নরসিংদীর রায়পুরার মেথিকান্দা রেলস্টেশনে হামলায় নিহত বাকপ্রতিবন্ধী নারীর পরিচয় এবং স্বজনের সন্ধান মিলেছে। ওই নারীর মৃত্যুর খবর ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পেরে শনিবার দুপুরে তার কবর জিয়ারত করতে আসেন দুই স্বজন। তারা জানান, ওই নারীকে ববি বেগম হিসেবে সবাই চিনলেও তার আসল নাম ওয়াহিদা বেগম। দীর্ঘ ২৫ বছর পর তার খোঁজ পেয়েছেন স্বজনরা। এতদিন গৃহহীন ও ভবঘুরে হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
নিহত ওয়াহিদা বেগম (৭০) বগুড়ার গাবতলী উপজেলার রামেশ্বরপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ঘোন সাগাটিয়া গ্রামের বাসিন্দা। ওই গ্রামের মৃত রহিম উদ্দিন প্রামাণিক ও মৃত আনিসা বিবি দম্পতির বড় মেয়ে। স্থানীয় ইউপির সদস্য, প্রতিবেশী, বগুড়ার গাবতলী মডেল থানা ও ভৈরব রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তার পরিচয় নিশ্চিত করেছেন।
রবিবার বিকালে গাবতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিব হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ফেসবুকে জানতে পেরে স্বজনরা সেখানে গিয়ে কবর জিয়ারত করে এসেছেন। ওই এলাকায় তিনি ববি বেগম নামে পরিচিত হলেও আসল নাম ওয়াহিদা বেগম। সাগাটিয়া গ্রামের বাসিন্দা মৃত রহিম উদ্দিন প্রামাণিক ও মৃত আনিসা বিবি দম্পতির বড় মেয়ে। বাবা-মা, চার ভাই ও চার বোনের মধ্যে এক ভাই ছাড়া সবাই বাকপ্রতিবন্ধী। প্রায় ২৫ বছর আগে বিয়ের দেড় বছরের মাথায় স্বামী মারা যান। এরপর একমাত্র মেয়ে সন্তানেরও মৃত্যু হয়। শোকাহত ওয়াহিদা বেগম বোনের সঙ্গে ঝগড়া করে ট্রেনে উঠে বাড়ি থেকে চলে যান। পরিবারের সদস্যরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাননি। তারা ধরে নিয়েছিলেন ওয়াহিদা বেগম মারা গেছেন। বাকশক্তি না থাকায় নিজেও নাম-পরিচয় কিছুই প্রকাশ করতে পারেননি।
স্বজনরা জানান, ওয়াহিদার বিয়ের দেড় বছরের মাথায় স্বামীর মৃত্যু হয়। তাদের ঘরে জন্ম নেওয়া একমাত্র মেয়েটিও জন্মের পর পর মারা যায়। তখন খুব একা হয়ে গিয়েছিলেন ওয়াহিদা, বাবার বাড়িতেই থাকছিলেন। ২৫ বছর আগে ছোট বোনের সঙ্গে ঝগড়া করে ওয়াহিদা বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। এর আগে প্রায় সময়ই তিনি রাগ করে অন্য বোনের বাড়িতে যেতেন আবার চলে আসতেন। কিন্তু সেদিনের ঝগড়ার পর তিনি আর বাড়িতে ফেরেননি। তাকে কোথাও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারা মনে করেছিলেন মৃত্যু হয়েছে।
ওয়াহিদার ভাগ্নি জামাই সৈকত ইসলাম জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে তিনি ফেসবুকে চোখ বোলাচ্ছিলেন, ওই সময় রেলস্টেশনে মারধরে বৃদ্ধ নারীর নিহতের ঘটনাটি তার সামনে আসে। পাশে থাকা স্ত্রীকে ঘটনাটি তিনি দেখান। স্ত্রী সেটি দেখে বলেন, নিহত নারীকে পরিচিত মনে হচ্ছে, তার খালা ওয়াহিদার মতো। পরদিন বাড়িতে সব আত্মীয়-স্বজনদের ছবিটি পাঠানো হলে তারাও নিশ্চিত করেন ববি বেগম আসলে ওয়াহিদা।
ভাগনে গোলাম রব্বানী বলেন, ‘আমার মায়ের সঙ্গেই ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়েছিলেন ওয়াহিদা খালা। ভিডিও কল করে বাড়ির সবাইকে খালার কবর তিনি দেখিয়েছি। শেষ পর্যন্ত ২৫ বছর পর খালার খোঁজ পেলাম, তাও মৃত্যুর পর। রবিবার তার ভাইবোনসহ আরও আত্মীয়স্বজন কবর জিয়ারত করতে যাবেন।’
ওয়াহিদাদের প্রতিবেশী এনামুল হক জানান, দরিদ্র পরিবারটির সবাই বাক প্রতিবন্ধী। ২৫ বছর আগে ওয়াহিদা নিখোঁজ হন। এরপর খোঁজখবর করেও সন্ধান পায়নি পরিবার। এত দিন পরিবারসহ প্রতিবেশীরা জানতেন, ওয়াহিদা মারা গেছেন। নরসিংদীতে মেথিকান্দা রেলস্টেশনে হামলা ও লুটের শিকার হয়ে খুন হওয়ার পর বিভিন্ন মাধ্যমে তার ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর সেই ছবি দেখে স্বজন ও প্রতিবেশীরা তাকে চিনতে পারেন।
এদিকে বাড়ি ছেড়ে চলে আসার পর মেথিকান্দা স্টেশনের লোকজন ও আশপাশের মানুষ তাকে ববি বেগম বলে ডাকতে শুরু করেন। তখন থেকেই ওই নামে পরিচিত। স্টেশনের শৌচাগার ও প্ল্যাটফর্ম ঝাড়ু দিয়ে এবং চেয়ে যে অর্থ পেতেন তা দিয়েই জীবিকা নির্বাহ করতেন। রাতে স্টেশনের পরিত্যক্ত কক্ষে ঘুমাতেন।
রেলওয়ে পুলিশ ও স্টেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, দুই যুগ আগে এক দুপুরে মেথিকান্দা স্টেশনে থামা একটি ট্রেন থেকে নেমেছিলেন ওয়াহিদা। এরপর আর কোথাও যাননি, স্টেশনটির পরিত্যক্ত একটি কক্ষ ছিল তার আশ্রয়। বিনা বেতনে প্ল্যাটফর্ম ঝাড়ু দেওয়া ও শৌচাগার পরিষ্কারসহ বিভিন্ন পরিচ্ছন্নতার কাজ করতেন। স্টেশন এলাকা ও আশপাশের সবাই তাকে চিনতেন। কেউ খাবার দিতেন, কেউ ৫-১০ টাকা সহযোগিতা করতেন। ওই টাকা খরচ না করে দুই যুগ ধরে জমিয়েছিলেন। সেই টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য ওই নারীর ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা।
গত ৪ জুলাই রাত ২টার দিকে মেথিকান্দা স্টেশনের পরিত্যক্ত এক কক্ষে ঘুমিয়ে থাকা ওয়াহিদাকে মারধর করে দীর্ঘদিনের জমানো টাকা লুট করে নিয়ে যায় একদল দুর্বৃত্ত। হামলার সময় তার চোখ, মুখ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত করা হয়। ৭ জুলাই রাত সাড়ে ১১টার দিকে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। রাত সোয়া ১টার দিকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়।
কোনও স্বজন না থাকায় প্রথমে ওই নারীর লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের কথা ভাবা হয়েছিল। তবে স্থানীয় মানুষের অনুরোধে প্রশাসন, পুলিশ ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় স্টেশন সংলগ্ন সামাজিক কবরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। এ ঘটনায় মেথিকান্দা স্টেশনমাস্টারের দায়ের করা মামলায় এরই মধ্যে পাঁচ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
শনিবার দুপুরে ওই নারীর স্বজন দাবি করে তার কবর জিয়ারত করতে আসেন দুজন। তাদের একজনের নাম সৈকত ইসলাম, অপরজন গোলাম রব্বানী। তারা সঙ্গে করে একটি পাসপোর্ট সাইজের ছবি নিয়ে এসেছিলেন। স্থানীয় বয়স্ক লোকজন ওই ছবি দেখে নিশ্চিত হন, এটি নিহত নারীরই ছবি। পরে ওই নারীর জীবনের বিস্তারিত বর্ণনা তুলে ধরেন স্বজনরা।
তারা বলেন, নিহত নারী ববি বেগম নামে পরিচিত হলেও প্রকৃত নাম ওয়াহিদা বেগম। তার বাবা রহিম উদ্দিন প্রামাণিক ও মা আনিসা বিবি, দুজনই বাকপ্রতিবন্ধী ছিলেন। তাদের আট সন্তানের মধ্যে সাত জনই বাকপ্রতিবন্ধী হয়ে জন্মান। ওয়াহিদাসহ তিন ভাইবোনের মৃত্যু হয়েছে। জীবিত পাঁচ জনের সবাই বাকপ্রতিবন্ধী।
ভৈরব রেলওয়ে থানার ওসি মো. সাঈদ আহমেদ বলেন, ‘রেলস্টেশনে নিহত নারীর নাম ওয়াহিদা বেগম। তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য আমরা নিশ্চিত হয়েছি। তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দুজন শনিবার এসে কবর জিয়ারত করেছেন, অন্য সদস্যদের রবিবার আসার কথা আছে।’