ঢাকাTuesday , 21 July 2026
  1. অন্যান্য
  2. আবহাওয়া
  3. খেলা
  4. চাকরি
  5. জীবনযাপন
  6. তথ্যপ্রযুক্তি
  7. প্রেস রিলিজ
  8. বাণিজ্য
  9. বাংলাদেশ
  10. বিনোদন
  11. বিশ্ব
  12. ভিডিও
  13. মতামত
  14. রাজনীতি
  15. শিক্ষা
আজকের সর্বশেষ সবখবর

‘রইদ’ কী তবে তথাকথিত সভ্যতার ক্ষুরধার স্যাটায়ার?


July 21, 2026 2:40 am
Link Copied!


মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’ নিয়ে যে পরিমাণ আলোচনা হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি আলোচনার দাবি রাখে এই রূপান্তরমূলক চলচ্চিত্র। কিন্তু আমাদের সংস্কৃতিতে সিনেমা নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডা বা গল্প করার যে কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ ও কমিউনিটি গড়ে ওঠার কথা ছিল, সেই পথে অনেক বাধা।

এই বাধা আরও প্রকট হয়ে ওঠে যখন কোনো সিনেমা ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামাজিক কুসংস্কার কিংবা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও সরকারের স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে নির্মিত হয়; তখন সেই সিনেমা নিয়ে আলোচনা যেন আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে, ‘রইদ’-এর নামকরণের সার্থকতা নিয়ে কেউ কথা বলেছেন বলে আজ অবধি আমার চোখে পড়েনি, যার একটি ভালো দিক হলো এই আলোচনা এই প্রেক্ষিতে প্রভাবমুক্ত থাকবে। তবে কাকতাল ঘটবে না তার নিশ্চয়তা দিচ্ছি।

প্রথমেই বলতে হয়, ‘রইদ’ এখানে একটি মেটাফরিক বা রূপক নামকরণ। বর্তমান আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় ‘রইদ’ আমাদের তথাকথিত সভ্যতাকে নির্দেশ করে। আদিমকাল থেকে রোদ বা রইদ সবসময়ই একটি আশা এবং প্রত্যাশিত ভবিষ্যতের প্রতীক। রোদ কৃষকের মুখে হাসি ফোটায়; নবজাতকের পুষ্টির জন্য তাকে রোদে রাখা হয়; শীতকালে গ্রামীণ মানুষ শীত থেকে বাঁচতে রোদ পোহায়। রইদ ছাড়া গ্রামীণ উৎপাদনব্যবস্থা অচল।

এই বছরও আমরা দেখেছি রইদহীন ফসলের মৌসুমে ফসল তুলতে না পেরে ধান নদীতে ফেলে দিতে বাধ্য হওয়া কৃষকের কান্না। ঠিক যেমন, আমাদের দাবি অনুযায়ী, মানবসভ্যতা সমগ্র মানবজাতিকে আদিম অন্ধকার থেকে ধীরে ধীরে আধুনিক বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাপনা, শেয়ার মার্কেট এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আলোয় নিয়ে এসেছে। আধুনিকতার নামে আমরা যে অহংকার করি, সেই আধুনিকতা কিন্তু মানুষকে আবার আমাদের অজান্তেই নতুন ধারার শ্রেণিতে রূপান্তর করছে: শোষক-শোষিত, নিপীড়ক-নিপীড়িত, ইত্যাদি।

পরিচালক বোধহয় দেখিয়েছেন যে, এই তথাকথিত সভ্যতা মানুষকে একোমোডেট (স্থান দিতে) করতে পারেনি; এটি মানুষকে সমৃদ্ধি দিলেও স্বস্তি দেয়নি, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আজ তলিয়ে যাচ্ছে। আমরা যে সভ্যতা নিয়ে গর্ব করি, ‘রইদ’ নাম দিয়ে মূলত সেই সভ্যতাকেই তীব্র স্যাটায়ার (ব্যঙ্গ) করা হয়েছে।

এই সভ্যতায় যেখানে মানুষের প্রথম পরিচয় হওয়ার কথা ছিল তার নিজস্ব ‘মনুষ্যত্ব’, সেখানে চলচ্চিত্রে নায়িকার নামহীন চরিত্রটি বর্তমান পৃথিবীর এক নির্মম বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের স্ত্রীর ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে, সিনেটর হিসেবে তাঁর নিজস্ব স্বতন্ত্র যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও, শেষ পর্যন্ত সমাজ তাঁকে রাষ্ট্রপ্রধানের স্ত্রী হিসেবেই মূল্যায়ন করে এবং নিজের পরিচয়ের সমান্তরালে তাঁকে স্বামীর নাম বহন করতে হয়।

বর্তমান সভ্য যুগেও বিদ্যমান লিঙ্গবৈষম্য ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এখানে মূল পুরুষ চরিত্রের নাম ‘সাধু’ হলেও, তার স্ত্রীর কোনো নিজস্ব নাম নেই। সে কেবলই ‘সাধুর বউ’ বা ‘পাগলী’। এর মাধ্যমে পরিচালক আমাদের কথিত সভ্যতার অসারতা এবং পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের দিকে আঙুল তুলেছেন। দাম্পত্যে ‘কনসেন্ট’ বা সম্মতির গুরুত্বও উঠে এসেছে। চলচ্চিত্রে সাধু ও পাগলীর মধ্যে কোনো চিরাচরিত রোমান্টিক সম্পর্ক ছিল না এবং সাধুর প্রজনন প্রবৃত্তির খানিক প্রকাশ থাকলেও পাগলীর তা সুপ্ত ছিল।

তবে স্ত্রীর মানসিক ভারসাম্যহীনতা সত্ত্বেও পারস্পরিক সম্মতি (কনসেন্ট) ছাড়া সাধু তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেনি। পরিচালকের এই উপস্থাপনা সাধু চরিত্রটির সত্যিকার আধুনিক ও সভ্য মনস্তত্ত্বকে প্রকাশ করে।

কিন্তু বর্তমান উত্তর-আধুনিক সমাজে যখন ঘরে-বাইরে নারীর সম্মতি উপেক্ষা করে ধর্ষণ ও নিপীড়ন চালানো হচ্ছে, কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে মিথ্যা সম্পর্ককে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে; তখন দাম্পত্য জীবনেও পারস্পরিক সম্মতির অনিবার্যতা এবং সংযম প্রদর্শনের মাধ্যমে পরিচালক এক সত্যিকারের মানবিক সভ্যতার বার্তা দিয়েছেন।

পুরো সিনেমা জুড়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ‘তালের পিঠা’। আব্রাহামিক ধর্মের তত্ত্ব অনুযায়ী আমরা জানি, অ্যাডাম এবং ইভ ‘গন্ধম’ ফল খেয়ে পৃথিবীতে মানুষের বংশবিস্তার বা প্রজননপ্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। সিনেমার শুরুতে এই দুই চরিত্রের মধ্যে আন্তরিকতা বা প্রেমের কোনো বালাই ছিল না। কিন্তু তালের পিঠা খাওয়ার পর যখন সাধু বলে যে, “বাপের জন্মেও এত স্বাদের পিঠা খাই নাই”, তা সরাসরি আমাদের সেই থিওলজিক্যাল টেস্টামেন্ট বা ধর্মীয় উপাখ্যানকে ইঙ্গিত করে। ধর্মীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ইভের প্ররোচনা বা আগ্রহেই গন্ধম খাওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল।

ঠিক এখানেও পরিচালক এই সাধু ও সাধুর স্ত্রীর মধ্যে একটি চমৎকার শৈল্পিক বন্ধন তৈরি করেছেন তালের পিঠার মাধ্যমে। পিঠা খাওয়ার পর তাদের দুজনের মধ্যে অন্তত এক ধরনের খুনসুটির সম্পর্ক তৈরি হয়, যা দাম্পত্যের সবচেয়ে সুন্দর বুনন।

সিনেমায় রইদের আলো যেমন পড়েছে, তেমনি সভ্যতার সমান্তরালে সুদের ব্যবসাসহ বাণিজ্যিক শোষণের চাকাও খানিকটা দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এই শোষণের জায়গাটি আরও গভীরভাবে দেখালে নিউলিবারেল ইকোনমি (নব্য-উদারতাবাদী অর্থনীতি) বা সভ্যতার মাপকাঠিতে নিপীড়ক ও নিপীড়িতের দ্বন্দ্বটি আরও যুৎসই হতো। এখানে মানুষ যে কেবল নিজের স্বার্থের কারণে সম্পর্ক তৈরি করে, সেই প্রবৃত্তিও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

সাধুর বড় ভাই তার নিজের ব্যবসা ও কাজকর্মের সহায়তাকারী হিসেবে সাধুকে ধরে রাখতে যেনতেন প্রকারে তার বিয়ের ব্যবস্থা করে, যাতে সাধু গ্রামে স্থায়ী হয়ে তার সুবিধা নিশ্চিত করে। আবার যখন গ্রামের মানুষ পাগলীকে নিয়ে অপবাদ দেয়, তখন নিজের ভালো থাকার স্বার্থে সাধু তাকে দূরে রেখে আসে। কিন্তু তালের পিঠার মাধ্যমে দেখানো সেই ‘গন্ধমের মোহ’ তাদের আবার কাছাকাছি নিয়ে আসে।

চলচ্চিত্রে পাগলীর গর্ভধারণের বিষয়টি ধোঁয়াশাপূর্ণ রাখা হয়েছে। গবাদি পশুর অবাধ মেলামেশার মেটাফোর দিয়ে পরিচালক হয়তো বুঝিয়েছেন যে, পরিবার, বিয়ে ও সংসারের মতো ‘সোশ্যাল কনস্ট্রাক্ট’ বা সামাজিক কাঠামো তৈরি করলেও মানুষ তার ভেতরের আদিম হিংস্রতা ও পশুত্ব ত্যাগ করতে পারেনি। বরং মানুষ নিজের যৌনাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে পশুর চেয়েও অধম ও ভণ্ড হয়ে উঠছে, যেখানে পশুদের মধ্যে কোনো কৃত্রিম সভ্যতার নামে কোনো অহংকার বা ভণ্ডামি নেই। সামাজিকতার সঙ্গে প্রকৃতির দ্বন্দ্বও বেশ স্পষ্ট ছিল এক জায়গায়।

ঘরবাড়ি পুড়ে যাওয়ার পর সাধু পাগলীকে উদ্ধার করে এবং এরপরই তার গর্ভবতী হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। এর পেছনে কোনো পাশবিকতা লুকিয়ে আছে কি না, তা পরিচালক আবছা রেখেছেন। তবে সাধু যখন লোকলজ্জার ভয়ে গর্ভপাতের পরামর্শ দেয়, তখনই মূলত কৃত্রিম সামাজিক সভ্যতা ও প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনার মধ্যকার তীব্র দ্বন্দ্বটি রূপক অর্থে ফুটে ওঠে।

সিনেমার সমাপ্তি ঘটে দুটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্যে। প্রথমত, পাগলীর প্রাণপ্রিয় পোষা ছাগলটি (কুলসুম) দুইটি বাচ্চা জন্ম দিয়ে মারা যাওয়ার পর সাধু একা সেই ছাগলের রান্না করা মাংস শেষ না হওয়া পর্যন্ত খেতে থাকে। এই চিত্র মানুষের অন্তিম লোভ নাকি অপরাধবোধ থেকে প্রায়শ্চিত্ত বুঝিয়েছে, তা অস্পষ্ট রাখা ছিল পরিচালকের দুর্দান্ত একটা স্ট্রোক। দ্বিতীয়ত, ‘আকাশ’ থেকে পড়া ‘তালবৃষ্টি’ ছিল নর-নারীর আদিম আকর্ষণের প্রতীক।

শেষ দৃশ্যে এই তালের পাহাড়ে নায়ক-নায়িকার হাত কাছাকাছি আসার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ রূপান্তরের এক গভীর ভাবনার খোরাক দর্শকদের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে বলেই মনে হয়েছে।

সব মিলিয়ে ‘রইদ’ কেবল সহজভাবে দেখার মতো কোনো সাধারণ চলচ্চিত্র নয়। আমাদের প্রচলিত সামাজিক কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং সর্বোপরি ‘সভ্যতা’ নিয়ে আমাদের যে তীব্র অহংকার, তার বিপরীতে এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন ছুড়ে দেওয়াই ছিল এই সিনেমার সবচেয়ে বড় সার্থকতা ও শক্তি।

সবশেষে, স্বীকার করতেই হয় নাজিফা আনজুম তুষি ‘পাগলী’ চরিত্রে এতটাই অনবদ্য অভিনয় করেছেন যে, তা বাস্তব চরিত্রকেও হার মানিয়ে এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে।

লেখক: অধ্যাপক ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ই মেইল:[email protected]





Source link

×

FIFA World Cup Live

FIFA World Cup সরাসরি দেখতে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।

📺 লাইভ দেখুন
error: Content is protected !!
🔴 LIVE html