ঢাকাTuesday , 21 July 2026
  1. অন্যান্য
  2. আবহাওয়া
  3. খেলা
  4. চাকরি
  5. জীবনযাপন
  6. তথ্যপ্রযুক্তি
  7. প্রেস রিলিজ
  8. বাণিজ্য
  9. বাংলাদেশ
  10. বিনোদন
  11. বিশ্ব
  12. ভিডিও
  13. মতামত
  14. রাজনীতি
  15. শিক্ষা
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, শহরের শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ দেখলেন- হাওরের শিক্ষাবঞ্চনার জবাব কবে দেবেন?

UttorbongoBD
July 20, 2026 7:20 pm
Link Copied!


রাজধানীতে টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং শিক্ষামন্ত্রীর একটি অবমাননাকর মন্তব্যকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক। যে কোনো শিক্ষার্থীকে হেয় করে বলা শব্দ গ্রহণযোগ্য নয়। একজন শিক্ষামন্ত্রী কেবল প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন; তিনি রাষ্ট্রের শিক্ষা-দর্শনের মুখপাত্র। তাই তার প্রতিটি শব্দের রাজনৈতিক, নৈতিক ও সামাজিক দায় রয়েছে। তিনি ক্ষমা চেয়েছেন, সেটি ইতিবাচক। কিন্তু এই বিতর্ক আমাদের সামনে আরো বড় একটি প্রশ্ন এনে দিয়েছে-রাষ্ট্র কি কেবল শহরের শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ দেখেই বিচলিত হয়, আর হাওরাঞ্চলের শিশুদের দীর্ঘস্থায়ী শিক্ষাবঞ্চনাকে নিয়তি বলে মেনে নেয়?

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় শিক্ষা এখনো অনেক শিশুর জন্য মৌলিক অধিকার নয়, বরং প্রতিদিনের সংগ্রাম। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে বছরের ছয় থেকে আট মাস নৌকাই একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। উত্তাল ঢেউ, ঝড়, বজ্রপাত, কাদামাখা পথ আর অনিরাপদ নৌযাত্রা পেরিয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছানোই তাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এই বাস্তবতা নতুন নয়; বছরের পর বছর একই চিত্র। অথচ জাতীয় শিক্ষা পরিকল্পনায় এই বাস্তবতার প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়।

সারা দেশে শিক্ষার হার ৭০% এর বেশি হলেও হাওরের বহু উপজেলায় তা ২০ থেকে ৪০% এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। সুনামগঞ্জের শাল্লায় শিক্ষার হার মাত্র ২০.১০% এবং ধর্মপাশায় প্রায় ৪০.৩০%। আরো উদ্বেগজনক হলো, মেয়েদের শিক্ষায় সুনামগঞ্জ দেশের অন্যতম পিছিয়ে থাকা জেলা। বান্দরবনের পরই এ জেলার অবস্থান। জেলার সামগ্রিক শিক্ষার হার প্রায় ৩১% হলেও মেয়েদের শিক্ষার হার ২৪% এরও নিচে। অনুপযোগী শিক্ষা ক্যালেন্ডার, দারিদ্র্য, সামাজিক সচেতনতার ঘাটতি এবং দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা এই বৈষম্যকে আরো গভীর করেছে।

পরিসংখ্যান আরো কঠিন বাস্তবতার কথা বলে। শুধু সুনামগঞ্জেই ১৬৬টি গ্রামে কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। প্রায় ৬০০টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই, শত শত সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য। সাতটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা খোলা আকাশের নিচে ক্লাস করে, ১৯টি বিদ্যালয়ের ভবন পরিত্যক্ত এবং ১২৯টি বিদ্যালয় ঝুঁকিপূর্ণ। যারা বিদ্যালয় তদারকি করবেন, তাদেরও বহু পদ বছরের পর বছর শূন্য। এ অবস্থাকে কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা বললে বাস্তবতার প্রতি অবিচার করা হবে; এটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় অবহেলার প্রতিফলন।

হাওরের শিশুরা শুধু কষ্ট করে বিদ্যালয়ে যায় না, অনেক সময় সেই পথে প্রাণও হারায়। ২০১০ সালের ৮ জুন ধর্মপাশার শৈলচাপড়া হাওরে ট্রলারডুবিতে আট স্কুলশিক্ষার্থীসহ ১৬ জনের মৃত্যু পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সেই ঘটনার পরও প্রতিটি বিদ্যালয়ের জন্য নিরাপদ নৌযান নিশ্চিত হয়নি, বর্ষাকালীন শিক্ষার্থী পরিবহনের কোনো কার্যকর জাতীয় কর্মসূচিও গড়ে ওঠেনি। শোক প্রকাশ করা হয়েছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান আসেনি।

হাওরাঞ্চলের শিক্ষা উন্নয়নে প্রায় ৯৪৫ কোটি টাকার সরকারি প্রকল্পও সেই অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির একটি উদাহরণ। “হাওর এলাকার নির্বাচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত)” প্রকল্পের আওতায় সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার ১৬টি দুর্গম উপজেলায় বহুতল একাডেমিক ভবন, ছাত্রাবাস-ছাত্রীনিবাস, শিক্ষক ডরমেটরি ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। উদ্দেশ্য ছিল নিরাপদ ও বৈষম্যহীন শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রায় ৬৫% কাজ শেষ হওয়ার পর প্রকল্পটির গতি কার্যত থেমে যায়। প্রায় ৯৪৫ কোটি টাকার বিপরীতে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে মাত্র প্রায় ৩৮৩ কোটি টাকা। মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হলেও মাঠপর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি এখনো দৃশ্যমান নয়। শিক্ষামন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন থেকেই যায়-এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের বাস্তবায়নে জবাবদিহি কোথায়?

হাওরের শিক্ষাব্যবস্থার সংকট কেবল অবকাঠামোর নয়; এটি বহুমাত্রিক। দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা, বন্যা ও নদীভাঙন, বিদ্যালয়ের স্বল্পতা, দারিদ্র্য, শিক্ষক সংকট, উচ্চ ঝরে পড়ার হার, প্রযুক্তিগত সুবিধার অভাব, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, সচেতনতার ঘাটতি এবং বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত পিছিয়ে পড়ছে। করোনাকালে এই বৈষম্য আরো স্পষ্ট হয়েছে। ইন্টারনেট, ডিভাইস ও বিদ্যুতের সীমাবদ্ধতায় হাজারো শিক্ষার্থী অনলাইন শিক্ষার সুযোগই পায়নি।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রকে কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি-৪) সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত শিক্ষার কথা বলে। কিন্তু সমতলের জন্য তৈরি এক শিক্ষা ক্যালেন্ডার, একই অবকাঠামো ও একই প্রশাসনিক ব্যবস্থা জলমগ্ন হাওরাঞ্চলে কার্যকর হতে পারে না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) দীর্ঘদিন ধরেই বলছে, হাওরের জন্য প্রয়োজন স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পৃথক পরিকল্পনা।

এখানেই শিক্ষামন্ত্রীর জবাবদিহির প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাজধানীর কয়েক দিনের জলাবদ্ধতায় পরীক্ষা নিয়ে যদি জাতীয় বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে, তবে হাওরের যুগযুগ ধরে চলা শিক্ষাবঞ্চনা কেন জাতীয় অগ্রাধিকার হবে না? কেন এখনো হাওরভিত্তিক পৃথক শিক্ষা ক্যালেন্ডার নেই? কেন প্রতিটি বিদ্যালয়ের জন্য নিরাপদ নৌকা নেই? কেন ভাসমান বিদ্যালয়, ইউনিয়নভিত্তিক আবাসিক বিদ্যালয়, জলবায়ু-সহনশীল শিক্ষা অবকাঠামো এবং বিশেষ হাওর শিক্ষা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি?

রাষ্ট্রের এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। হাওর উপযোগী শিক্ষা ক্যালেন্ডার, নিরাপদ নৌ-পরিবহন, ভাসমান ও আবাসিক বিদ্যালয়, স্থানীয় শিক্ষক নিয়োগ, দুর্গম এলাকায় কর্মরত শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, টেকসই বিদ্যালয় ভবন, শতভাগ স্কুল ফিডিং, ডিজিটাল শিক্ষা ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ, দুর্যোগকালীন বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের নিয়মিত সামাজিক নিরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যালয়হীন গ্রামগুলোতে দ্রুত নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলো পুনর্নির্মাণে সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।

আজ রাজধানীর শিক্ষার্থীরা একটি মন্তব্যের জন্য জবাবদিহিতা চাইছে। সেটি তাদের সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু হাওরের মানুষ যদি একদিন প্রশ্ন তোলে- দশকের পর দশক ধরে বিদ্যালয়হীন গ্রাম, শিক্ষকশূন্য স্কুল, অসমাপ্ত উন্নয়ন প্রকল্প, অনিরাপদ নৌযাত্রা এবং শিক্ষাবঞ্চনার দায় কার- তখন সেই প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ রাষ্ট্রের থাকবে না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মৌলিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থতার জন্য রাজনৈতিক ও নৈতিক জবাবদিহি অনিবার্য।

একটি দেশের উন্নয়নকে রাজধানীর উঁচু ভবন দিয়ে নয়, সবচেয়ে প্রান্তিক শিশুর হাতে পৌঁছে দেওয়া শিক্ষার আলো দিয়ে বিচার করা হয়। হাওরের শিশুরা যদি এখনও উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে বিদ্যালয়ে যায়, যদি তাদের শিক্ষাজীবন এখনও রাষ্ট্রের অবহেলার কাছে পরাজিত হয়, তবে আমাদের উন্নয়নের সব পরিসংখ্যানই অসম্পূর্ণ। সময়ের দাবি স্পষ্ট- হাওরকে আর করুণা নয়, সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আর সেই দায়িত্ব পালনের প্রশ্নে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীকে জবাব দিতেই হবে।

 

 রাসেল আহমদ, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও জনপ্রতিনিধি

প্রকাশিত লেখাটি লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।





Source link

×

FIFA World Cup Live

FIFA World Cup সরাসরি দেখতে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।

📺 লাইভ দেখুন
error: Content is protected !!
🔴 LIVE html