ওজন কমানো হোক বা হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখা, অনেকেই প্রথমে খাবারের তালিকা থেকে ফ্যাট বা চর্বিজাতীয় খাবার বাদ দেওয়ার কথা ভাবেন। মাখন, ঘি কিংবা রান্নার তেল দেখলেই তৈরি হয় অপরাধবোধ। অথচ শরীরের স্বাভাবিক কাজকর্মের জন্য ফ্যাট অত্যন্ত জরুরি। কোষের গঠন, ভিটামিন শোষণ এবং হরমোন তৈরির মতো নানা শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এই উপাদানের।
তবে সব ফ্যাটের গুণ এক নয়। কোন খাবার থেকে ফ্যাট আসছে, সেটি কতটা প্রক্রিয়াজাত এবং কী পরিমাণে খাওয়া হচ্ছে, তার ওপরেই নির্ভর করে শরীরের ওপর তার প্রভাব। তাই ফ্যাট একেবারে বাদ না দিয়ে বরং সঠিক উৎস বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন পুষ্টিবিদেরা।
শরীরে ফ্যাটের প্রয়োজন কেন?
ফ্যাট মানেই ওজন বেড়ে যাওয়া, এমন ধারণা ঠিক নয়। শরীরের কোষের আবরণ তৈরি করতে ফ্যাটি অ্যাসিড প্রয়োজন। পাশাপাশি, খাবার থেকে পাওয়া ভিটামিন এ, ডি, ই এবং কে শোষণেও সাহায্য করে ফ্যাট। পরিমিত পরিমাণে ফ্যাটযুক্ত খাবার খেলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকে। মহিলাদের ক্ষেত্রে হরমোনের স্বাভাবিক কার্যকলাপের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। তবে বেশি ফ্যাট খেলেই হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যাবে, এমন নয়। আবার প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ফ্যাট বা ক্যালোরি কমিয়ে ফেলাও শরীরের পক্ষে ভালো নয়।
কোন ফ্যাট কম খাওয়া উচিত?
কেক, পেস্ট্রি, বিস্কুট, প্যাকেটজাত স্ন্যাক্স, কিছু ভাজাভুজি এবং প্রক্রিয়াজাত মাংসে এমন ফ্যাট থাকতে পারে, যা নিয়মিত বেশি পরিমাণে খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। বিশেষ করে ট্রান্স ফ্যাট এবং অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই এই ধরনের খাবার যতটা সম্ভব কম খাওয়াই ভালো।
মাখন, ঘি, নারকেল তেল এবং কিছু চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবারেও স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ বেশি। এগুলো একেবারে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন না হলেও পরিমাণের দিকে নজর রাখা জরুরি। রান্নায় নিয়মিত বেশি পরিমাণে মাখন বা ঘি ব্যবহারের বদলে পরিমিত তেল বেছে নেওয়া যেতে পারে।
ডিম, মাছ ও মাংস কি খারাপ?
ডিম, মাছ, চিজ়, টক দই কিংবা প্রক্রিয়াজাত নয় এমন মাংসকে এক কথায় ভালো বা খারাপ বলা যায় না। কারণ, খাবারে কতটা ফ্যাট রয়েছে, শুধু তা দিয়ে তার পুষ্টিগুণ বিচার করা যায় না। খাবারের সামগ্রিক পুষ্টিগঠন এবং কীভাবে তা রান্না বা প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে, সেগুলিও গুরুত্বপূর্ণ।
এক সময়ে ডিমের কোলেস্টেরল নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ ছিল। তবে খাবার থেকে পাওয়া কোলেস্টেরল এবং রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রার সম্পর্ক বেশ জটিল। ডিমে প্রোটিনসহ নানা প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান রয়েছে। তাই সুষম খাদ্যতালিকায় ডিম রাখা উচিত। একই ভাবে, মাছও প্রোটিনের ভালো উৎস। বিশেষত তৈলাক্ত মাছে থাকে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী।
কোন ফ্যাট সবচেয়ে ভালো?
স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের অন্যতম উৎস হল আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড। এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল, বাদাম, বিভিন্ন ধরনের বীজ, অ্যাভোকাডো এবং তৈলাক্ত মাছ এ ধরনের ফ্যাটে সমৃদ্ধ। রান্নায় পরিমিত পরিমাণে উপযুক্ত উদ্ভিজ্জ তেল ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি খাদ্যতালিকায় রাখা যায় কাঠবাদাম, আখরোট, তিসি বা চিয়া বীজ এবং সামুদ্রিক মাছ।
সব মিলিয়ে, সুস্থ থাকতে ফ্যাটকে শত্রু ভাবার কারণ নেই। বরং কোন উৎস থেকে ফ্যাট আসছে এবং কতটা খাওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। সুষম খাদ্যাভ্যাস, পরিমিত খাবার এবং কম প্রক্রিয়াজাত উপাদান বেছে নেওয়াই সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি।