এনেছেন।
সম্ভবত এ কারণেই হোমার আজও শুধু একজন প্রাচীন কবির নাম নয়। তিনি বিশ্বসাহিত্যের এক চলমান উত্তরাধিকার। তার পরিচয় নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই, কিন্তু তার প্রভাব নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। একজন হোন বা অনেকজন—হোমার এখনো মানুষের কল্পনা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম শক্তিশালী উপস্থিতি।