মায়ামিকে মানুষ একসময় চিনতো সমুদ্র, সৈকত আর পর্যটনের শহর হিসেবে। তবে ২০২৩ সালের জুলাইয়ের পর থেকে এই শহরের পরিচয়ে যোগ হয়েছে নতুন এক নাম—লিওনেল মেসি। ইন্টার মিয়ামিতে যোগ দেওয়ার পর ফুটবলের উন্মাদনায় বদলে গেছে শহরটির চেহারা। এখন মায়ামির ফুটবল মানেই যেন মেসি।
মেজর লিগ সকারে (এমএলএস) ইন্টার মায়ামির জার্সি গায়ে চাপানোর পর মেসির ছোঁয়ায় একের পর এক সাফল্য পেয়েছে ক্লাবটি। বিশ্বজুড়ে বেড়েছে এমএলএসের জনপ্রিয়তা, বদলে গেছে ইন্টার মায়ামির অবস্থানও। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি থেকে শুরু করে বৈশ্বিক পরিচিতি—সব দিক থেকেই ক্লাবটি এখন নতুন উচ্চতায়। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে একজনই; তিনি লিওনেল মেসি।
মায়ামির অলিগলি, স্টেডিয়াম কিংবা সাধারণ মানুষের জীবনেও এখন মেসির উপস্থিতি স্পষ্ট। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ফুটবলের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। শহরের বিভিন্ন জায়গায় ১০ নম্বর জার্সি গায়ে ঘুরে বেড়ানো মানুষের দেখা মেলে নিয়মিত। স্টেডিয়ামগুলোও থাকে দর্শকে পরিপূর্ণ। প্রায় চার বছর ধরে এই শহরেই বসবাস করছেন মেসি। এখানে বাড়ি কিনেছেন, ইন্টার মায়ামির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে নিজেকে যুক্ত করেছেন। ফলে মিয়ামি এখন তার কাছে অনেকটাই হাতের তালুর মতো চেনা। আর সেই পরিচিত শহরেই এবার অপেক্ষা করছে আর্জেন্টিনার অগ্নিপরীক্ষা।
৩ জুলাই হার্ড রক স্টেডিয়ামে উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের প্রতিপক্ষ পুঁচকে ও নবাগত কেপ ভার্দে। এই মাঠটি আবার আর্জেন্টিনার জন্য স্মৃতিময়। এখানেই কোপা আমেরিকার ফাইনালে কলম্বিয়াকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল আলবিসেলেস্তেরা।
তবে প্রতিপক্ষকে মোটেও হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কেপ ভার্দে নামের তুলনায় ছোট দল হলেও এবারের আসরে তারা ইতোমধ্যেই বড় চমক দেখিয়েছে। গ্রুপ পর্বে কোনো ম্যাচ না হেরে স্পেন ও উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী দলকে রুখে দিয়েছে তারা। সেই কারণেই ম্যাচটিকে আর্জেন্টিনার জন্য ‘অগ্নিপরীক্ষা’ বলা হচ্ছে। কোচ লিওনেল স্ক্যালোনিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, প্রতিপক্ষকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
ওহ। আর একটা কথা না বললেই নয়। ফ্লোরিডা রাজ্যের বড় শহ মায়ামিতে লাতিনদের আধিক্য অনেক আগে থেকে। কিউবা কিংবা ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা বংশোদ্ভুত লোকজনের অভাব নেই। মূল জনসংখ্যার বড় অংশ তারাই। ইংরেজির পাশাপাশি তাই স্প্যানিশ ভাষায় কথা চলে প্রচুর। আর্জেন্টিনার জন্য তাই এই শহর অনেকটাই পরিচিত এক পরিবেশ তৈরি করেছে।
আর্জেন্টিনা থেকেও বিপুলসংখ্যক সমর্থক ইতোমধ্যে মায়ামিতে এসে পৌঁছেছেন। জানা গেছে, প্রায় ৫০ হাজার আর্জেন্টাইন সমর্থক শহরে অবস্থান করছেন, যদিও তাদের অনেকের কাছেই ৩ জুলাইয়ের ম্যাচের টিকিট নেই।
মিডিয়া সেন্টারে আর্জেন্টাইন সাংবাদিক ডগলাস বলছিলেন, ‘মায়ামি ও বুয়েন্স আয়ার্সের সময়ের পার্থক্য খুবই কম। দুই শহরের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট রয়েছে। বহু বছর ধরেই মায়ামির সঙ্গে আর্জেন্টিনার মানুষের নিবিড় যোগাযোগ। পর্যটন, ব্যবসা কিংবা স্থায়ী বসবাস—সব মিলিয়ে এখানে হাজারো আর্জেন্টাইন আছেন। তাই ম্যাচে গ্যালারিতেও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের আধিপত্যই বেশি দেখা যাবে।’
তবে পরিচিত শহর মানেই স্বস্তির ম্যাচ নয়। বরং প্রত্যাশার চাপও অনেক বেশি থাকবে। মেসির নিজের শহর হয়ে ওঠা মায়ামিতেই তাকে নেতৃত্ব দিতে হবে আর্জেন্টিনাকে। ধারাবাহিক পারফর্ম করে আর্জেন্টিনাকে পৌঁছে দিতে হবে কোয়ার্টার ফাইনালের পথে।
মায়ামি শহরের অনেক জায়গাতে রাস্তার দুপাশে খেজুর ও নারিকেল গাছ দৃশ্যমান। অন্য শহরগুলোর চেয়ে একটু আলাদা পরিচয় বহন করছে। আর এখন সেখানে বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ ঘিরে উত্তেজনা পৌঁছে গেছে তুঙ্গে। ফলে এখন চর্চিত প্রশ্ন একটাই—নিজের শহরে কি বিজয়ের পতাকা ওড়াতে পারবেন লিওনেল মেসি? আর্জেন্টিনা কি উতরে যাবে এই অগ্নিপরীক্ষা, নাকি কেপ ভার্দের রূপকথা আরও দীর্ঘ হবে?
সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে ৩ জুলাই।