টানা চার বছরের যুদ্ধের ইতিহাসে এই প্রথম রাশিয়ার অভ্যন্তরে বড় ধরনের তাণ্ডব চালাচ্ছে ইউক্রেনের ড্রোন। ইউক্রেনের এই ধারাবাহিক ও অত্যাধুনিক ড্রোন হামলা রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে, যুদ্ধের ময়দানের ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে এবং রাশিয়ার সাধারণ নাগরিকদের দোরগোড়ায় যুদ্ধের আবহ নিয়ে এসেছে।
ইউক্রেনের আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে। অন্যদিকে নিজেদের শহরগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ এবং সেনাদের কাছে রসদ পৌঁছাতে হিমশিম খাচ্ছে রাশিয়া। এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মস্কোকে একটি শান্তি চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করার জন্য ‘৪০ দিনের প্রভাব বিস্তার অভিযান’ শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার জেলেনস্কির এই ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় যুদ্ধের অন্যতম বৃহত্তম ড্রোন হামলাটি চালানো হয়। এতে রাশিয়ার ১২টি অঞ্চলের পাশাপাশি দখলকৃত ক্রিমিয়াকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইউক্রেনের অন্তত ৬৬০টি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। রাশিয়ার তুলা অঞ্চলের একটি রাসায়নিক কারখানায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
এর মাত্র এক সপ্তাহ আগে মস্কোর বৃহত্তম তেল শোধনাগারে একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে, যার ফলে পুরো আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। শহরের কিছু অংশের বাসিন্দারা বেজমেন্টে আশ্রয় নেন এবং পরে সেখান থেকে বের হয়ে ‘কালো বৃষ্টি’ দেখতে পান। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে সূত্র জানিয়েছে, এই শোধনাগারটি সম্ভবত ২০২৭ সালের আগে আর চালু করা যাবে না। চলতি সপ্তাহে রাশিয়ার আরও অন্তত তিনটি তেল শোধনাগারে আঘাত হানা হয়েছে। জেলেনস্কির ৪০ দিনের অভিযানের ঘোষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সামনে আরও বড় হামলা আসছে।
শোধনাগারের আগুন যখন দাউ দাউ করে জ্বলছিল, তখন জেলেনস্কি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘যদি ইউক্রেন পুড়ে, তবে তোমাদের মস্কোও পুড়বে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পুতিন তার যুদ্ধ বন্ধ করতে এবং একটি মর্যাদাপূর্ণ শান্তির জন্য আমাদের আলোচনার প্রস্তাব শুনতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণেই রাশিয়ার আজ এই কঠিন দশা।’
অন্যদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জোর দিয়ে বলেছেন, রাশিয়া তাদের নিজস্ব শর্তে শান্তি আলোচনায় প্রস্তুত। চলতি মাসের শুরুতে তিনি স্বীকার করেন যে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা কিছুটা ক্ষতি করছে, তবে রুশ সমাজকে বিভক্ত করতে এটি ব্যর্থ হবে। পুতিন বলেন, ‘বেসামরিক অবকাঠামোতে এই হামলার লক্ষ্য কী? সমাজকে অস্থিতিশীল করা এবং রুশ সশস্ত্র বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ে একটি অনিশ্চয়তার অনুভূতি তৈরি করা।’
এই যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে একটি কৌতূহলোদ্দীপক মোড় এসেছে মার্কিন রাজনীতিতে। গত সপ্তাহে জি-৭ সম্মেলনে জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক এবং এর আগে পুতিনের সঙ্গে কথা বলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, ইউক্রেন এখন যুদ্ধে ‘বেশ ভালো করছে’।
সম্মেলনে উপস্থিত দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প পুতিনের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি ‘অ্যাঙ্কোরেজ সমঝোতা’ থেকে সরে আসতে পারেন। ওই সমঝোতার অধীনে যেকোনও চুক্তিতে ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চল রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি মেনে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘পুতিনের ব্যাপারে ট্রাম্পের মনে সংশয় তৈরি হয়েছে এবং তিনি রাশিয়ার ওপর চাপের কথা বলছেন। তবে অন্য নেতারা বিশ্বাস করেন না যে ট্রাম্প আসলেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে কিছু করবেন।’
ইরান যুদ্ধ এবং পূর্ববর্তী কয়েক দফা আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার কারণে ইউক্রেন নিয়ে মার্কিন নেতৃত্বাধীন কূটনীতি বর্তমানে থমকে আছে। জেলেনস্কির এই ড্রোন অভিযান শান্তি আলোচনায় নতুন কোনও গতি আনতে পারবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। কোনও কোনও বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি মস্কোর ওপর চাপ বাড়ালেও রাশিয়ার সাধারণ মানুষের মনে ইউক্রেনকে পরাজিত করার মনোভাবকে আরও দৃঢ় করতে পারে।
ইউক্রেনের এই দূরপাল্লার হামলার সবচেয়ে তীব্র প্রভাব পড়েছে রুশ-অধিকৃত ক্রিমিয়ায়। সেখানে কর্তৃপক্ষ সব ধরনের জ্বালানি বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে এবং শুক্রবার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। ইউক্রেন ক্রিমিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উপদ্বীপটির সংযোগকারী পরিবহন পথগুলোতে আঘাত হেনেছে।
পাশাপাশি, রণক্ষেত্রে থাকা রুশ সেনাদের সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন করতেও ইউক্রেন ড্রোন ব্যবহার করছে। রুশ বাহিনী পূর্ব ইউক্রেনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তবে তাদের অগ্রগতির গতি খুবই ধীর এবং প্রচুর সেনা হতাহতের খবর আসছে।