ব্যাংকে টাকা রাখা কি এখনও নিরাপদ? প্রয়োজনের সময় নিজের জমা অর্থ তুলতে পারবেন তো? কোনও ব্যাংকে সঞ্চয় করার আগে কী কী বিষয় বিবেচনা করা উচিত? সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন ঘটনা ও পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের মনে এমন অনেক প্রশ্ন তৈরি করেছে।
একদিকে ইসলামি ধারার কয়েকটি ব্যাংক থেকে গ্রাহকের আমানত কমছে। অপরদিকে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সচল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংককে রেকর্ড পরিমাণ তারল্য সহায়তা দিতে হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু ব্যাংকের খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি এবং দীর্ঘদিনের সুশাসনের সংকট নতুন করে সামনে এসেছে। এসব কারণে আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়লেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে সচেতন হওয়াই বেশি জরুরি।
কারণ দেশের সব ব্যাংক একই অবস্থায় নেই। কোনও ব্যাংক শক্তিশালী, কোনোটি মাঝারি অবস্থায়, আবার কিছু ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই নানা সংকটে রয়েছে। তাই ব্যাংকে টাকা রাখার আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা এখন সময়ের দাবি।
কেন ব্যাংকের প্রতি আস্থা এত গুরুত্বপূর্ণ
ব্যাংকিং ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো গ্রাহকের আস্থা। মানুষ বিশ্বাস করে বলেই নিজের সঞ্চিত অর্থ ব্যাংকে জমা রাখে। সেই অর্থের একটি অংশ ব্যাংক ঋণ হিসেবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে বিতরণ করে। ওই ঋণ থেকে আয় করেই ব্যাংক আমানতের বিপরীতে মুনাফা বা সুদ দেয় এবং নিজস্ব কার্যক্রম পরিচালনা করে।
অর্থাৎ ব্যাংকে জমা রাখা সব অর্থ একসঙ্গে ভল্টে রাখা হয় না। ফলে কোনও কারণে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক টাকা তুলতে শুরু করলে সাময়িক তারল্য সংকট তৈরি হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই ব্যাংকিং সংকটের শুরু হয়েছে আস্থার সংকট থেকেই।
বাংলাদেশেও গত কয়েক বছরে কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের ক্ষেত্রে একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে। কোথাও টাকা তুলতে দীর্ঘ লাইন, কোথাও সীমিত উত্তোলন— এসব ঘটনা মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইসলামি ব্যাংকগুলোতে কেন কমলো আমানত
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল শেষে দেশের ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে মোট আমানত ছিল ৪ লাখ ৮ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। মে মাস শেষে তা কমে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৬ হাজার ১৪১ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক মাসে এসব ব্যাংক থেকে ২ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন গ্রাহকরা।
যদিও একই সময়ে প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামিক শাখা ও ইসলামিক উইন্ডোতে কিছু আমানত বেড়েছে। ফলে পুরো ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মোট আমানত কমেছে ৭৫৮ কোটি টাকা।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক ও অনিশ্চয়তা অনেক গ্রাহকের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করে। এর ফলে কেউ কেউ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে নিজেদের আমানত অন্য ব্যাংকে সরিয়ে নেন।
এ ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে, ব্যাংকিং খাতে আস্থা হারানো কত দ্রুত আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
রেকর্ড পরিমাণ তারল্য সহায়তা কেন দিল বাংলাদেশ ব্যাংক
ব্যাংক খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তার তথ্য থেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘মানি মার্কেট ডাইনামিকস’ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত জুন মাসে রেপো, স্ট্যান্ডিং লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) এবং স্পেশাল লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটির মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে মোট ৪ লাখ ১০ হাজার ২০২ কোটি টাকা স্বল্পমেয়াদি অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এক মাসের হিসাবে এটি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এই অর্থের বড় অংশই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফেরত এসেছে। অর্থাৎ এটি স্থায়ী আর্থিক সহায়তা নয়; বরং দৈনন্দিন তারল্য ব্যবস্থাপনার অংশ।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এত বড় অঙ্কের সহায়তা এটাও ইঙ্গিত দেয় যে কয়েকটি ব্যাংক এখনো নিজেদের স্বাভাবিক সক্ষমতায় নগদ অর্থের চাহিদা সামাল দিতে পারছে না।
দেড় লাখ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি কেন উদ্বেগের
সম্প্রতি একীভূত হওয়া পাঁচটি ইসলামি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেনসিক অডিট ও অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ অনুযায়ী, এসব ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি। কয়েকটি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ৯০ শতাংশেরও বেশি।
এর অর্থ হলো, ব্যাংকের সম্পদ হিসেবে যেসব ঋণ কাগজে-কলমে দেখানো হচ্ছে, তার বড় অংশই বাস্তবে আদায় হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন পরিচালনা পর্ষদ বা নতুন নাম দিলেই এই সংকট দূর হবে না। খেলাপি ঋণ আদায়, পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা এবং সুশাসন নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সব ব্যাংক কি একই ঝুঁকিতে?
এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা তৈরি হয়।
ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সব ব্যাংককে একই মানদণ্ডে বিচার করা ঠিক নয়।
অনেক ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ত, মুনাফা ইতিবাচক, তারল্য ভালো এবং গ্রাহকসেবাও স্বাভাবিক রয়েছে। এসব ব্যাংকে নিয়মিত ঋণ আদায় হচ্ছে এবং আমানতের প্রবৃদ্ধিও সন্তোষজনক।
অপরদিকে কিছু ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং আস্থার সংকটে ভুগছে। তাই একটি বা কয়েকটি ব্যাংকের সমস্যা পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার চিত্র নয়।
ব্যাংকে টাকা রাখার আগে কী দেখবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বেশি মুনাফা বা আকর্ষণীয় অফারের দিকে না তাকিয়ে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তিও বিবেচনা করা উচিত।
প্রথমত, ব্যাংকটির সুনাম ও পরিচালনা পর্ষদের স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার, মূলধন পর্যাপ্ততা এবং আর্থিক প্রতিবেদনের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া উচিত।
তৃতীয়ত, কোনও ব্যাংক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যদি নেতিবাচক খবর, নিয়ন্ত্রকের বিশেষ নজরদারি বা নিয়মিত তারল্য সহায়তার তথ্য আসে, তাহলে সেখানে বড় অঙ্কের অর্থ রাখার আগে সতর্ক থাকা ভালো।
চতুর্থত, বড় অঙ্কের সঞ্চয় একটি ব্যাংকে না রেখে প্রয়োজনে একাধিক শক্তিশালী ব্যাংকে ভাগ করে রাখা ঝুঁকি কমাতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব বা যাচাইহীন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত না নেওয়া। বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য, নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন এবং নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুসরণ করা উচিত।
সামনে কী হতে পারে
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক মাস ব্যাংকিং খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ আদায়, লুট হওয়া অর্থ উদ্ধারে অগ্রগতি এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা— এসব উদ্যোগ সফল হলে আমানতকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরে আসতে পারে।
অপরদিকে এসব সংস্কারে গতি না এলে দুর্বল ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তার প্রয়োজনও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
গুজবে নয়, তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে
ব্যাংকে টাকা রাখার আগে শুধু মুনাফার হার দেখলেই হবে না। দেখতে হবে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী, খেলাপি ঋণের অবস্থা কী, পরিচালনায় সুশাসন আছে কিনা এবং গ্রাহকের আস্থা কতটা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত একটি বড় সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সব ব্যাংক সংকটে নেই, তবে কিছু ব্যাংকের দুর্বলতা পুরো খাতের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।
তাই আমানতকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— গুজবে নয়, তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। কারণ আপনার সঞ্চয় শুধু আপনার বর্তমান নয়, আপনার ভবিষ্যতেরও নিরাপত্তা।