সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই দেখা যায়—‘ফেসবুক থেকে মাসে ২ লাখ টাকা আয়’, ‘টিকটক থেকে চাকরির চেয়ে বেশি আয়’ কিংবা ‘মোবাইলে ভিডিও বানিয়েই লাখপতি’—এমন নানা দাবি। এসব দেখে অনেক তরুণ-তরুণী কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে সহজ আয়ের পথ হিসেবে ভাবছেন। তবে বাস্তব চিত্র কি সত্যিই এত সহজ?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে আয় সম্ভব হলেও সবার জন্য তা নিশ্চিত নয়। বরং বিপুল সংখ্যক কনটেন্ট নির্মাতার মধ্যে খুব অল্প একটি অংশ নিয়মিত ও উল্লেখযোগ্য আয় করতে সক্ষম হন।
আয় আসে কোথা থেকে?
ফেসবুক ও টিকটকে আয় সাধারণত কয়েকটি উৎস থেকে আসে। এর মধ্যে রয়েছে প্ল্যাটফর্মের মনিটাইজেশন সুবিধা, ব্র্যান্ড প্রমোশন, স্পন্সরড কনটেন্ট, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং, পণ্য বিক্রি এবং লাইভ স্ট্রিমিংয়ের উপহার বা ডোনেশন
তবে এসব সুবিধা পেতে নির্দিষ্ট সংখ্যক অনুসারী, ভিডিও ভিউ, এনগেজমেন্ট এবং প্ল্যাটফর্মের নীতিমালা পূরণ করতে হয়। শুধু একটি পেজ বা অ্যাকাউন্ট খুললেই আয় শুরু হয় না।
সবাই কি লাখ টাকা আয় করেন?
ডিজিটাল মার্কেটিং খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সামাজিক মাধ্যমে লাখ টাকা আয় করা সম্ভব হলেও সেটি ব্যতিক্রমী সাফল্যের উদাহরণ। অধিকাংশ কনটেন্ট নির্মাতা নিয়মিত আয় করতে পারেন না। অনেকে দীর্ঘ সময় কনটেন্ট তৈরি করেও মনিটাইজেশনের শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হন।
যারা উল্লেখযোগ্য আয় করেন, তাদের বেশিরভাগেরই বড় অনুসারীভিত্তি, ধারাবাহিক কনটেন্ট প্রকাশ এবং শক্তিশালী দর্শকসংযোগ থাকে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের আয়ের বড় অংশ আসে ব্র্যান্ড প্রচারণা থেকে, প্ল্যাটফর্মের সরাসরি পেমেন্ট থেকে নয়।
আয়ের অঙ্ক কেন ভিন্ন?
একই পরিমাণ ভিউ হলেও সবার আয় সমান হয় না। দর্শকের অবস্থান, কনটেন্টের ধরন, বিজ্ঞাপনদাতার আগ্রহ, দর্শকের সম্পৃক্ততা এবং প্ল্যাটফর্মের নীতিমালার ওপর আয় নির্ভর করে।
বাংলাদেশি দর্শকনির্ভর কনটেন্টের বিজ্ঞাপনমূল্য সাধারণত উন্নত দেশের দর্শকনির্ভর কনটেন্টের তুলনায় কম। ফলে কোটি ভিউ মানেই কোটি টাকা নয়।
আয়ের গল্পের আড়ালে যা থাকে
অনেক সফল কনটেন্ট নির্মাতার পেছনে থাকে বছরের পর বছর শ্রম, নিয়মিত ভিডিও নির্মাণ, সম্পাদনা, গবেষণা, সরঞ্জাম কেনা এবং দর্শক ধরে রাখার চেষ্টা। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই শুধু সাফল্যের গল্প সামনে আসে, ব্যর্থতার গল্পগুলো আড়ালে থেকে যায়।
ফলে নতুনরা অনেক সময় ধারণা করেন, কয়েকটি ভিডিও ভাইরাল হলেই দ্রুত বড় অঙ্কের আয় সম্ভব। বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দ্রুত ধনী হওয়ার মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতাভিত্তিক পেশা বা ব্যবসায়িক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা উচিত। নিয়মিত মানসম্মত কনটেন্ট তৈরি, নির্দিষ্ট দর্শকগোষ্ঠী তৈরি এবং প্ল্যাটফর্মের নীতিমালা মেনে চলাই সফলতার মূল শর্ত।
শেষ কথা
ফেসবুক ও টিকটক থেকে লাখ টাকা আয় করা অসম্ভব নয়, তবে সেটি সবার বাস্তবতা নয়। সামাজিক মাধ্যমে যে কয়েকজনের আয়ের গল্প ভাইরাল হয়, তার পেছনে থাকে অসংখ্য মানুষের দীর্ঘ প্রচেষ্টা, ব্যর্থতা এবং অনিশ্চয়তা। তাই ‘ভিডিও বানালেই লাখ টাকা’—এমন ধারণার চেয়ে বাস্তবতা অনেক বেশি কঠিন এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ।