বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি বাঙালির আবেগ ও সংস্কৃতি এবার ছুঁয়ে গেল আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গন ও উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক মঞ্চকে। ফুটবল তারকা লিওনেল মেসির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ থেকে শুরু করে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের দ্বিপক্ষীয় সফর—সবখানেই এখন রাজত্ব করছে বাংলা গানের অমোঘ জাদু। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের কালজয়ী গান কিংবা সমকালীন পপ-ফোক ফিউশনে হাবিব ওয়াহিদের সুর; বিশ্বমঞ্চের দুটি ভিন্ন বড় ঘটনায় বাংলার এই সুরের ব্যবহার নতুন এক মাইলফলক তৈরি করেছে।
ফিফার দেয়ালে শাহ আব্দুল করিমের ‘মায়া’
কিছুদিন আগেই ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপের অফিশিয়াল ভেরিফাইড ফেসবুক পেইজে লিওনেল মেসির একটি হাসিমুখের ছবি পোস্ট করে বিশ্ব ফুটবলের এই সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তবে সবাইকে চমকে দিয়ে সেই ছবির ক্যাপশনে কোনো ইংরেজি বা স্প্যানিশ শব্দ নয়, বরং হুবহু বাংলা হরফে লেখা ছিল—“কি জাদু করিয়া মেসি মায়া লাগাইছে!”
এই একটি লাইন মুহূর্তেই আলোড়ন তোলে বিশ্বজুড়ে থাকা বাঙালি ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে। ক্যাপশনটি মূলত বাংলাদেশের কিংবদন্তি বাউল সাধক শাহ আব্দুল করিমের অত্যন্ত জনপ্রিয় গান “কেমনে ভুলিবো আমি বাঁচি না তারে ছাড়া, কি জাদু করিয়া বন্দে মায়া লাগাইছে”-এর লাইন থেকে অনুপ্রাণিত। কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের যে অবিশ্বাস্য উন্মাদনা ছিল, ফিফার এই পোস্টটিকে অনেকেই সেই ভালোবাসার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন। আন্তর্জাতিক কোনো প্ল্যাটফর্মে বাঙালি সংস্কৃতি ও লোকগানকে এভাবে তুলে ধরার কৌশল প্রশংসিত হয়েছে সর্বত্র।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে খোয়াজ মিয়ার গানে হাবিবের ‘মহা জাদু’
ফিফার এই রেশ কাটতে না কাটতেই আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে ঘটলো আরেক নজিরবিহীন ঘটনা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়ায় আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফরকে কেন্দ্র করে এক অভিনব ভিডিও প্রকাশ করেছে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের ভেরিফাইড সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, রাষ্ট্রীয় মধ্যাহ্নভোজ ও অভ্যর্থনার একটি বিশেষ ভিডিও প্রকাশ করা হয়।
২ মিনিট ৪০ সেকেন্ডের সেই অফিশিয়াল ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী হাবিব ওয়াহিদের গান ‘মহা জাদু’ (আমার বন্ধু মহা জাদু জানে)। মরমী সাধক দূরবিন শাহের শিষ্য, লোককবি খোয়াজ মিয়ার লেখা এই কালজয়ী গানটি কোক স্টুডিও বাংলায় নতুন সঙ্গীতায়োজনে গেয়েছেন হাবিব ওয়াহিদ এবং তাজিকিস্তানের শিল্পী মেহরনিগরি রুস্তম।
এ প্রসঙ্গে হাবিব ওয়াহিদ তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, “এটা আমাকে ভীষণ অনুপ্রাণিত করেছে। কারণ, তারেক রহমানের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর। সেখানে দুটি দেশ জড়িয়ে রয়েছে। সেই ভিডিওতে আমার গানটি ব্যবহার করায় আমি সম্মানিত বোধ করছি। আমি লাকি। নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি।”
কোনো দেশের সরকারপ্রধানের আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় সফরের অফিশিয়াল ভিডিওতে খোয়াজ মিয়ার সৃষ্টি ও হাবিবের এই সুর ব্যবহারের ঘটনাটি যেমন বিরল, তেমনই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সুরের সেতু ও সাংস্কৃতিক কূটনীতি
বিশ্লেষকদের মতে, এই দুটি ঘটনা কেবল বিনোদন বা কাকতালীয় বিষয় নয়; এটি মূলত শক্তিশালী ‘সাংস্কৃতিক কূটনীতি’ এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলা ভাষার ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বহিঃপ্রকাশ। ফিফা যেভাবে আঞ্চলিক ভক্তদের আবেগ ছুঁতে বাংলার লোকগানকে বেছে নিয়েছে, ঠিক একইভাবে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও দুই দেশের মধ্যকার গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, শ্রমবাজার ও বাণিজ্যের মতো গুরুগম্ভীর আলোচনাকে সহজ ও আন্তরিক করতে বাংলা গানের সুরকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে।
খেলার মাঠ থেকে শুরু করে রাজনীতির শীর্ষ বৈঠক—সবখানেই যেন এখন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে একটাই সুর: বাঙালির গানের জাদু সত্যিই বিশ্বকে মায়ায় বাঁধতে জানে।
হাবিবের কন্ঠে ‘মহা জাদু ও মালয়শিয়ার প্রধানমন্ত্রীর পোস্ট