ক্যারিয়ারের কঠিন সময় পার করছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী তানজিন তিশা। এক দিকে অভিষেক সিনেমার অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে মামলার চাপে পড়েছেন তিনি। এরই মধ্যে শাড়ি বিতর্ককে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে মোট ৩টি মামলা হয়েছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) ৭৫ হাজার টাকার শাড়ি নিয়ে করা মামলাটি তুলে নিতে আগের মামলার বাদীকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগে নতুন মামলা করেছেন বাদী সানায়া আনাম ওয়াফিকাহ চৌধুরী।
এ মামলায় তিশাকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ঢাকার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মু. মাহবুব-উল-আলমের আদালতে মামলাটি করেন ফ্যাশন ডিজাইনার, ভেলমেট-ইয়ুথ ম্যাগাজিনের সম্পাদক সানায়া আনাম ওয়াফিকাহ চৌধুরী। আদালত বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করে মামলা গ্রহণ করেন এবং আগামী ২৩ নভেম্বর আসামিকে আদালতে হাজির হয়ে কারণ দর্শনোর নির্দেশ দিয়েছেন। বাদীপক্ষের আইনজীবী শুভ্র সিনহা রনিও এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

বাদী সানায়া চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শাড়ি নিয়ে প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও হুমকির অভিযোগে তানজিন তিশার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় পুলিশের দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আমার নারাজি মঞ্জুর করেছেন আদালত। রোববার (২৫ অক্টোবর) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম এই নারাজি মঞ্জুর করেন। বিচারক নারাজির বিষয়ে শুনে এবং সব সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ করে মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। সেই সঙ্গে আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এরপরই তিশা আমাকে নানা লোক মারফত হত্যার হুমকি দেন এবং বাসায় লোকজন পাঠায়। আপনারা এরমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফোনকলে রেকর্ড শুনছেন তিনি আমার সঙ্গে কোন ভাষায় কথা বলেছেন। এই কল রেকর্ডের বাইরেও আমার কাছে তার অকথ্য ভাষার আরও প্রমাণ আছে। আমি চাই না একজন শিল্পীকে মানুষ এভাবে দেখুক। তার হুমকির কারণে আমি নিরাপত্তাহীনতায় আছি। এ জন্য আমি মামলা করেছি। আমি সব সময় আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমার বিশ্বাস আদালতে সঠিক বিচার পাবো।’
এদিকে মামলাটি প্রসঙ্গে কথা বলার জন্য তিশার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। বেশ কয়েকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। একই সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তাও দেওয়া হয়। তবে তিনি কোনও উত্তর দেননি।
তবে সামাজিক যোগোযোগমাধ্যমে একটি পোস্টে তিশা এই মামলাকে একটি বড় পরিকল্পনা বলে মন্তব্য করেন।
পোস্টে তিনি বলেন, ‘একজন মানুষের এত বছরের সম্মান, ক্যারিয়ার আর অর্জন ধ্বংস করে দেওয়ার এমন বিশাল ঘৃণ্য প্রচেষ্টা ? কেন? কিসের জন্য? আর এর পেছনে কারা?’
তার কথায়, অনেক প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে আছে, তথ্যপ্রমাণও আছে। কিন্তু সেই সত্য ও প্রমাণ মানুষের সামনে তুলে ধরবে কে? আদালত, নাকি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা?
তিশার ভাষ্য, ‘একজন মানুষকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দেওয়া মিথ্যা ও বানোয়াট গল্পগুলো কি শেষ পর্যন্ত প্রচার পাবে? বিচার কীভাবে পাবো, কীভাবে হবে? আদালত নাকি নিউজ পোর্টালের শিরোনামেই সত্য মিথ্যার রায় হয়ে যাবে ?’
সবশেষে তিনি লেখেন, মামলা কি এতই সহজ? অভিযোগ করলে সত্য হয়ে যায়? একজনের নাম একের পর এক অভিযোগ ছড়িয়ে সামাজিক মাধ্যমে সম্মানহানি করা হয়? জনসাধারণের মস্তিষ্ক এখন কোথায়? কেউ কি কিছুই বুঝতে পারে না?
এর আগে গত বছর ২৭ অক্টোবর শাড়ি নিয়ে ‘প্রতারণা করে বিশ্বাসভঙ্গের’ অভিযোগে তানজিন তিশার বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে আরও একটি মামলা করেন এ্যাপোনিয়ার ফ্যাশনের এক্সিকিউটিভ মো. আমিনুল ইসলাম। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালতে এ মামলা করেন তিনি।
সে সময় মামলার অভিযোগে বলা হয়, তানজিন তিশা এ্যাপোনিয়ার অনলাইন পেইজে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন প্রকার শাড়ি পর্যবেক্ষণ করে একটি শাড়ি পছন্দ করে নেন, যার বাজার মূল্য ২৮ হাজার ৮০০ টাকা। শাড়িটি তানজিন তিশার বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপর থেকে তানজিন তিশা নানা প্রকার ভয়েস মেসেজ এবং মেসেজ দিয়ে নানাভাবে আশ্বস্ত করেন যে শাড়িটি পরে তিনি অ্যাপোনিয়া পেইজ প্রমোশন করবেন।
২০২৫ সালের ১৮ জানুয়ারি শাড়িটি গ্রহণ করেন তিশা। তবে দীর্ঘ ১০ মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও তিনি শাড়িটি পরিধান করে পেইজ প্রমোশন করেননি। ৬ মাসের অধিক সময় কোনও যোগাযোগ রক্ষা করেননি এবং পেইজ কর্তৃপক্ষের সাথে কোনোরূপ কথোপকথন থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিরত রয়েছেন।
বাদীর অভিযোগ, তানজিন তিশা ‘প্রতারণা করে বিশ্বাসভঙ্গ’ করেছেন। মামলাটি আমলে নিয়ে তানজিন তিশার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেছেন তিনি।
এই মামলায় চলতি বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কামাল উদ্দীনের আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করেন তিশা। শুনানি শেষে আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেন।
তবে মামলার অভিযোগ অস্বীকার করে এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তানজিন তিশা দাবি করেছিলেন, শাড়িটি তাকে ‘উপহার’ হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া গণমাধ্যমে তিনি বলেন, ‘একটি ২৭ হাজার টাকা মূল্যের শাড়ির জন্য বলা হচ্ছে, আমি নাকি আত্মসাত করেছি! আমার দীর্ঘ ১৫ বছরের ক্যারিয়ার। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয় যে, আমাকে মাত্র একটি শাড়ির জন্য আদালতে আসতে হবে। আমি যেন সঠিক ও ন্যায়বিচার পাই, এটাই আমার একমাত্র কামনা।’

এদিকে গত বছর ‘সোলজার’ শিরোনামের একটি সিনেমাতে নাম লেখান তিশা। প্রথম সিনেমাতেই শাকিব খানের সঙ্গে সুযোগ পেয়ে বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন অভিনেত্রী। কিন্তু সেই আনন্দে মেঘ জমতে শুরু করেছে। গত বছর অক্টোবরে শুটিং শুরু হয়েছিল এ সিনেমার।
সে সময় আড়াই মিনিটের একটি ভিডিও প্রকাশ করে ওই বছরেরই ডিসেম্বরে সিনেমাটির মুক্তির সম্ভাব্য সময় জানানো হয়েছিল। পরে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এসে মুক্তির দিন ঠিক হয় ২০২৬ সালের ডিসেম্বর।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এখনও সিনেমাটির শুটিং শেষ করেননি নির্মাতা। এছাড়া নির্মাতার বিরুদ্ধে উঠেছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। বিগত এক বছরে দফায় দফায় শিল্পীদের শিডিউল নিলেও ছবির পরিচালক শুটিং শেষ করতে না পারায় এই সিনেমাটি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। অনেক শিল্পী নিজেরাও জানেন না আদৌ সিনেমাটি আর আলোর মুখ দেখবে কি না! ফলে অভিষেক সিনেমা নিয়েও অনিশ্চয়তায় আছেন তিশা।