গাইবান্ধায় আবু বক্কর সিদ্দিক বিপুল (৫২) নামে এক চা পাতার ব্যবসায়ীর ট্রেনে কাটা মরদেহ উদ্ধার করেছে রেলওয়ে পুলিশ। তার হাতে পাওয়া একটি চিরকুটে নিজের মৃত্যুর জন্য ছয়জনকে দায়ী করেছেন তিনি। চিরকুটে উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে তাদের কাছ থেকে প্রায় ৪০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে চড়া সুদের চাপে পড়েছিলেন বিপুল। ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় তাকে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছিল। এমনকি তার বাড়ি দখল হয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
রবিবার (১ নভেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গাইবান্ধা পৌর শহরের স্টেডিয়ামসংলগ্ন রেললাইনে সান্তাহার থেকে ছেড়ে আসা লালমনিরহাটগামী পদ্মরাগ ট্রেনে কাটা অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বিপুল পূর্ব কোমরনই এলাকার মৃত আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে। তিনি পেশায় চা পাতার ব্যবসায়ী ছিলেন।
রেলওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ সময় তার হাতে একটি চিরকুট পাওয়া যায়। এতে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে তাদের নিজের মৃত্যুর জন্য দায়ী করেছেন বিপুল। চিরকুটে কয়েকজনকে সুদখোর ও আওয়ামী লীগের দালাল হিসেবে উল্লেখ করার পাশাপাশি সেদিনই তার বাড়ি দখল হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
নিহতের পরিবারের সদস্যদের দাবি, স্থানীয় কয়েকজন দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৪০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন বিপুল। ঋণের বিপরীতে অতিরিক্ত সুদ দাবি করে পাওনাদাররা তাকে নিয়মিত চাপ ও ভয়ভীতি দেখাতেন। ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় তিনি হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন।
চিরকুটে ছোট ভাই হিসেবে উল্লেখ করা মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে আবু জাহেদ শিপুল জানান, নিহত বিপুল তার বড় ভাই। রেলওয়ে পুলিশের মাধ্যমে তিনি ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পেয়েছেন। চিরকুটে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনায় তার ভাবি (নিহতের স্ত্রী) বাদী হয়ে মামলা করবেন।
ঋণের বিষয়ে শিপুল বলেন, ঋণদাতারা কত টাকা দাবি করেন, তা পরিবারের জানা নেই। তারা কখনও সুনির্দিষ্টভাবে টাকার পরিমাণ জানাননি। তবে মাঝেমধ্যে বাড়িতে এসে টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দিতেন।
গাইবান্ধা রেলওয়ে (বালাসীঘাট) পুলিশের ইনচার্জ এসআই সাহেব গনি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। নিহতের হাতে পাওয়া চিরকুটে টাকা লেনদেনের বিষয়ে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে তাদের নিজের মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করার কথা জানানো হয়েছে।
এদিকে, এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, জেলাজুড়ে ব্যক্তি ও বিভিন্ন সমিতি-সংস্থার আড়ালে দাদন ব্যবসার বিস্তার ঘটছে। চড়া সুদের ফাঁদে পড়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ঋণের বোঝায় জর্জরিত হচ্ছেন। ঋণ ও সুদের চাপ সামলাতে অনেকে সহায়-সম্বল বিক্রি করেও রেহাই পাচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতিতে কেউ কেউ চরম হতাশার মধ্যে পড়ছেন।
স্থানীয়দের দাবি, দাদন ব্যবসার আড়ালে সুদের কারবার, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও জোরপূর্বক সম্পত্তি দখলের অভিযোগগুলো তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।