দীর্ঘ জীবন কে না চায়! সুস্থ থাকতে মানুষ নিয়মিত ব্যায়াম করেন, স্বাস্থ্যকর খাবার খান, পর্যাপ্ত ঘুমের চেষ্টা করেন। কিন্তু দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের সঙ্গে যদি আঁকাআঁকি, গান, লেখালেখি কিংবা নতুন কিছু শেখারও সম্পর্ক থাকে?
সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণা বলছে, সৃজনশীলতা হয়তো মানুষের আয়ু সরাসরি বাড়ায় না। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ককে সচল রাখা, মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা এবং জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে।
কী বলছে গবেষণা?
সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নিয়মিত সৃজনশীল কাজে যুক্ত থাকা মস্তিষ্কের সেই অংশগুলোকে সক্রিয় রাখে, যেগুলো বয়স বাড়ার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
১ হাজার ৪৭৩ জনকে নিয়ে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের পারস্পরিক সংযোগ আরও শক্তিশালী করে। এতে তথ্য প্রক্রিয়াকরণের দক্ষতা বাড়ে, স্নায়ুতন্ত্রের নমনীয়তা বজায় থাকে এবং বয়সজনিত মানসিক অবক্ষয়ের গতি কিছুটা ধীর হতে পারে।
২০২৬ সালের আরেকটি গবেষণায় ৭৭ জন প্রবীণ ও ৮১ জন তরুণের সৃজনশীল চিন্তার সক্ষমতা তুলনা করা হয়। সেখানে দেখা যায়, বয়সের সঙ্গে মানুষের চিন্তার কাঠামো কিছুটা অনমনীয় হয়ে ওঠে। তবে যারা নিয়মিত সৃজনশীল চর্চা করেন, তাদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের প্রভাব তুলনামূলক কম।
গবেষকদের মতে, সৃজনশীলতা এক ধরনের মানসিক সঞ্চয় হিসেবে কাজ করে। এটি স্মৃতি, মানসিক নমনীয়তা এবং নতুনভাবে চিন্তা করার সক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
আয়ু নয়, জীবনকে করে অর্থবহ
২০২৩ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণা পর্যালোচনায়ও একই ধরনের তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, সৃজনশীলতা সরাসরি মানুষের আয়ু বাড়ায়—এমন কোনও প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
তবে সৃজনশীল মানুষদের মধ্যে জীবনের উদ্দেশ্যবোধ, মানসিক সুস্থতা, সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং ইতিবাচক মনোভাব তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। এই বৈশিষ্ট্যগুলো সুস্থ ও সক্রিয় বার্ধক্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
অর্থাৎ, সৃজনশীলতা বয়স বাড়া থামাতে পারে না, কিন্তু বয়সের প্রভাবকে অনেকটাই সহনীয় করে তুলতে পারে।
কী ধরনের চর্চা উপকারী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৃজনশীল হতে শিল্পী বা লেখক হওয়া জরুরি নয়। বরং নিয়মিত এমন কিছু করা, যা মস্তিষ্ককে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
যেমন—ছবি আঁকা বা হস্তশিল্প করা; ডায়েরি, গল্প বা কবিতা লেখা; গান গাওয়া বা বাদ্যযন্ত্র শেখা; নতুন ভাষা বা নতুন কোনও দক্ষতা শেখা; ধাঁধা সমাধান, বই পড়া কিংবা নতুন বিষয় নিয়ে জানার চেষ্টা করা।
এসব কাজ শুধু চিন্তাশক্তিই বাড়ায় না, মানসিক চাপ কমায়, আত্মতৃপ্তি তৈরি করে এবং সামাজিক সম্পর্কও আরও দৃঢ় করতে সাহায্য করে।
শেষ কথা
দীর্ঘ জীবন পাওয়ার কোনও জাদুকরী উপায় এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তবে গবেষকেরা বলছেন, নিয়মিত সৃজনশীল চর্চা মানুষকে বয়সের সঙ্গে আরও ভালোভাবে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে। এটি হয়তো জীবনে নতুন বছর যোগ করে না, কিন্তু যোগ করতে পারে নতুন প্রাণ, নতুন উদ্দীপনা এবং জীবনের প্রতি নতুন অর্থ।
তাই সুস্থ বার্ধক্যের প্রস্তুতি শুধু ব্যায়াম, খাবার বা ওষুধে নয়; শুরু হতে পারে একটি খাতা, একটি তুলি, একটি গান কিংবা নতুন কিছু শেখার আগ্রহ দিয়েও।