গুম প্রতিরোধে সংবিধানে নতুন করে কিছু যুক্ত করার প্রয়োজন নেই বলে মন্তব্য করেছেন সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘‘সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকারের স্বীকৃতি রয়েছে। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারে ইতোমধ্যে আইন করা হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে যাতে কেউ গুমের শিকার না হন, সে জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।’’
বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাতীয় সংসদের কেবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ।
গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য শোনার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘তাদের প্রত্যেকেরই একটি অভিন্ন বক্তব্য, যাতে দেশে ভবিষ্যতে কেউ গুমের শিকার না হন।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গত ১৭ বছরে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য এবং গুমের শিকার হয়ে ফিরে আসা ব্যক্তিদের প্রতিনিধিদের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তাদের প্রতিনিধিত্বকারী ৪৮ জনের তালিকা তৈরিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ‘মায়ের ডাক’সহ কয়েকটি সংগঠন সহযোগিতা করেছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘‘গুমের শিকার হয়ে এখনও ফিরে না আসা ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের কেউ স্ত্রী, কেউ সন্তান, কেউবা বাবা। তাদের বক্তব্য কমিটির সদস্যরা গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে বক্তব্য শেষ করতে পারেননি। গুমের শিকার ব্যক্তিদের মামলার দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান, তাদের পরিবারের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন স্বজনেরা।’’
সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকারের স্বীকৃতির কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘যারা এগুলো করেছে, তারা সংবিধান ভায়োলেশন করেছে।’’ গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য বিদ্যমান আইন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘প্রয়োজন হলে আরও আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে।’’
গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের ক্ষতিপূরণের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে ক্ষতিপূরণের বিধান রাখা হয়েছে। আদালতের নির্দেশে দায়ী ব্যক্তিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে বিক্রির মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। দায়ী ব্যক্তিদের সম্পদ না থাকলে বা ওই সম্পদ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব না হলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রয়েছে।’’
তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘‘যে বাহিনী বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠবে, সেই বাহিনী বা সংস্থা নিজেরা ওই অভিযোগের তদন্ত করবে না। অন্য বাহিনী তদন্ত করবে। আইনে তদন্ত, জবাবদিহি এবং বিভাগীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ ও ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে পৃথক ব্যবস্থার বিধান রয়েছে।’’
বর্তমান সরকারের সময়ে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমাদের এই সরকারের মেয়াদ এখন আট মাস পার হয়ে গেল। কোনও কি ক্রসফায়ার হয়েছে? বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়েছে একটিও? কোনও কাস্টডিয়াল ডেথ হয়েছে, হেফাজতে একটিও? কোনও কি গুমের শিকার হয়েছে কেউ? একটিও না।’’
একটি অভিযোগের বিষয়ে সরকার তদন্ত করেছে জানিয়ে কমিটির সভাপতি বলেন, ‘‘স্বাধীন তদন্তের জন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোকেও আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ মন্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘আইনের কঠোর প্রয়োগের কথা বলতে গিয়ে শব্দচয়নে অসতর্কতা থাকতে পারে। তারপরও আমি বলেছি, এই জাতীয় শব্দচয়ন করা, উচ্চারণ করা তার সঠিক হয়নি।’’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘সংবিধানে ধারণ করা প্রয়োজন—এমন বিষয় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আর যেসব বিষয় আইন বা বিধিবিধানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সেগুলো সে অনুযায়ী করা হবে।’’