৬০ বছর বয়সী সাবিয়া বেগমের চোখে-মুখে এখন শুধু আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার ছাপ। কয়েক বছর আগেই যমুনার ভয়াল ভাঙনে হারিয়েছেন বসতভিটা। একসময় যেখানে ছিল তার সাজানো সংসার, সেখানে এখন শুধু নদীর উত্তাল স্রোত। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘নদী আমার সবকিছু কাইড়া নিছে। গ্রাম, বাড়িঘর, জমিজমা—কিছুই আর নাই। সবকিছু শেষ। চিন্তায় রাতভর ঘুম আসে না, চোখের পানি ফেলতে ফেলতেই রাত কেটে যায়।’ যমুনা নদীর ভাঙনে সবকিছু হারিয়ে এভাবেই কথাগুলো বলেছেন তিনি।
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও তীব্র স্রোতে সিরাজগঞ্জের চৌহালী, কাজিপুর, শাহজাদপুর ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ নদীতীরবর্তী এলাকায় শুরু হয়েছে ভাঙন। প্রতিদিন নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা ও মানুষের জীবনভর গড়া স্বপ্ন। প্রতিটি ভাঙনের সঙ্গে বাড়ছে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চৌহালী উপজেলার চর সলিমাবাদ গ্রামের অটোরিকশাচালক মোল্লা সাইফুল ইসলামের একমাত্র সম্বল ছিল একটি বসতঘর। ৪ জুন রাতেই সেই আশ্রয়টুকুও যমুনার ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। সাইফুলের মতো গত তিন সপ্তাহে চৌহালী উপজেলার অন্তত ছয় থেকে সাতটি গ্রামের বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অসংখ্য বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও গাছপালা। এখনও ঝুঁকিতে আছে শত শত পরিবার।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, খাস কাউলিয়া ইউনিয়নের ভূতের মোড়, বাঘুটিয়া ইউনিয়নের বিনানুই, রেহাই পুখুরিয়া, দেওয়ানগঞ্জ বাজার ও চর সলিমাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন চলছে। কোথাও কোথাও কয়েকশ ফুট এলাকা নদীগর্ভে চলে গেছে।
চর সলিমাবাদ এলাকার ইউপি সদস্য আব্দুস সালাম জানান, মাত্র দুই সপ্তাহে তার এলাকায় ৩০টিরও বেশি বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন পরিবার ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় রাত কাটাচ্ছে।
চর সলিমাবাদের গৃহবধূ বিলকিস বেগম বলেন, ‘আমরা কাজ করে খেতে পারি। কিন্তু নদীর ভাঙন থামাতে পারি না। একটা স্থায়ী বাঁধ হলে অন্তত সন্তানদের নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে পারতাম।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঘুটিয়া ইউনিয়নের সম্ভুদিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় সম্প্রতি প্রায় ৩০০ মিটার ভূমি একসঙ্গে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ফলে খাসপুখুরিয়া ও বাঘুটিয়া ইউনিয়নের শত শত পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার ও কৃষিজমি হুমকির মুখে পড়েছে। শুধু চৌহালী নয়, কাজিপুর উপজেলার খাস রাজবাড়ী ও নাটুয়ারপাড়া, সদর উপজেলার কাওয়াকোলা চর এবং শাহজাদপুর উপজেলার গালা ও সনাতনী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকাতেও নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে।
নাটুয়ারপাড়ার কৃষক সেরু শেখ, আব্দুল কাদের ও সামছুল শেখ বলেন, যমুনার পানি বাড়া-কমার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দুশ্চিন্তাও বাড়ছে। বছরের পর বছর ফসলি জমি, বসতভিটা ও গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। স্থায়ী কোনও সমাধান না থাকায় দুর্ভোগ কমছে না।
কাওয়াকোলা চরের কৃষক বাদশা শেখ বলেন, ‘সারা বছর কষ্ট করে চাষাবাদ করি। কিন্তু নদী এক মুহূর্তে সবকিছু কেড়ে নেয়। এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা, পরিবার নিয়ে আগামী দিনে কোথায় আশ্রয় নেবো।’
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, মে মাসের মাঝামাঝি থেকে যমুনার পানি দ্রুত বাড়লেও এখন তা বিপদসীমার নিচে রয়েছে। তবে পানি ওঠানামার কারণে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জিওব্যাগ ফেলে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে চরাঞ্চলের ভেতরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের সরকারি পরিকল্পনা নেই।’