বর্তমান করপোরেট বিশ্বে দ্রুত পরিবর্তনশীল ব্যবসায়িক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠেছে তার কর্মী বা মানবসম্পদ। ফলে, যেকোনো ছোট-বড় প্রতিষ্ঠানে ‘হিউম্যান রিসোর্স’ বা মানবসম্পদ উন্নয়ন বিভাগ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একসময় এই বিভাগকে শুধু ফাইলপত্র গোছানো বা বেতন দেওয়ার কাজ মনে করা হলেও, বর্তমানে এটি একটি প্রতিষ্ঠানের মূল চালিকাশক্তি। ফলে তরুণ প্রজন্মের কাছে ক্যারিয়ার হিসেবে ‘এইচআর’ দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
আমাদের আজকের ক্যারিয়ার পর্বে মানবসম্পদ উন্নয়নে সফল ও টেকসই ক্যারিয়ার গঠনে তরুণদের ঠিক কোন কোন বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত, তা নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন তুলে ধরা হলো:
১. প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও পেশাদার সার্টিফিকেশন
এইচআরে ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে বিবিএ বা এমবিএ-তে ‘হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট’ অন্যতম সেরা মাধ্যম। তবে অন্য যেকোনো ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থীরাও এই পেশায় আসতে পারেন। সেক্ষেত্রে পড়াশোনার পাশাপাশি পেশাদার কিছু শর্ট কোর্স বা ডিপ্লোমা ক্যারিয়ারের গতি অনেক বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এসএইচআরএম বা সিআইপিডি’র মতো সার্টিফিকেশন থাকলে গ্লোবাল কোম্পানিগুলোতে কাজের সুযোগ সহজ হয়।
২. যোগাযোগের দক্ষতা
মানবসম্পদ বিভাগের মূল কাজই হলো মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা। তাই চমৎকার মৌখিক ও লিখিত যোগাযোগের দক্ষতা থাকা এই পেশার প্রধান শর্ত। কর্মীদের সমস্যা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তা সমাধান করা এবং প্রতিষ্ঠানের নীতি বা পলিসি সঠিকভাবে সবার সামনে উপস্থাপন করার ক্ষমতা থাকতে হবে।
৩. প্রযুক্তির সঙ্গে মিতালী
আধুনিক এইচআর এখন আর কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নেই। ডেটা অ্যানালিটিক্স, হিউম্যান রিসার্চ ইনফরমেশন সিস্টেম (এইচআরআইএস), বিভিন্ন পে-রোল সফটওয়্যার এবং লিংকডইনের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে দক্ষ হতে হবে। ডেটা বা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বর্তমান বাজারে একজন এইচআর প্রফেশনালকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখে।
৪. সমস্যা সমাধান ও কৌশলগত চিন্তাভাবনা
প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মেটানো, কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য বা কাজের পরিবেশের দিকে নজর রাখা এবং কোম্পানির লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা রাখা—সবই এইচআরের দায়িত্ব। তাই যেকোনো পরিস্থিতি শান্ত মাথায় সামলানো এবং ‘স্ট্র্যাটেজিক থিংকিং’ বা কৌশলগত চিন্তাভাবনার অভ্যাস গড়তে হবে।
৫. নেটওয়ার্কিং এবং ইন্টার্নশিপ
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই বিভিন্ন পেশাদার নেটওয়ার্ক, বিশেষ করে লিংকডইন-এ সক্রিয় থাকা উচিত। দেশের শীর্ষস্থানীয় এইচআর প্রফেশনালদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং পড়াশোনার শেষ দিকে এসে ভালো কোনও প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ করা ক্যারিয়ারের প্রথম দরজাটি খুলতে সাহায্য করে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় করপোরেট ট্রেইনার ও এইচআর বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামীর করপোরেট বিশ্ব হবে পুরোপুরি দক্ষতাকেন্দ্রীক। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআইর যুগেও মানুষের আবেগ ও মনস্তত্ত্ব বোঝার কাজটা মানুষকেই করতে হবে। তাই যারা সহমর্মিতা, নেতৃত্ব দেওয়ার গুণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারবেন, মানবসম্পদ উন্নয়নে তাদের ক্যারিয়ার হবে অত্যন্ত উজ্জ্বল ও দীর্ঘস্থায়ী।
উদ্যোক্তা সংস্কৃতির বিকাশ এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বাংলাদেশে পরিধি বাড়ানোর কারণে আগামী দিনগুলোতে দক্ষ এইচআর ম্যানেজারের চাহিদা আরও বাড়বে। তাই সঠিক পরিকল্পনা এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে এই পেশায় প্রবেশ করলে খুব দ্রুত করপোরেট লেডারের শীর্ষে পৌঁছানো সম্ভব।