আমদানি পণ্যের শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা, দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত করা এবং ব্যবসার অতিরিক্ত ব্যয় কমাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই)। সংগঠনটির অভিযোগ, সরকারি নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বারবার কায়িক পরীক্ষা এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতার কারণে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব হচ্ছে। এতে ব্যবসার খরচ বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
রবিবার (১২ জুলাই) এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব আহসান এইচ হাবিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এসব দাবি তুলে ধরেন চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক।
চিঠিতে নবনিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে অভিনন্দন জানিয়ে চেম্বার আশা প্রকাশ করে, তাঁর নেতৃত্বে বাস্তবমুখী সংস্কারের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ আরও সহজ হবে এবং বাংলাদেশের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচকের অবস্থানের উন্নতি ঘটবে।
চট্টগ্রাম চেম্বার স্মরণ করিয়ে দেয়, সম্প্রতি চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত এক সভায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে চার দিনের মধ্যে শুল্কায়ন সম্পন্ন করে আমদানি পণ্য খালাসের নির্দেশ দিয়েছিলেন। একইসঙ্গে বন্দরের অচল স্ক্যানার সচল করা, জাহাজ ও কনটেইনারজট কমানো এবং বন্দরের কার্যক্ষমতা বাড়ানোর নির্দেশনাও দেন তিনি। তবে চেম্বারের দাবি, এসব নির্দেশনার বাস্তব প্রতিফলন এখনো কাস্টমস কার্যক্রমে দেখা যাচ্ছে না।
চিঠিতে বলা হয়, কিছু কাস্টমস কর্মকর্তার অসহযোগিতা, প্রশাসনিক জটিলতা, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বয়হীনতা এবং অপ্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ার কারণে পণ্য খালাস বিলম্বিত হচ্ছে। ফলে আমদানিকারকদের অতিরিক্ত বন্দর চার্জ, কনটেইনার ডিটেনশন ফি, ল্যাব পরীক্ষার ব্যয়সহ নানা ধরনের অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে।
সংগঠনটি অভিযোগ করে, একই চালান একাধিক সংস্থার মাধ্যমে বারবার কায়িক পরীক্ষা, স্ক্যানিংয়ের পরও পুনরায় ম্যানুয়াল পরীক্ষা, স্থানীয় পরীক্ষাগারের অভাবে নমুনা ঢাকায় পাঠানো এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইলেকট্রনিক সার্টিফিকেট অব অরিজিন (ই-সিও) থাকলেও স্বাক্ষর যাচাইয়ের নামে বিলম্ব— এসব কারণে শুল্কায়ন প্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে।
এ ছাড়া যেসব পণ্যের জন্য বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) সনদ বাধ্যতামূলক নয়, সেসব ক্ষেত্রেও অনেক সময় সনদ সংগ্রহে বাধ্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়। এতে সময় ও ব্যয়—দুই-ই বাড়ছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, এসব কারণে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে সাধারণত ৭ থেকে ৮ দিন সময় লাগছে; কোনও কোনও ক্ষেত্রে এর চেয়েও বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। বারবার কনটেইনার খোলা ও কায়িক পরীক্ষার সময় বৃষ্টি বা বৈরী আবহাওয়ায় পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অনেক ক্ষেত্রে বিক্রির অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের অভিযোগ, বিদ্যমান বিধিমালায় নির্ধারিত মূল্যায়ন পদ্ধতি অনুসরণ না করে অনেক ক্ষেত্রে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ নিজস্ব বিবেচনায় আমদানি পণ্যের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য নির্ধারণ করে। এতে খালাস প্রক্রিয়া আরও জটিল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে ওঠে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, কাস্টমস অ্যাক্ট, ২০২৩-এ পেপারলেস কাস্টমস, প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেসিং এবং ঝুঁকিভিত্তিক পরীক্ষার মতো আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকলেও সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে ব্যবসায়ীরা প্রত্যাশিত সুফল পাচ্ছেন না।
এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মানের কাস্টমস ব্যবস্থা চালু, ঝুঁকিভিত্তিক পরীক্ষা নিশ্চিত, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা, দ্রুত কার্গো খালাস এবং ব্যবসার কমপ্লায়েন্স ব্যয় কমাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার।
সংগঠনটির মতে, এসব সংস্কার বাস্তবায়িত হলে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় কমবে, পণ্য খালাসের সময় হ্রাস পাবে এবং দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশ আরও উন্নত হবে।