বিশ্বকাপের মঞ্চে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের আরেকটি বিপর্যয় এবং টুর্নামেন্ট থেকে লজ্জাজনক বিদায়ের পর শুরু হয়ে গেছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। ডার্ক হর্স নরওয়ে এবং তাদের স্ট্রাইকার আরলিং হালান্ডের গোলে শেষ ষোলোতেই ভেঙে গেছে সেলেসাওদের বিশ্বকাপ স্বপ্ন। মূলত, উত্তর আমেরিকার এই টুর্নামেন্টে ব্রাজিল কখনোই নিজেদের চেনা ছন্দে ফিরতে পারেনি। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া ও সমন্বয়হীন স্কোয়াডের কারণে শুরু থেকেই ধুঁকছিল তারা, যেখানে পুরো দলকে প্রায় একাই টানতে হচ্ছিল ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে।
নিউ জার্সিতে শেষ ষোলোর এই হতাশাজনক বিদায়ের পর এখন বড়সড় প্রশ্নের মুখে পড়েছেন দলটির বিশ্বখ্যাত ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। এক বছর আগে যখন তিনি ব্রাজিলের কোচের দায়িত্ব নেন, তখন ভাবা হয়েছিল তার হাত ধরেই বিশ্বফুটবলের শীর্ষ আসনে ফিরবে সেলেসাওরা। কিন্তু ১২ মাস পর ডাগআউটে এই ইতালিয়ান কোচের ভবিষ্যৎ এখন চরম হুমকির মুখে। ব্রাজিলে ইতোমধ্যে তার বিদায়ের দাবি জোরালো হচ্ছে, যদিও আনচেলত্তি নিজে একে শেষ মানতে নারাজ; তার মতে এটি ‘নতুন এক চক্রের শুরু’। তবে পেছনের দিকে তাকালে এটা স্পষ্ট যে দল গঠন থেকে শুরু করে বেশ কিছু বড় সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে মারাত্মক ভুল করে বসেছিলেন তিনি।
২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের এই অকাল বিদায়ের পেছনে মূল কারণগুলো কী ছিল, তার একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে গোল ডট কম।
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া রক্ষণ ও দল
ব্রাজিলের এই বিপর্যয়ের বড় একটি কারণ ছিল আনচেলত্তির দল নির্বাচন। দেশে বিকল্প ও উদীয়মান খেলোয়াড়ের অভাব রয়েছে, এমন একটি ধারণার ওপর ভিত্তি করে তিনি একঝাঁক বয়স্ক ও পুরোনো খেলোয়াড়ের ওপরই ভরসা রেখেছিলেন। দলের তিন গোলকিপারের বয়স ছিল যথাক্রমে ৩৩, ৩২ ও ৩৮ বছর। আর টুর্নামেন্টে ডাক পাওয়া ডিফেন্ডারদের গড় বয়স ছিল ৩১ বছর; যার মধ্যে দানিলো এবং অ্যালেক্স সান্দ্রোর মতো জুভেন্টাসের সাবেক দুই ফুলব্যাকও ছিলেন, যাদের বর্তমান ফুটবলে বড্ড বেমানান লাগছিল। মাঝ মাঠেও ৩৪ বছর বয়সী কাসেমিরোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করা হয়েছে এবং লিভারপুলের সাবেক ৩২ বছর বয়সী মিডফিল্ডার ফাবিনহোকেও দেওয়া হয়েছে প্রচুর খেলার সুযোগ।
বোর্নমাউথের ১৯ বছর বয়সী তরুণ রায়ান কিংবা বোটফোগোর ২৫ বছর বয়সী দানিলো ভবিষ্যতের কিছুটা আশা জাগালেও বিদায়ের পর আনচেলত্তি নিজেই স্বীকার করেছেন যে দলে নতুন রক্তের বড্ড প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘আমাদের তরুণ প্রতিভা দরকার, ব্রাজিলের ফুটবলে উচ্চমানের খেলোয়াড়দের উঠে আসা প্রয়োজন। এই জাতীয় দলটির একটি শক্ত ভিত্তি আছে, অনেক দুর্দান্ত খেলোয়াড় আছেন, যারা খেলা চালিয়ে যাবেন, তবে কিছু নতুন খেলোয়াড়কেও এখানে আসতে হবে।’
নেইমারকে নিয়ে বাজি
ব্রাজিল স্কোয়াডে সবচেয়ে বড় বিতর্ক ও আলোচনা তৈরি করেছিল ৩৪ বছর বয়সী নেইমারের অন্তর্ভুক্তি। চোটের কারণে ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে দেশের হয়ে কোনও ম্যাচ না খেললেও, মিডিয়া ও একদল উগ্র সমর্থকের তীব্র চাপে আনচেলত্তি এই ফরোয়ার্ডকে দলে নেওয়ার এক ঝুঁকিপূর্ণ জুয়া খেলেন। ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো। বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে সান্তোসের এই সুপারস্টার কাফ ইনজুরিতে পড়েন। এই চোটের কারণে দুই থেকে তিন সপ্তাহের জন্য ছিটকে গিয়ে তিনি প্রথম দুটি গ্রুপ ম্যাচ মিস করেন। তৃতীয় ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে বদলি হিসেবে মাত্র ১৪ মিনিট মাঠে ছিলেন। মিয়ামির সেই ম্যাচে তাকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি কোনও আন্তর্জাতিক ম্যাচ নয়, বরং বিদায়ী প্রদর্শনী ম্যাচ খেলছেন।
জাপানের বিপক্ষে শেষ বত্রিশের রুদ্ধশ্বাস জয়ের ম্যাচে আনচেলত্তি নেইমারকে মাঠে নামানোর কোনও প্রয়োজনই বোধ করেননি। আর নরওয়ের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে যখন দল হার এড়াতে লড়ছিল, তখন বদলি হিসেবে কিছুটা বেশি সময় পেলেও নেইমার ছিলেন পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। যদিও ম্যাচের শেষদিকে সান্ত্বনাসূচক একটি পেনাল্টি গোল তিনি করেছিলেন, তবে এটিই যে ব্রাজিলের জার্সিতে তার শেষ ম্যাচ, তা বলাই বাহুল্য।
জোয়াও পেদ্রোকে চরম উপেক্ষা
নেইমারের চোট ও দলে তার ভূমিকা না থাকার কারণে চেলসির স্ট্রাইকার জোয়াও পেদ্রোকে দলে না রাখার সিদ্ধান্তটি এখন আরও বেশি অবিশ্বাস্য ও প্রশ্নবিদ্ধ ঠেকছে। নেইমারের অন্তর্ভুক্তির কারণেই মূলত ২৪ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকারকে নির্মমভাবে ঘরের মাঠে রেখে যাওয়া হয়। অথচ চেলসির হয়ে নিজের প্রথম মৌসুমেই তিনি গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে ২৯টি অবদান রেখেছিলেন। সবাই ধরেই নিয়েছিল পেদ্রো বিশ্বকাপ স্কোয়াডে থাকবেন এবং সম্ভবত ব্রাজিলের ‘নাম্বার নাইন’ হিসেবে মূল একাদশেও খেলবেন। এমনকি দল ঘোষণার সময় আনচেলত্তি নিজেও স্বীকার করেছিলেন যে, ‘পেদ্রো সম্ভবত এই তালিকায় থাকার যোগ্য ছিলেন।’
ব্রাজিলের এই বিদায় নিয়ে যে দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক তদন্ত শুরু হতে যাচ্ছে, সেখানে পেদ্রোকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি বারবার সামনে আসবে। বিদায়ের পর ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার রোনালদো নাজারিও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি মনে করি এই বিদায়ের শুরুটা হয়েছে ডাগআউটের ভুল সিদ্ধান্তগুলো থেকে। আমি এখনও বুঝতে পারছি না জোয়াও পেদ্রো কেন এই স্কোয়াডে ছিলেন না। ও দুর্দান্ত একটা মৌসুম কাটিয়েছে, ছন্দে ছিল, আর ব্রাজিলের এমন একজন স্ট্রাইকার দরকার ছিল যে ভিন্ন কিছু উপহার দিতে পারে।’
এলোমেলো মিডফিল্ড
ভুল দল নির্বাচন এবং বুড়িয়ে যাওয়া তারকাদের ওপর অতি-নির্ভরতার কারণে ব্রাজিলের মিডফিল্ড ছিল সবচেয়ে দুর্বল জায়গা। পুরো মাঝমাঠ সচল রাখা এবং ক্রিয়েটিভ পাস দেওয়ার সব চাপ একা সামলাতে হয়েছে নিউক্যাসলের ব্রুনো গিমারায়েসকে। শুরুতে আনচেলত্তির স্কোয়াডে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার ছিল মাত্র পাঁচজন (যার মধ্যে লুকাস পাকেতা মূলত নাম্বার টেন হিসেবে খেলেন)। পরে রাইট-ব্যাক ওয়েসলির চোটের কারণে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দিতে যাওয়া এদেরসনকে দলে নেওয়া হয়। গিমারায়েস টুর্নামেন্টে ৪টি অ্যাসিস্ট করে নিজের সেরাটা দিলেও অন্য প্রান্ত থেকে কোনও সহযোগিতা পাননি। কোচ বেঞ্চে থাকা এদেরসন বা দানিলোর ওপর ভরসা করতে না পারায় তাদের নামিয়েছেনও খুব কম সময়ের জন্য।
নরওয়ের কাছে হারের পর ইতালিয়ান কোচও মিডফিল্ডের এই দুর্বলতার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে, তবে এটা খুবই স্পষ্ট যে মিডফিল্ডে আমাদের কিছু খেলোয়াড় পরিবর্তন করতে হবে।’
পেনাল্টি শটে ভুল খেলোয়াড়?
নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচের প্রথমার্ধে পেনাল্টি মিসের ঘটনাটি নিয়ে ফুটবল মহলে তীব্র বিতর্ক চলছে। ব্রাজিলের হয়ে ব্রুনো গিমারায়েস সেই পেনাল্টি শটটি নিতে এগিয়ে যান এবং তার শটটি নরওয়ের কিপার আটকে দেন। ম্যাচের সেই মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্তের ধাক্কা সামলে ব্রাজিল আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি। দলের প্রধান গোলস্কোরার ও দুর্দান্ত ফর্মে থাকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রই এই পেনাল্টিটি নেবেন বলে সবাই আশা করেছিলেন, কিন্তু সবাইকে অবাক করে নিউক্যাসেল অধিনায়ক ব্রুনো স্পট-কিক নেন। পরে আনচেলত্তি জানান, এই সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি পরিসংখ্যান দেখে নেওয়া হয়েছিল।
কোচ বলেন, ‘আমরা খেলোয়াড়দের পেনাল্টির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করেছিলাম। সেই অনুযায়ী রাফিনিয়া ছিল আমাদের সেরা বিকল্প। এরপর দ্বিতীয় সেরা ছিল নেইমার। যেহেতু তারা কেউই তখন মাঠে ছিলেন না, তাই ব্রুনো গিমারায়েসকে বেছে নেওয়া হয়। ব্রুনোর পরে তালিকায় ছিল মার্তিনেল্লি। পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করেই আমরা ব্রুনোকে সেরা মনে করেছিলাম।’
ভাগ্যের পরিহাস ও চোটের আঘাত
দল নির্বাচন নিয়ে আনচেলত্তির সমালোচনা প্রাপ্য হলেও, কিছু ক্ষেত্রে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস এবং চোটের আঘাতের কথা বলে তিনি পার পেয়ে যেতে পারেন। বিশ্বকাপ শুরুর আগে এবং টুর্নামেন্ট চলাকালীন একের পর এক মূল খেলোয়াড়ের ইনজুরি ব্রাজিলের বেঞ্চের গভীরতা ও শক্তিকে একদম শেষ করে দিয়েছিল। দল ঘোষণার আগেই এদের মিলিতাও, রদ্রিগো এবং এস্তেভাও উইলিয়ানের মতো তারকারা ছিটকে যান। ফলে মূল রাইট-ব্যাক এবং উইংয়ের দুই প্রধান গেম-চেঞ্জারকে ছাড়াই মাঠে নামতে হয় ব্রাজিলকে।
মূল পর্বেও এই ভাগ্য বদলায়নি। নেইমারের চোটের পাশাপাশি রাফিনিয়া এবং পাকেতাও হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে পড়েন। রাফিনিয়া হাইতির বিপক্ষে দ্বিতীয় গ্রুপ ম্যাচের প্রথমার্ধে চোট পেয়ে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যান এবং পাকেতা জাপানের বিপক্ষে নকআউট ম্যাচের হাফ-টাইমে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন।
‘এটি শেষ নয়, নতুন শুরু’
তবে এত বড় ব্যর্থতার পরও আনচেলত্তি মনে করেন, ব্রাজিলের ফুটবলের শীর্ষস্থানে ফেরার দীর্ঘ ও কঠিন পথের এটি কেবলই প্রথম পদক্ষেপ। অভিজ্ঞ এই ইতালিয়ান কোচ বলেন, ‘একটি পরাজয় হলো নতুন এক অভিযানের শুরু। আমাদের উন্নতি করতে হবে, নতুন আইডিয়া খুঁজতে হবে। এটি কোনও শেষ নয়, এটি একটি নতুন চক্রের শুরু।’
তিনি আরও বলেন, ‘কাজের প্রতি নতুন উদ্দীপনা এবং খেলোয়াড়দের সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমে আমরা এই পরাজয়ের ধাক্কা কাটিয়ে উঠব। আমরা এই বছর যেভাবে কাজ করেছি, সেভাবেই নতুন কিছু করার চেষ্টা করব। আমি মনে করি আমরা ভালো কাজই করেছি। ফুটবল এমনই; কখনও কখনও পরাজয়ের দুঃখকেও মেনে নিতে হয়। আমি এতে অভ্যস্ত।’
সূত্র: গোল ডট কম