২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন একসময় রূপ নেয় গণআন্দোলনে। শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-নিপীড়নের কারণে আন্দোলন হয় তীব্র থেকে তীব্রতর। কোটা সংস্কারের দাবিতে যে আন্দোলন ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ— সেই আন্দোলন একপর্যায়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে যায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার মাধ্যমে। কবিতার মতোই ভীষণ রাগে ‘যুদ্ধ’ হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভাষ্য— এই যুদ্ধ ছিল সহপাঠীদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে। এই দিনটিকে বলা হয়, ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি রেজিস্টেন্স ডে’ , আজ ১৮ জুলাই সেই দিন।
প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি রেজিস্টেন্স ডে উপলক্ষে এদিন কোনও কর্মসূচি পালন করছে না প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশ (পুসাব)। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে— বন্যা পরিস্থিতির কারণে কর্মসূচি পেছানো হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের’ ব্যানারে শিক্ষার্থীরা অবস্থান কর্মসূচি, বিক্ষোভ, সমাবেশ এবং সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। ৭ জুলাই থেকে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। পরদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমানে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) এবং টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অবস্থান, বিক্ষোভ সমাবেশ ও রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলন করতে থাকেন।
আন্দোলনের দিনগুলো যত গড়িয়ে যায়, কর্মসূচি আরও কঠোর হতে থাকে। ঘোষণা আসে ‘বাংলা ব্লকেড’-এর। এতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সীমিত সময়ের জন্য সড়ক মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীরা রাজধানীতে অবরোধ কর্মসূচি পালন করায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থবির হয়ে পড়ে ঢাকা মহানগরী। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সারা দেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা।
রেলপথ, সড়কপথ অবরোধের মধ্যে দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যান শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি অবস্থান কর্মসূচি চলতে থাকে। এরপর ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আরও উত্তপ্ত হয় শিক্ষাঙ্গন। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা মধ্যরাতে প্রতিবাদ জানিয়ে মিছিল করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করা হয়। এতে বেশ কিছু শিক্ষার্থী আহত হন। ১৫ জুলাই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হয়। এর মধ্যে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। হামলার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা সারা দেশে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ডাক দেন।
শুরুতে এ আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পরে তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। আন্দোলন দমাতে সরকারের তরফে গুলি, টিয়ারশেল, লাঠিসহ বলপ্রয়োগ করা হয়। প্রথমে ফেসবুক, পরে ইন্টারনেট বন্ধ করে পরিস্থিতি সামাল দিতে চায় সরকার। তাতে হিতে বিপরীত হয়। ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তাকেই এ আন্দোলনের ‘প্রথম শহীদ’ হিসেবে সম্মান জানানো হয়।
শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গায়েবানা জানাজার চেষ্টা করা হয়। ১৭ জুলাই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে হল ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর বিপরীতে আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দেন ‘কমপ্লিট শাটডাউন’। আন্দোলনে যুক্ত হন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ১৮ জুলাই সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
১৮ জুলাই আসে প্রতিরোধের ডাক
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক যে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলছিল, ১২ জুলাইয়ের পর থেকে ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হতে থাকে। ১৫ জুলাই নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ হামলা করে শিক্ষার্থীদের ওপর, পুলিশ হামলা করে মেয়েদের ওপর, তার আগেও তারা হামলা করেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, কোটা নিয়ে আন্দোলনের প্রতি তাদের খুব একটা আগ্রহ ছিল না। কারণ খুব বেশি শিক্ষার্থী কোটা ব্যবহার করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করে না। বেশ কিছু আক্রমণের ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর, বিশেষ করে মেয়েদের ওপর আক্রমণ নিপীড়নের ঘটনা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চেতনায় প্রচণ্ড আঘাত করে। তখন পুরো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে ১৮ জুলাই মাঠে নামেন। এর আগে ১৫ জুলাই থেকে বেশ কিছু জায়গায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মিছিল হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে— ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, মিরপুরের বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউবিটি), ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। এভাবেই ছোট ছোট প্রতিবাদ শুরু হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে। ১৬ জুলাই যখন রংপুরে শিক্ষার্থী আবু সাঈদ শহীদ হলেন, ওই দৃশ্য সারা দেশের মানুষকে নাড়া দিয়েছে। ওই ঘটনার পর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এবং প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশ (পুসাব) মাঠে নামার ঘোষণা দেয়।
পুসাবের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুলাহ আল মাহফুজ জাকারিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘শিক্ষার্থীদের গুলি করে মেরে ফেলবে— এমনটা হতে দেওয়া যায় না। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই একদিনে সাত জন নিহত হন। আমরা আগে দেখেছি, রাজনৈতিক দল আন্দোলন করছে, কিন্তু সেগুলো সাধারণ মানুষকে ওইভাবে যুক্ত করেনি। যখন একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর গায়ে বুলেট মারা হয়েছে— এই ঘটনা আমাদের মানসিকভাবে পীড়া দিয়েছে। তখন ১৬ জুলাই আমরা সমন্বিতভাবে সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে আহ্বান জানাই। ১৭ জুলাই অল্প কিছু শিক্ষার্থী মাঠে নামার চেষ্টা করেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তখন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। কিছু কিছু জায়গায় ছাত্রলীগ সেসব কর্মসূচিতে হামলা করলো। তারা মিরপুরে বিইউবিটি’র শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে, ক্যাম্পাসেও হামলা করে ভাঙচুর চালায়। আমরা দেখলাম, আক্রমণ যে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হচ্ছে তা না, আমাদের ওপরেও হামলা হচ্ছে। সব ঘটনা মিলিয়ে ১৬ জুলাই রাতে সিদ্ধান্ত হয়—আমরা পূর্ণশক্তি দিয়ে আন্দোলনের দিকে যাবো।’’
তিনি বলেন, ‘‘১৫ জুলাই রাতে প্রাথমিক ঘোষণা হয়। আর ১৬ জুলাই আমরা সিদ্ধান্ত নিই আন্দোলনে নামার। ১৭ জুলাই গায়েবানা জানাজার কর্মসূচি রেখেছিলাম। পুলিশ এসে এই কর্মসূচি বানচাল করে দেয়। জানাজা পড়াতে যারা আসছিলেন, তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছিল। ওইদিন বিকাল থেকে রামপুরা এলাকার ব্র্যাক, ইস্ট ওয়েস্ট, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ান। অপরদিকে বসুন্ধরা এলাকায় নর্থ সাউথ, আইইউবি , এআইইউবি’র শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ শুরু করেন। এভাবে মিরপুর একটা জোন, উত্তরা ও ধানমন্ডি জোন আছে। এরা সবাই নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করা শুরু করেন। আর আমরা পুসাবের পক্ষ থেকে সবার সঙ্গে একটা কমন নেটওয়ার্ক তৈরি করে দেই, যাতে কেন্দ্রীয়ভাবে একটা কৌশলের মধ্য দিয়ে যায়। এর ফলে ১৮ জুলাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পূর্ণশক্তি নিয়ে মাঠে নামেন।’’
আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে যাওয়া ব্র্যাকের সামনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে হয় বলে মনে করেন শিক্ষার্থীরা। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর বড় ধরনের আক্রমণ করে পুলিশ ছত্রভঙ্গ করে দেয়। তখন সেদিকে এগিয়ে আসেন ইস্ট ওয়েস্টের শিক্ষার্থীরা। অপরদিকে নর্থ সাউথ এবং ইউআইইউ’র শিক্ষার্থীরাও চলে আসেন। ব্র্যাকের সামনে তারা সবাই প্রতিরোধ গড়ে তুলে পুলিশকে পিছু হটতে বাধ্য করেন।
সম্মিলিত প্রয়াসে প্রতিরোধের আত্মবিশ্বাস
১৮ জুলাই মেরুল বাড্ডায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশের সঙ্গে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে। একপর্যায়ে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে যায় পুলিশ। বাইরে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থেকেই পুলিশ ছররা গুলি ও রাবার বুলেট ছোড়ে। এতে আহত হন অনেকে। সেদিন প্রতিরোধের মুখে কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে আটকা পড়ে যান পুলিশের কিছু সদস্য। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদ থেকে হেলিকপ্টার দিয়ে উদ্ধার করতে দেখা গেছে।
এরপর রেলপথ, সড়কপথ অবরোধের মধ্যে দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যান শিক্ষার্থীরা। ১৮ জুলাই প্রতিরোধ শুরুর পর সারা দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করেন বলে জানান আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্তরা। সারা দেশের মানুষকে ফেসবুকের মাধ্যমে জানানো হয়।
শিক্ষার্থীরা জানান, ১৮ জুলাই মূল প্রতিরোধের দিনেই সারা দেশে ২২-২৩ জন শহীদ হন। এরপর যখন ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সারা দিনের হত্যাযজ্ঞ দেখার পর নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার গেট থেকে শুরু হয় একদফার স্লোগান, সরকার পতনের স্লোগান তখন শুরু হয়।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাকিন শাবাব নিজেও আন্দোলনে সরাসরি অংশ নিয়েছেন। আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য যোগাযোগ করেছেন বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমি ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রথমে যোগাযোগ করি। সে সময় তো আন্দোলনের নেতৃত্বে, কিংবা সমন্বয় করার মতো কেউ ছিল না। আন্দোলনের সামনের সারিতে যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে একজনকে পেলাম ইস্ট ওয়েস্টের নাঈম আবেদীন, নর্থ সাউথ থেকে পেলাম কাওসার হাবীব, আইইউবি থেকে তালহাদের পেলাম। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। সবার সঙ্গে ফোনে আলাপ হয়েছে। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম আমি, ব্র্যাকের আরেক সমন্বয়ক ফরিদ এবং নাঈম। আমরা সবাইকে বলছিলাম, যার সঙ্গেই কথা হবে তাকে যেন বলা হয়— আরও কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। এভাবে যোগাযোগ করে একটা নেটওয়ার্ক স্থাপন হলো।’’
ইন্টারনেট বন্ধ ও কারফিউর মধ্যেও থেমে থাকেনি যোগাযোগ ও সমন্বয়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, যেহেতু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ঢাকা শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। এ অবস্থান থাকার কারণে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো ব্লক করার ক্ষেত্রে সহায়ক ছিল। ১৮ জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর প্রতিরোধ গড়ে তোলার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হয়। একপর্যায়ে নাহিদ ইসলামসহ কোটা সংস্কার আন্দোলনের পাঁচ জন কেন্দ্রীয় সমন্বয়ককে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়। তারপরও আন্দোলন থেমে থাকেনি। অন্য সমন্বয়কদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করে এই আন্দোলন চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেট বন্ধের মধ্যেও যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছিলেন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা না নামলে ‘৩৬ জুলাই’ আসতো না
শিক্ষার্থীদের দাবি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যদি সেদিন শক্ত প্রতিরোধ গড়ে না তুললে ৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট ) আসতো না। এই প্রসঙ্গে সাকিন শাবাব বলেন, ‘‘এটা আমাদের ব্যক্তিগত মতামত না, এখন সবাই বলছে— প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টরা না থাকলে এটা সম্ভব হতো না। সবাই জানে, এই শিক্ষার্থীরা আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু এখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছাড়া মাদ্রাসা, আলেম সমাজও ছিল। এছাড়া একটা বড় গ্রুপ ছিল পথশিশুদের, যাদের ঘরবাড়ি পথে। এদের আসলে বাদ দেওয়া যাবে না। মূলত সবাই সবার জায়গা থেকে এগিয়ে এসেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নেমেছিল বলেই সম্ভব হয়েছে। যদিও তারা উপেক্ষিত, কিন্তু কিছু করার নেই।’’
আব্দুলাহ আল মাহফুজ জাকারিয়া বলেন, ‘৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট) আসার পেছনে ১৮ জুলাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যখন নিপীড়নের মুখে হাল ছেড়ে দিয়ে হলগুলো খালি করতে বাধ্য হলো, তখন কিন্তু সবাই মোটামুটি ধরে নিয়েছিল, আন্দোলন শেষ। ওই পর্যায়ে ১৮ জুলাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যদি মাঠে নেমে না আসতেন, তাহলে ৩৬ জুলাই আসতো না। কারণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেভাবে রাস্তায় নেমে এসেছেন, তাদের দেখাদেখি রাস্তায় সাধারণ মানুষ, মাদ্রাসার ছাত্ররা পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। ৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভাগীয় বড় শহরগুলোতে আন্দোলনের নেতৃত্ব মোটাদাগে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে ছিল। এই নেতৃত্ব যার যার জায়গা থেকে হয়েছে। কেন্দ্রীয় কোনও আদেশে হয়নি। যে যেভাবে পেরেছে তার জায়গা থেকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছে।’’
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কারীরা পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করেন— ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ৩ আগস্ট অনির্দিষ্টকালের জন্য সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়। এরপর ৪ আগস্ট ঘোষণা দেওয়া হয় ৬ আগস্ট ঢাকা অভিমুখে লং মার্চের। কিন্তু হঠাৎ লং মার্চের সিদ্ধান্ত একদিন এগিয়ে নিয়ে এসে ৫ আগস্ট করা হয়। ৫ আগস্ট দুপুরে তীব্র আন্দোলনের মুখে খবর আসে, ‘পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’।