৩০ বছর বয়সী সাম্য গুপ্তা যখনই একা ভ্রমণে বের হন, চারপাশ থেকে প্রশ্ন উড়ে আসে, ‘একা কেন? স্বামী সঙ্গে আসেননি কেন?’ সাম্যর স্পষ্ট উত্তর, বিয়ের আগেও তাদের প্রত্যেকের আলাদা ব্যক্তিগত জীবন ও বন্ধু ছিল, এখনও আছে। তারা একে অপরের সিদ্ধান্তকে শ্রদ্ধা করেন এবং এভাবেই সুখী আছেন। কিন্তু আমাদের সমাজ বিষয়টিকে সহজে মেনে নিতে পারে না। বিয়ের পর কোনো সঙ্গী একা ঘুরতে গেলে, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিলে বা নিজের কোনও শখের কাজে সময় কাটালে সমাজ ধরেই নেয় সম্পর্কে নিশ্চয়ই কোনও ফাটল ধরেছে।
অথচ বিশেষজ্ঞরা বলছেন সম্পূর্ণ উল্টো কথা। সব সময় সবকিছু একসঙ্গে করাটাই বরং সম্পর্কে একাকীত্ব এবং নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলার বড় কারণ হতে পারে। বিবাহিত ভারতীয়দের ওপর করা সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিবাহিতদের মধ্যে ৪৬.৪ শতাংশ মানুষ মাঝারি থেকে উচ্চ মাত্রার একাকীত্ব অনুভব করেন, যার বড় অংশই ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী। গবেষণায় একাকীত্বের সঙ্গে নিম্নমানের দাম্পত্যের সরাসরি সংযোগ পাওয়া গেছে।
সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ সুবর্ণা ভার্দে বলেন, আমাদের সমাজে বিয়েকে ‘দুই দেহ এক প্রাণ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। শৈশব থেকে মা-বাবাকে সব কাজ একসঙ্গে করতে দেখে বড় হওয়া সন্তানরা সঙ্গীর স্বাধীনতাকে দূরত্ব মনে করে ভুল করে। কেউ একা ঘুরতে গেলেই ভাবা হয় সম্পর্কে ফাটল ধরেছে। এই স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সমাজে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যও স্পষ্ট। কোনও পুরুষ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিলে সেটিকে খাটাখাটনির পর ‘প্রাপ্য ছুটি’ মনে করা হয়, কিন্তু কোনও নারী একা সামাজিকীকরণে অংশ নিলে তার দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এমনকি আনন্দীবেন প্যাটেল যখন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণীদের অন্য সবকিছুর ওপরে ‘দক্ষ মা’ হওয়ার উপদেশ দেন, তখন তা যেন সেই পুরোনো বৈষম্যমূলক চিন্তা ও সংকীর্ণতাকেই মনে করিয়ে দেয়।
মুম্বাইয়ের সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ নম্রতা জৈন ব্যাখ্যা করেন, একটি স্বাস্থ্যকর দাম্পত্যের তিনটি ভিন্ন সত্ত্বা থাকে; ‘তুমি’, ‘আমি’ ও ‘আমরা’। সব সময় একসঙ্গে থাকার বাধ্যবাধকতা ঘনিষ্ঠতা বাড়ায় না, বরং ব্যক্তিগত সীমানা মুছে দিয়ে দমবন্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। সুস্থ দাম্পত্যের মানে হলো পরস্পরকে নিজের মতো করে সময় কাটানোর সুযোগ দেওয়া, যাতে তারা আরও সতেজ ও আবেগময় হয়ে সম্পর্কের কাছে ফিরতে পারেন। সাম্যর অভিজ্ঞতাও তা-ই বলে। নিজের মতো করে অভিজ্ঞতা অর্জন করে যখন তিনি স্বামীর কাছে ফিরে আসেন, তখন পারস্পরিক বিশ্বাস ও সম্পর্কের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।
সুবর্ণা ভার্দে মনে করিয়ে দেন, দাম্পত্যে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলা যেমন ভুল, তেমনই পুরোপুরি আলাদা জীবন যাপন করাও সমাধান নয়। দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের মূল চাবিকাঠি হলো একসঙ্গে পথ চলার পাশাপাশি নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার এক চমৎকার ভারসাম্য রক্ষা করা।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে