জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য, সংগীত, দর্শন ও সৃষ্টিকর্মকে বিশ্বমঞ্চে আরও শক্তভাবে তুলে ধরতে পাঠ্যপুস্তক, গবেষণা, প্রকাশনা, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট নজরুল গবেষক, শিল্পী, কবি ও আবৃত্তিশিল্পীরা।
রোববার (১২ জুলাই) জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত সম্মিলন ও মতবিনিময় সভায় তারা এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, বাস, ট্রেন, বিমানসহ বিভিন্ন গণপরিবহন এবং জনসমাগমস্থলে নজরুলের গান ও সৃষ্টিকর্ম প্রচারের ব্যবস্থা করা হলে নতুন প্রজন্মের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর সাহিত্য, সংগীত ও দর্শন আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।
তারা শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়েও নজরুল প্রতিভা অন্বেষণ, কর্মশালা, গবেষণা কার্যক্রম জোরদার এবং বিদেশে ‘নজরুল কালচারাল সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নজরুলচর্চা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বক্তাদের মতে, শুধু গান, কবিতা বা নৃত্য নয়—যন্ত্রসংগীত, সেমিনার, কর্মশালা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শুদ্ধ বাণী ও সুরে নজরুলচর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে নেওয়া কর্মসূচিগুলো যেন বছরব্যাপী উদ্যোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত থাকে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এ ছাড়া নজরুলের সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণ, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আরও বিস্তৃত প্রচার, জনপরিসরে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, নজরুল কালচারাল মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা এবং ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে একটি থিম সং তৈরির প্রস্তাবও উঠে আসে। প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের পাশাপাশি উদীয়মান শিল্পীদেরও বিভিন্ন আয়োজনে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে শিল্পী-গবেষকদের মতামত শোনেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এমপি। তিনি বলেন, “দেশকে মাদকমুক্ত এবং মৌলবাদ ও উগ্রবাদ নির্মূল করে উন্নত সমাজ গঠনের অন্যতম হাতিয়ার সংস্কৃতি ও শিক্ষা। আমাদের লালন, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালীর মতো লোকঐতিহ্য নতুন প্রজন্মকে মূল্যবোধ শেখায়। প্রাথমিক স্তর থেকেই কাজী নজরুল ইসলামের গান, কবিতা ও লেখনী পাঠ্যপুস্তকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।”
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এমপি। সম্মানিত অতিথি ছিলেন জাতীয়তাবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)-এর আহ্বায়ক হেলাল খান। সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেন।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ও কবি শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (রেজাউদ্দিন স্টালিন) বলেন, “প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭’ উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি বছরব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সেই কর্মসূচিগুলোকে আরও জনমুখী, অংশগ্রহণমূলক ও ফলপ্রসূ করতে আজকের এই মতবিনিময়ের আয়োজন করা হয়েছে। শিল্পী-গবেষকদের পরামর্শের ভিত্তিতেই কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।”
সম্মিলনে দেশের বিভিন্ন মাধ্যমের প্রায় ৪০০ কণ্ঠশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, আবৃত্তিশিল্পী ও নজরুল গবেষক অংশ নেন।
তাঁদের মধ্যে বক্তব্য দেন অধ্যাপক ড. নাশিদ কামাল, ইয়াকুব আলী খান, গাজী আব্দুল হাকিম, সীমা ইসলাম, লুবনা মারিয়াম, খায়রুল আনাম শাকিল, সাদিয়া আফরীন মল্লিক, এ এফ এম হায়াত উল্লাহ, সাজু আহমেদ, ফেরদৌস আরা, অধ্যাপক প্রিয়াংকা গোপ, মাহমুদুল হাসান, কল্পনা আনাম, ফাতেমা তুজ জোহরা ও সুজিত মোস্তফাসহ আরও অনেকে।