রাজধানীর উত্তরায় শিক্ষার্থীদের অবরোধে দীর্ঘ সময় রাস্তায় আটকে থাকতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। তাদেরই একজন বেসরকারি চাকরিজীবী সুমন আহমেদ। তিনি আক্ষেপ জানিয়ে বলেন, এক ঘণ্টার পথে যদি কয়েক ঘণ্টা বসে থাকা হয়, একটা মানুষ কাজ করবে কীভাবে। দুদিন পর পর কোনও না কোনও দাবি নিয়ে শিক্ষার্থীদের রাস্তা অবরোধ করা লাগে! রাস্তা অবরোধ করার প্রয়োজন পড়ে কেন, তার আগেই কেন সমাধান আসে না, এমন প্রশ্নও রাখেন তিনি।
বিভিন্ন সময় দাবি-দাওয়া নিয়ে শিক্ষার্থীদের রাজপথ অবরোধ করে দাবি আদায় করতে হয়েছে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, শিক্ষায় ভ্যাটসহ বিভিন্ন দাবিতে রাজপথে আন্দোলন করেছেন শিক্ষার্থীরা। এছাড়াও অটোপাসের দাবিতে কিংবা পরীক্ষা বাতিলের দাবিতেও আন্দোলন করেছেন তারা। তাদের এসব আন্দোলন নিয়েও প্রশ্ন ছিল—আসলেই সব আন্দোলন যৌক্তিক কিনা। এবার শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে দুদিন ধরে আন্দোলন করছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা।
এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচি, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা গ্রহণ, প্রশ্নপত্রের মান ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর অবমাননাকর মন্তব্যের (ফার্মের মুরগি) প্রতিবাদে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ, মিছিল করছেন পরীক্ষার্থীরা। দিনভর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় তারা সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানান। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সংসদে দাঁড়িয়ে নিজের বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সমাধান দেন পরীক্ষার প্রশ্নে ত্রুটি নিয়েও। শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করার পর বুধবারও আন্দোলন অব্যাহত ছিল। সচিবালয় ঘেরাও করার মতো কর্মসূচি দিয়েছে শিক্ষার্থীদের একাংশ। এতে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
অভিভাবকরা পরীক্ষার্থীদের দিকে দিচ্ছেন বাড়তি নজর
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ঘিরে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অভিভাবকরা। পরীক্ষার্থীদের রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলন করাকে তারা ভিন্ন চোখে দেখছেন। শঙ্কায় আছেন নিজের পরীক্ষার্থী সন্তানকে নিয়ে। তাদের মধ্যে এও শঙ্কা আছে—পরীক্ষা বাতিল হয়ে গেলে তার সন্তানকে আবারও কষ্ট করে পড়ে পরীক্ষা দিতে হবে।
সিটি কলেজের একজন পরীক্ষার্থীর মা নাসিমুন আরা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমার সন্তান কষ্ট করে পড়ালেখা করে পরীক্ষা দিয়েছে। এখন পরীক্ষা বাতিল হলে তার তো ডাবল খাটনি যাবে। আমি কখনও তার পরীক্ষার কেন্দ্রে যাই না। তবে আজকে গিয়েছি, যাতে অন্যদের সঙ্গে উসকানিতে যুক্ত না হতে পারে।’’
তিনি বলেন, ‘‘যাদের সমস্যা হয়েছে, সরকার তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করতে পারে। শুরু থেকে যদি সরকার বিষয়টা গুরুত্ব সহকারে নিতো তাহলে আজকে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না।’’
কয়েকজন অভিভাবক অতীতের ট্রমার কথা চিন্তা করেও সন্তানের পরীক্ষাকেন্দ্রের নিচে আজ দাঁড়িয়ে ছিলেন। তারা জানান, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনে আমাদের অনেকের বাচ্চারা মারা গেছে। এখন এদের আন্দোলন শুনলেই আতঙ্কে থাকি। আর যেনতেন কারণে তো আন্দোলন করলে—সেই আন্দোলনের কোনও স্পিরিট, সমর্থন, যথার্থতা থাকে না।
আন্দোলনে বহিরাগত অনুপ্রবেশের অভিযোগ
শিক্ষার্থীদের মতে, শিক্ষার্থীদের বারবার রাস্তায় নামতে হয় মূলত শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি, পরীক্ষা আয়োজনে অব্যবস্থাপনা, বৈষম্যমূলক নীতি এবং শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির প্রতি কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে। বারবার আলোচনা ও আশ্বাসের পরও এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান না মেলায় বাধ্য হয়ে তারা রাজপথে নেমে আসেন। তবে আন্দোলনে বেশ কয়েক জায়গায় বহিরাগত অনুপ্রবেশের অভিযোগও করেছেন তারা।
মঙ্গলবার রাতে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকায় সড়ক অবরোধের সময় বেশ কিছু যানবাহন ভাঙচুর করা হয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি– এই কাজ বহিরাগতদের। শিক্ষার্থীদের কেউ এই কাজ করেননি। এছাড়া বেশ কয়েক জায়গায় শিক্ষার্থীর বেশে আন্দোলনে থাকলেও তাদের কাছে ভুয়া আইডি কার্ড পাওয়া গেছে।
শিক্ষার্থীদের দাবি, তাদের যৌক্তিক আন্দোলন ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব কাজ করা হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ভাষার অপপ্রয়োগ নিয়েও আছে প্রশ্ন
শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে যৌক্তিকতা থাকলেও স্লোগানে তাদের ভাষা ও শব্দের ব্যবহার নিয়ে সমালোচনা আছে। দাবি আদায়ে স্লোগান, বক্তব্য যথার্থ হওয়াকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মনে করেন ছাত্রনেতারা। সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক মোজাম্মেল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘যেকোনও আন্দোলনের ক্ষেত্রে স্লোগান, বক্তব্য, গ্রাফিতি—এগুলো তো কমিউনিকেট করার মাধ্যম। আন্দোলনের স্লোগান, বক্তব্য, গ্রাফিতিগুলো যত যথার্থ হবে ততই আন্দোলন বিতর্কিত হবে না এবং মানুষের আকর্ষণ, সমর্থন ও সহযোগিতা বাড়বে।’’
তিনি বলেন, ‘‘এটাও বলা দরকার, এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ক্ষোভ এবং দাবি খুবই যৌক্তিক। শিক্ষামন্ত্রী আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন, যা নিন্দনীয়।’’
আন্দোলনের যৌক্তিকতা কতটুকু
শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল তিনটি—১. অনতিবিলম্বে মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে এবং অসঙ্গতিপূর্ণ কথাবার্তার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। যারা ১৩ জুলাই অস্বস্তিকর পরিবেশে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে এবং যারা করেনি– সব শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষা নিতে হবে এবং ১৫ জুলাইয়ের পরীক্ষা স্থগিত করতে হবে, পরীক্ষার নতুন রুটিন প্রকাশ করতে হবে এবং প্রশ্নপত্র শিক্ষার্থীবান্ধব হতে হবে।
শিক্ষামন্ত্রী মঙ্গলবার রাতে সংসদে তার বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমার ব্যক্তিগত মন্তব্য নিয়ে অনেকেই আপত্তি করেছেন। সে ব্যাপারেও বলতে চাই, আমি কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কিছু বলিনি। যদি কেউ আহত হয়ে থাকেন, সিম্পলি আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।
দ্বিতীয় দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রতিকূল আবহাওয়া কিংবা সংশ্লিষ্ট অনিবার্য কারণে চলমান এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা-২০২৬-এর কোনও বিষয়ে অংশগ্রহণ করতে না পারা পরীক্ষার্থীরা বিশেষ সুযোগ পাবেন। শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ইতোমধ্যে স্থগিত হওয়া সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অভিন্ন প্রশ্নপত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নির্ধারিত একই তারিখ ও সময়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন বলে শিক্ষামন্ত্রী জানান।
তারপরও আন্দোলনের যৌক্তিকতা কতটুকু, এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এই আন্দোলন একটি ধারাবাহিক আন্দোলন প্রক্রিয়ার অংশ। চব্বিশের আন্দোলনের পর শিক্ষার্থীরা যেভাবে বিদ্যালয়ে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশে এবং শিক্ষায় মনোনিবেশ বৃদ্ধিতে যে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল, সেখানে ঘাটতি থাকার ফলে তার নানামুখী বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে। তাই এ আন্দোলনে অবাক করার কিছু নেই। এর পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা, বিশেষ করে দেশব্যাপী অতি বৃষ্টির ফলে সৃষ্ট বন্যা, জলাবদ্ধতা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার ফলে অতীতে রাষ্ট্র যেভাবে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে, এবার সময় মতো সেভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এর পাশাপাশি প্রশ্নপত্রে ভুল এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অভিযোজন মানসিকতার ঘাটতি এ সম্পর্কে আরও প্রকট করেছে।’’
সরকার পরিস্থিতি এড়াতে পারতো কিনা?
অনেকেই বলছেন, সরকার কোনও একটা কিছু ঘটে যাওয়ার পর পদক্ষেপ নেয়। আগে থেকে পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারতো। কে এম এনামুল হক বলেন, ‘‘প্রশ্নটি সরকার এড়াতে পারতো কিনা, তার চেয়ে অনেক বেশি সরকার যথাযথ দায়িত্ব নিলো কিনা। যেকোনও আন্দোলন, প্রতিবাদ বা দাবি আদায়ের মতো উদ্যোগগুলোতে সর্বজন স্বীকৃত যেসব পন্থা আছে, বিগত কয়েক বছর যাবৎ সেখানে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির উন্মেষ বা ব্যবহার শিক্ষা খাতে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না হলেও সাধারণ মানুষের কাছে এর প্রবেশ-ক্ষমতা বেড়েছে। একইসঙ্গে পর্যাপ্ত দক্ষতা না থাকার কারণে মিসইনফরমেশন এবং ডিজইনফরমেশনের প্রভাব প্রকট হচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রেই সামাজিক ইনফ্লুয়েন্সারদের ভূমিকাও লক্ষণীয়।’’
তিনি বলেন, ‘‘দায়িত্বশীল পদে থেকে শিক্ষার্থীদের প্রতি অবমাননাকর বাক্য ব্যবহার, শিক্ষণ শিখন প্রক্রিয়ার সঙ্গে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার সাযুজ্যতার অভাব, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও চূড়ান্ত কারণে মান নিয়ন্ত্রণের অভাব ইত্যাদি মিলিয়ে বিষয়টি জটিল হয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় নিয়োজিত সম্পদের উল্লেখযোগ্য অংশ নতুন হওয়ায় এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহি কাঠামো কার্যকর না হওয়ায় সেখানকার স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর নানাভাবে ব্যাহত হয়েছে।’’
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘‘যে পরিস্থিতি ঘটেছে তা প্রত্যাশিত নয়, যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে তা কাম্য ছিল না। আমরা আশা করেছি যে একটা নির্বাচনের পর একটা সরকার এসেছে, আস্তে আস্তে পরিস্থিতি স্বাভাবিকের দিকে যাবে। কিন্তু আমাদের দুদিকেই একটা অস্থিরতা শিক্ষাঙ্গনে। এটাকে সামাল দিতে পারছে না কেন, বুঝতে পারছি না।’’
তিনি বলেন, ‘‘অস্থিরতা তো মনে করেছিলাম কমে যাবে। একবারে প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত কমবে মনে করেছিলাম। কিন্তু সেটা লাগাম টানতে পারছে না কেন, বুঝতে পারছি না। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীরাও যখন-তখন যেমন খুশি তেমন নেমে গেলো আন্দোলনে ইত্যাদি। এটাকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেত না? নীতিনির্ধারকরাও মনে হয় বুঝতে পারেননি যে শিক্ষার্থীরা এখন নানা ধরনের ট্রমার মধ্য দিয়ে এসেছে। এইচএসসি শিক্ষার্থীরা, পুরো জেলায় আন্দোলন থেকে শুরু করে এক ধরনের ট্রমা, মানসিক অস্থিরতার মধ্যেই দিনযাপন করেছে। এখন বোঝা উচিত কীভাবে কী করলে তাদের মঙ্গল হবে। এটা শুধু শিক্ষাক্রম বা পাঠ্যপুস্তক, এগুলোর বিষয় না। তাদের মেন্টাল হেলথের বিষয়টাও দেখা উচিত ছিল। কারণ শিক্ষার্থীরা ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে যে উত্তরণটা দরকার, তা হয়নি। যে ঘটনা ঘটেছে সেগুলো অবশ্যই অনভিপ্রেত। পরীক্ষা পরেও নেওয়া যেত। কারণ হাঁটুপানিতে বসে পরীক্ষা দেবে, এটা গ্রহণযোগ্য না।’’
কে এম এনামুল হক বলেন, ‘‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলছেন নীতিনির্ধারকরা। কিন্তু এই ছোটখাটো বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোই আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করে তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে। মিনিটের মধ্যে সবাই জেনে যায়, অস্থিরতা বাড়ে। এগুলো বোঝা উচিত আমাদের। বিশেষ করে নীতিনির্ধারকদের। আমি মনে করি, তারা দ্রুত ব্যবস্থা নিলে হয়তো এতদূর যেত না।’’