ইসলাম ধর্মের অপব্যাখ্যা করে ভূরাজনীতিতে মৌলবাদের কূপ্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। তারই হাত ধরে আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদও নতুন রূপে মাথাচাড়া দিচ্ছে, যা বাংলাদেশের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে। সরকার বলছে, দেশের মাটিকে কোনোভাবেই জঙ্গিবাদী কার্যকলাপের জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ধর্মের নামে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে এবং এর পেছনে আন্তর্জাতিক প্রভাবও থাকতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে অস্থিতিশীলতা তৈরির ষড়যন্ত্রের অভিযোগও রাজনৈতিক মহলে উচ্চারিত হচ্ছে। ইসলামিক শাসনের নামে বাংলাদেশকে জিহাদি কার্যকলাপের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার অপচেষ্টার আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এই নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশ কি সময়মতো কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে?
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী সন্ত্রাসবাদের ক্রমবর্ধমান ও পরিবর্তিত হুমকি মোকাবিলায় আরও জোরালো আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, জঙ্গিবাদীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, এনক্রিপটেড যোগাযোগব্যবস্থা, ভার্চুয়াল অ্যাসেট এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার করে তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত করছে। নিউইয়র্কে তিনি বাংলাদেশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদকে কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশ সমর্থন করবে না এবং দেশের মাটি জঙ্গিবাদীদের ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা রিপোর্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণে আশঙ্কা করা হয়েছে যে, কিছু উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক বাংলাদেশে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে বিদেশি মদদপুষ্ট উগ্রবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা বেড়েছে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং ভয়ের পরিবেশ তৈরির ঘটনাগুলোকে অনেকে এই বৃহত্তর নিরাপত্তা সংকটের অংশ হিসেবে দেখছেন। যদিও এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও বিষয়টি যে নিরাপত্তা আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে, তা স্পষ্ট।
সরকারের পক্ষ থেকেও বিভাজনের রাজনীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন, দেশে নতুন করে বিভাজনের রাজনীতি তৈরির চেষ্টা চলছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ হলেও বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান মর্যাদা রয়েছে এবং ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্মাবলম্বীদের খাটো করার কোনো সুযোগ নেই। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ধর্মীয় সম্প্রীতির পক্ষে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন এবং মৌলবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধেও সতর্কবার্তা দেন।
এদিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মৌলবাদী প্রচারণার ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে ধর্মের অপব্যাখ্যা ছড়িয়ে তরুণদের প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি খবর বেরিয়েছে, মালয়েশিয়ায় জঙ্গিবাদ-সম্পর্কিত ৫৪ শতাংশ মামলায় অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ইসলামিক স্টেট (আইএস) সমর্থিত প্রচারণার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক এবং ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মকে চরমপন্থী মতাদর্শ প্রচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো দেশও এই অনলাইন উগ্রবাদের কারণে নিরাপত্তা সংকটে পড়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের বিস্তার আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ঐতিহাসিকভাবে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার কিছু উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের মধ্যে যোগাযোগের বিষয়টি বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। আইএস-অনুপ্রাণিত কার্যকলাপ সেখানে মৌলবাদকে আরও উসকে দিয়েছে এবং অনলাইনের মাধ্যমে এই নেটওয়ার্কগুলো সীমান্ত পেরিয়ে প্রভাব বিস্তার করছে। ফলে ভূরাজনীতির সঙ্গে ডিজিটাল উগ্রবাদের সম্পর্ক দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।
দক্ষিণ এশিয়াতেও আল-কায়েদাসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের অনলাইন প্রচারণা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে যে, টেলিগ্রাম চ্যানেল ও গ্রুপের মাধ্যমে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে স্থানীয় ভাষায় প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ধর্মীয় গ্রন্থের অপব্যাখ্যা করে তরুণদের উগ্রপন্থায় আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশেও বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রচারণাসামগ্রী ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্মের নামে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের এই কৌশল ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সরকারের পক্ষ থেকে মৌলবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভিন্ন সময়ে মৌলবাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন বলে সরকারি মহল জানিয়েছে। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, বিএনপি মৌলবাদে বিশ্বাস করে না এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকারে বিশ্বাসী। তবে সরকারের সমর্থক মহলের অভিযোগ, কিছু মৌলবাদী রাজনৈতিক শক্তি সরকারের ঘোষিত অবস্থানের বিরুদ্ধে গিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কয়েকজন উগ্রবাদী মতাদর্শে অভিযুক্ত ব্যক্তি মুক্তি পান এবং তাদের পুনরায় সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। একই সময়ে কিছু নিরাপত্তা বিশ্লেষক দাবি করেন, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে এবং বিভিন্ন মৌলবাদী সংগঠনের মধ্যে সমন্বয়ের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। পাকিস্তানসহ বিদেশি গোষ্ঠীর সম্ভাব্য যোগাযোগ নিয়েও বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্রে দাবি প্রকাশিত হয়েছে, যদিও এসব দাবির স্বাধীন যাচাই সব ক্ষেত্রে সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ অতীতে জঙ্গিবাদ দমনে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য দেখিয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর নতুন বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জও বদলে গেছে। তাই কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নয়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গোয়েন্দা সমন্বয়, অনলাইন নজরদারি, ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং সামাজিক সচেতনতা-সবকিছুকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ ধর্মের নামে সহিংসতা কোনো ধর্মেরই শিক্ষা নয়। বাংলাদেশের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং বহুত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা রক্ষায় এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সতর্কতা, আইনের শাসন, প্রমাণভিত্তিক পদক্ষেপ এবং জাতীয় ঐক্য।
তানজিনা আমান তানজুম, ফেলো, ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট এণ্ড ডেভলপমেন্ট
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।