বিশ্বের অন্যতম বিতর্কিত প্রাণঘাতী আগাছানাশক প্যারাকুয়াট ভারতের কৃষিজমিতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রণালয় এই বিষাক্ত রাসায়নিকের আমদানি, উৎপাদন, বিক্রি, পরিবহন ও ব্যবহারের ওপর তাৎক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে একটি খসড়া বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। চিকিৎসাবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তটি আরও অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল। কারণ, এটির আবিষ্কারক ও উৎপাদনকারীসহ বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশে ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ হলেও ভারতে এতদিন আইনিভাবেই এটি ফসলের মাঠে স্প্রে করা হচ্ছিল।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুনে ক্ষতিকারক রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো। খসড়া বিজ্ঞপ্তিটি চূড়ান্ত করার আগে অংশীজনদের আপত্তি ও পরামর্শ জমা দেওয়ার জন্য ১৩ জুলাই থেকে ৩০ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে।
প্যারাকুয়াট কোনও সাধারণ আগাছানাশক নয়; চিকিৎসকদের মতে এটি অন্যতম মারাত্মক রাসায়নিক, কারণ এর কোনও নির্দিষ্ট প্রতিষেধক নেই। সামান্য পরিমাণ প্যারাকুয়াট শরীরে প্রবেশ করলে তা ফুসফুসকে এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে যে রোগী আর শ্বাস নিতে পারে না। এ ছাড়া এটি কিডনি, লিভার, ত্বক ও চোখের মারাত্মক ক্ষতি করে। অসাবধানতাবশত গিলে ফেলা, স্প্রে করার সময় শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ভেতরে যাওয়া কিংবা ক্ষতের সংস্পর্শে আসার কারণে প্রতিনিয়ত কৃষক ও কৃষিশ্রমিকেরা এর মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও মৃত্যুর মুখোমুখি হন। এই বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর হার অত্যন্ত বেশি।
এর আগে কেরালা ও অন্ধ্রপ্রদেশের মতো কয়েকটি রাজ্য প্যারাকুয়াটের ব্যবহারে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করলেও তা আইনি ও প্রযুক্তিগত জটিলতায় পড়ে। তবে এবার সরকারি বিশেষজ্ঞ প্যানেল ও রেজিস্ট্রেশন কমিটির সুপারিশে কৃষি মন্ত্রণালয় দেশব্যাপী এই নিষেধাজ্ঞা জারি করতে যাচ্ছে। বিজ্ঞপ্তিটি চূড়ান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতে প্যারাকুয়াটের সব ধরনের লাইসেন্স ও নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে এবং ব্যবসায়ীদের তিন মাসের মধ্যে নিবন্ধন সার্টিফিকেট সমর্পণ করতে হবে।
ভারতে আনুষ্ঠানিকভাবে কেবল চা, আলু, তুলা, রাবার, কফি, ধান, ভুট্টা, গম এবং আঙুর এই ৯টি ফসলের জন্য এটি অনুমোদিত ছিল। কিন্তু রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশের মতো রাজ্যে কৃষকেরা ফসল দ্রুত শুকিয়ে শ্রমিকের খরচ বাঁচাতে কাটার ঠিক আগে মুগ ডালের ক্ষেতে এটি স্প্রে করতেন। এই অননুমোদিত ব্যবহারের ফলে এই বিষ মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছিল, যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার অন্যতম প্রধান কারণ।
প্যারাকুয়াট নিষিদ্ধের এই সিদ্ধান্তকে ভারতে আরও বড় নীতিগত পরিবর্তনের শুরু বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ গ্লাইফোসেট, ২,৪-ডি, ডাইমেথোয়েট এবং অ্যাসিফেটের মতো আরও বেশ কিছু ক্ষতিকারক রাসায়নিক ভারতে এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে, যা ক্যানসার বা স্নায়বিক সমস্যার ঝুঁকির কারণে বিদেশে নিষিদ্ধ। এসব ক্ষতিকারক উপাদানের উপস্থিতির কারণে ইউরোপে ভারতের কৃষি রফতানি বাতিলও হয়ে থাকে।