৬০ বছর বয়সে শাহরুখ খানকে স্কিনকেয়ারের বিজ্ঞাপনে দেখে অনেকেই অবাক হয়েছেন। ২০২৬ সালে ফক্সটেলের ‘লেট ইয়োর গ্লো থ্রু’ প্রচারের মুখ হয়েছেন বলিউডের এই তারকা। বিজ্ঞাপন প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয়েছে আলোচনা। কেউ এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলে মনে করছেন, আবার কেউ প্রশ্ন তুলছেন, একজন তারকার জনপ্রিয়তাই কি স্কিনকেয়ারের মতো একটি পণ্যের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরির জন্য যথেষ্ট?
তবে শাহরুখ খানকে এই প্রচারের মুখ করা শুধু একজন জনপ্রিয় তারকাকে বিজ্ঞাপনে আনার বিষয় নয়। বরং সৌন্দর্য, বয়স এবং ত্বকের যত্ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কিছু প্রচলিত ধারণাকেও এটি নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
দীর্ঘদিন ধরে স্কিনকেয়ারকে মূলত নারীদের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়েছে। ৪০ ও ৫০-এর দশকের অনেক অভিনেতাকে সৌন্দর্য ও ত্বকের যত্নের বিভিন্ন প্রচারে দেখা গেলেও সেখানে প্রায়ই বয়সের ছাপ কমিয়ে তরুণ দেখানোর বিষয়টি সামনে রাখা হয়।
গত এক দশকে ভিটামিন সি, নিয়াসিনামাইড, পেপটাইড, রেটিনল ও হায়ালুরোনিক অ্যাসিডের মতো উপাদানসমৃদ্ধ বিভিন্ন স্কিনকেয়ার পণ্যের প্রচারে তারকাদের দেখা গেছে। ক্রিম, সিরাম, বডি ওয়াশ, সানস্ক্রিন থেকে শুরু করে তেল বিভিন্ন ধরনের পণ্যের মাধ্যমে ত্বকের যত্নের নানা সমাধান তুলে ধরা হয়েছে। অথচ ব্রণ, কালো দাগ, চোখের নিচের কালচে ভাব, সূক্ষ্ম রেখা বা বলিরেখার মতো ত্বকের সমস্যা শুধু নারীদের নয়. নারী-পুরুষ সবারই হতে পারে।
ফক্সটেলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী রোমিতা মজুমদারের মতে, শাহরুখ খানের সঙ্গে এই অংশীদারিত্বকে শুধুমাত্র পুরুষদের স্কিনকেয়ারের প্রচার হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তবে তাঁকে প্রচারের মুখ করার ফলে ব্র্যান্ডটি আরও বড় এবং বৈচিত্র্যময় দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পেয়েছে।
সৌন্দর্য ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার জগতে অবশ্য এই প্রথম বিজ্ঞাপনে দেখা গেল না শাহরুখ খানকে। এর আগেও লাক্স, ডেনভার ফর মেন, সিনথল, জয় এবং গোদরেজ ম্যাজিক বডিওয়াশের মতো বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্রচারে দেখা গেছে তাঁকে।
কেন ৬০ বছর বয়সী শাহরুখ খান?
ইন্টারন্যাশনাল মার্কেট অ্যানালাইসিস রিসার্চ অ্যান্ড কনসাল্টিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে স্কিনকেয়ারের বাজার ২০২৫ সালে ৯ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ১০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। দ্রুত বাড়তে থাকা এই বাজারে ফক্সটেলের নতুন প্রচার যে একটি বড় পরিকল্পনার অংশ, তা সহজেই বোঝা যায়।
এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রোমিতা মজুমদার জানিয়েছেন, ব্যবসায় চার বছর পার করার পর এবং ১ কোটিরও বেশি ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর পর ব্র্যান্ডটির পরবর্তী ধাপকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।
তাঁর ভাষায়, এমন একটি ব্র্যান্ড তৈরি করাই লক্ষ্য, যার নিজস্ব একটি দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে এবং যা একটি নির্দিষ্ট পণ্য বা পণ্যের শ্রেণির গণ্ডি ছাড়িয়ে মানুষের সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন আলোচনার অংশ হয়ে উঠতে পারবে।
এই ভাবনা থেকেই শাহরুখ খানকে প্রচারের মুখ করা হয়েছে। রোমিতার মতে, তাঁকে বেছে নেওয়ার কারণ শুধু তাঁর বয়স ৬০ বছর হওয়া নয়। তবে তাঁর বয়স সৌন্দর্য ও স্কিনকেয়ারের প্রচারে কারা প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন, সেই দীর্ঘদিনের সীমিত ধারণাকে অবশ্যই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
২৫ বছর বয়সী কোনও তারকার মাধ্যমে তারুণ্য, আকাঙ্ক্ষা বা ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথা তুলে ধরা যায়। কিন্তু দীর্ঘ ক্যারিয়ারে পরিবর্তন, সমালোচনা, সাফল্য, ব্যর্থতা এবং নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া একজন তারকার মাধ্যমে সৌন্দর্য ও বয়স নিয়ে অন্য ধরনের বার্তা দেওয়া সম্ভব। শাহরুখ খানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এত পরিবর্তনের মধ্যেও তিনি নিজের পরিচিত সত্তাকে ধরে রেখেছেন।
রোমিতা মজুমদারের মতে, এই পার্থক্যই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সৌন্দর্যের ধারণা শুধু তরুণীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেই বিস্তৃত ধারণাটি অনেকটাই আড়ালে ছিল।
স্কিনকেয়ার কি শুধু তরুণ দেখানোর জন্য?
ফক্সটেলের নতুন প্রচারাভিযান মূলত অ্যান্টি-এজিং বা বয়সের ছাপ মুছে ফেলার বার্তাকে সামনে আনেনি। কারণ, অ্যান্টি-এজিং নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই প্রশ্নটি প্রায়ই হয়ে যায়, ‘কীভাবে আরও তরুণ দেখাব?’
এই প্রচারের পরিবর্তে নিজের ত্বককে আরও ভালোভাবে বোঝার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ত্বকের ভেতরে কী ঘটছে, কোন সমস্যা কেন তৈরি হচ্ছে এবং সেই সমস্যার মূল কারণের দিকে কীভাবে নজর দেওয়া যায় সেই ভাবনাকেই সামনে আনা হয়েছে।
রোমিতা মজুমদার জানিয়েছেন, এই প্রচারাভিযানটি কোনও নির্দিষ্ট পণ্য বিক্রির জন্য তৈরি হয়নি। আগে ফক্সটেল যখন নির্দিষ্ট পণ্য বা নতুন পণ্য বাজারে এনেছে, তখন সেই পণ্যের উপাদান, কার্যকারিতা এবং কোন ত্বকের সমস্যার সমাধানে এটি সহায়ক হতে পারে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
কিন্তু শাহরুখ খানকে সামনে রেখে এবার লক্ষ্য আরও বড়। তাঁর ভাষায়, শুধু ত্বকের ওপর থেকে দৃশ্যমান সমস্যার যত্ন নেওয়া নয়, সমস্যার উৎস বোঝা এবং সেখান থেকে সমাধানের চেষ্টা করাই গুরুত্বপূর্ণ।
পুরো প্রচারাভিযানেও শাহরুখ খানকে কোনও নির্দিষ্ট স্কিনকেয়ার পণ্য বিক্রি করতে বা পণ্যের উপাদান নিয়ে বিস্তারিত বলতে দেখা যায়নি। রোমিতা মজুমদারের মতে, তাঁকে শুধু একটি ময়েশ্চারাইজার বিক্রির জন্য নেওয়া হয়নি। বরং এমন একজনকে সামনে আনা হয়েছে, যিনি আরও বড় একটি ব্র্যান্ডের ভাবনাকে মানুষের আলোচনার অংশ করে তুলতে পারেন।
নারী-পুরুষের আলাদা স্কিনকেয়ার কি সত্যিই দরকার?
ফক্সটেলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই প্রচারের মাধ্যমে বিশেষভাবে পুরুষ বা বয়স্ক ভোক্তাদের লক্ষ্য করা হয়নি। বরং এমন মানুষের কাছেও পৌঁছানোই লক্ষ্য, যারা এতদিন স্কিনকেয়ারকে শুধু ত্বকের সমস্যা ঢেকে রাখা বা তরুণ দেখানোর চেষ্টার সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছেন।
বর্তমানে অনেক ভোক্তাই কোনো স্কিনকেয়ার পণ্য পুরুষদের জন্য নাকি নারীদের জন্য তৈরি—তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন পণ্যটি তাঁদের ত্বকের প্রয়োজন মেটাতে পারছে কি না। ত্বকের ধরন, সমস্যা, উপাদান এবং পণ্যের কার্যকারিতাই হয়ে উঠছে মূল বিবেচ্য।
এই পরিবর্তনকে স্কিনকেয়ার শিল্পের জন্য ইতিবাচক বলেই মনে করেন রোমিতা মজুমদার। তাঁর মতে, বয়স, লিঙ্গ বা চেহারা কোনও ব্যক্তি কোনও পণ্য ব্যবহার করবেন কি না, সেটি নির্ধারণ করার একমাত্র মানদণ্ড হওয়া উচিত নয়।
শাহরুখের বিজ্ঞাপন নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে কী বলছেন মানুষ?
শাহরুখ খানকে নিয়ে ফক্সটেলের বিজ্ঞাপন প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ মনে করছেন, এটি সৌন্দর্য ও স্কিনকেয়ার নিয়ে পুরোনো ধারণা ভাঙার একটি সাহসী পদক্ষেপ। আবার কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, তারকার জনপ্রিয়তা কি পণ্যের কার্যকারিতার বিকল্প হতে পারে?
পুনের ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা পারোমিতা দেব আরেংয়ের মতে, তারকাদের দিয়ে বিপণনের কৌশল আগের মতো কাজ করে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একসময় শুধু কোনও তারকার উপস্থিতিই একটি ব্র্যান্ডের সঙ্গে পরিচিতি ও আস্থা তৈরি করতে পারত। কিন্তু এখন ভোক্তারা পণ্যের কার্যকারিতা, উপাদান এবং নিজেদের প্রয়োজনের সঙ্গে সেটির সামঞ্জস্যকেও গুরুত্ব দেন।
অন্য এক স্কিনকেয়ার ইনফ্লুয়েন্সারের মতে, শাহরুখ খানকে প্রচারের মুখ করতে যে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, তা দিয়ে পণ্যকেন্দ্রিক আরও কার্যকর প্রচার তৈরি করা যেত। তাঁর মতে, ব্র্যান্ড ও অভিনেতার মধ্যে একটি দূরত্বও রয়েছে।
প্রতিষ্ঠাতাদের ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড তৈরি করতে সহায়তা করা শরদ্ধা ছেত্রীও প্রশ্ন তুলেছেন, কোটি কোটি রুপির সম্পদের মালিক শাহরুখ খান আদৌ ৫০০ রুপির কম দামের কোনো স্কিনকেয়ার পণ্য ব্যবহার করবেন কি না। তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে মানুষ জানেন যে তারকারা মুখে কোনো পণ্য ব্যবহারের আগে সাধারণত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য পেশাদারের পরামর্শ নেন।
তবে সবাই যে এই প্রচার নিয়ে নেতিবাচক, তা নয়। ইনফ্লুয়েন্সার পল্লক বারেজার মতে, নতুন ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসেবে শাহরুখ খানকে বেছে নেওয়া ফক্সটেলের একটি বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত। তাঁর মতে, এটি সৌন্দর্য ও স্কিনকেয়ার নিয়ে প্রচলিত ধারণা ভাঙার পাশাপাশি ব্র্যান্ডটির দৃশ্যমানতাও বাড়াবে। একই সঙ্গে শাহরুখের মতো জনপ্রিয় একজন পুরুষ তারকাকে স্কিনকেয়ারের সঙ্গে যুক্ত করার ফলে আরও অনেক পুরুষের মধ্যেও ত্বকের যত্ন নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হতে পারে।
বিতর্ক তৈরি হওয়াটাই কি সাফল্য?
সামাজিক মাধ্যমে যখন বিভিন্ন ইনফ্লুয়েন্সার ও ভোক্তা ফক্সটেলের প্রচারাভিযান নিয়ে আলোচনা করছেন, তখন রোমিতা মজুমদার মনে করেন, এটিই আসলে ইতিবাচক দিক। তাঁর মতে, মানুষ যতক্ষণ একটি প্রচার নিয়ে কথা বলছেন, ততক্ষণ সেটি সাংস্কৃতিক পরিসরে জায়গা করে নিয়েছে।
শাহরুখ খানকে স্কিনকেয়ার প্রচারের কেন্দ্রে রেখে ফক্সটেল অন্তত একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে, সৌন্দর্য কি শুধুই তারুণ্যের সঙ্গে যুক্ত? নাকি বয়স, লিঙ্গ ও চেহারার প্রচলিত সীমার বাইরে গিয়েও ত্বকের যত্নের কথা বলা যায়? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো সময়ই দেবে। তবে ৬০ বছর বয়সী শাহরুখ খানকে ঘিরে তৈরি এই বিতর্ক যে স্কিনকেয়ারের প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে, তাতে সন্দেহ নেই।
সূত্র: এনডিটিভি