বিকাশ বিলম্বিত এবং প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ, দ্রুত উপযুক্ত সেবা প্রদান এবং সমাজের মূলধারায় তাদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার জন্য সারা দেশে একটি সমন্বিত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও প্রতিবন্ধিতা নিয়ে কর্মরত সংস্থাগুলো।
সংলাপে আমন্ত্রিত বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা উল্লেখ করেছেন যে, যদি বিকাশে বিলম্ব ও প্রতিবন্ধিতার লক্ষণগুলো আগে থেকেই শনাক্ত করা যায়, তাহলে প্রাথমিক পদক্ষেপগুলোও আগেই শুরু করা সম্ভব। প্রাথমিক পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদী যত্নের প্রয়োজন ও আর্থিক খরচ কমাতে পারে, যা এই শিশুদের জীবনযাত্রার মান সামগ্রিকভাবে উন্নত করতে অবদান রাখবে। তাঁরা এজন্য প্রাথমিক শনাক্তকরণ এবং প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণ ও সেবা সহায়তা কার্যক্রমকে দেশের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান।
বুধবার (২৪ জুন) প্রতিবন্ধী শিশুদের অধিকার, অন্তর্ভুক্তি ও সক্ষমতা নিয়ে কাজ করা নেদারল্যান্ডসভিত্তিক সংগঠন “লিলিয়ানা ফন্ডস”-এর সহযোগিতায় সেন্টার ফর ডিজএ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্ট (সিডিডি) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এ আহ্বান জানানো হয়।
বৈঠকে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বরগুনার পাথরঘাটা এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় পরিচালিত “স্ট্রেন্দেনিং আর্লি আইডেনটিফিকেশন অ্যান্ড আর্লি ইন্টারভেনশন ফর দ্যা চিলড্রেন উইথ ডিজএ্যাবিলিটিস (ইআইইআই)” প্রকল্পের ফলাফলের ভিত্তিতে প্রণীত একটি নীতিসংক্ষেপ উপস্থাপন করা হয়।
প্রকল্পটির সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করে সিডিডির জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী মোহাম্মদ রেজাউল আলম জানান, বরগুনার পাথরঘাটা ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় এ প্রকল্পের আওতায় বিকাশ বিলম্বিত ও প্রতিবন্ধিতা রয়েছে, এমন প্রায় ১,৫০০ শিশুকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্বাসনসেবা, সহায়ক উপকরণ, বিশেষায়িত চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একইসঙ্গে তাদের পরিচর্যাকারীদেরও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
বক্তব্যের শুরুতে সিডিডির নির্বাহী পরিচালক নাজমুল বারি প্রাথমিকভাবে এসকল শিশুদের শনাক্তকরণকে (আর্লি আইডেন্টিফিকেশন) একটি জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “সময়মতো এসব শিশুদের সহায়তা নিশ্চিত করা না হলে যে ক্ষতি হয় তার মূল্য অনেক বেশি।” একইসঙ্গে তিনি জনগণের দোরগোড়ায় এ সেবা পৌঁছে দিতে পর্যায়ক্রমে দেশের সব উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রতিবন্ধিতা-বিষয়ক পুনর্বাসনসেবা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বৈঠকে উন্নয়ন পরামর্শদাতা জনাব মো. আনিসুজ্জামান বলেন, “সামাজিক কুসংস্কারের কারণে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা প্রতিবন্ধী শিশুদের খুঁজে বের করতে সমাজভিত্তিক উদ্যোগ কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে। মাঠপর্যায়ের কর্মীরা পরিবারগুলোর আস্থা অর্জন করে প্রয়োজনীয় সেবা নিতে তাদের উৎসাহিত করেছেন।”
সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণের ফলে শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পুনর্বাসন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে প্রবেশাধিকার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিদ্যালয়গুলোও প্রতিবন্ধী শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করতে আরো আগ্রহী হয়েছে।
তবে এসব অগ্রগতি সত্ত্বেও বক্তারা উল্লেখ করেন যে, বেশ কিছু বড় বাধা এখনও বিদ্যমান আছে, বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ সেবার অপর্যাপ্ততা, দুর্বল রেফারেল ব্যবস্থা, সামাজিক কুসংস্কার, আর্থিক সংকট এবং প্রত্যন্ত উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর কাছে সেবা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে নানা জটিলতা।
এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন (জেপিইউএফ) এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. জনাব তরিকুল আলম বলেন, “একটি সমন্বিত সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারি সংস্থা, এনজিও এবং উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে আরও জোরালো সমন্বয় প্রয়োজন।” তিনি প্রতিটি উপজেলায় “প্রতিবন্ধী সেবাকেন্দ্র” স্থাপন এবং প্রত্যন্ত উপকূলীয় ও হাওর অঞ্চলে ভ্রাম্যমাণ থেরাপি সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেন।
সমাজসেবা অধিদফতরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব, সহজ বাংলায় প্রতিবন্ধিতা-বিষয়ক তথ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং পরিবারগুলোকে সময়মতো রোগ নির্ণয় ও প্রয়োজনীয় সেবা পেতে সহায়তার জন্য আরো প্রশিক্ষিত পেশাজীবী গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।
লিলিয়ানা ফন্ডস’-এর প্রোগ্রাম ম্যানেজার এ্যালোদিয়া সান্তোস বলেন, “প্রতিবন্ধী শিশুদের দ্রুত শনাক্তকরণ ও প্রাথমিক পদক্ষেপ শুধু একটি উন্নয়নমূলক কর্মসূচি নয়, এটি নৈতিক ও মানবিক দায়িত্বও।” তিনি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য এসব সেবা আরও সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং পরিবারকেন্দ্রিক করার আহ্বান জানান।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাসিন্দা ও একজন ডাউন সিনড্রোম শিশুর মা দীপ্তি চৌধুরী বলেন, “প্রাথমিকপর্যায়ে শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার ফলে তার মেয়ের জীবনে আমূল পরিবর্তন এসেছে।”
কমিউনিটি ইন্টার্ন মিতু আক্তার যিনি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী নারী, বলেন— এই প্রকল্পটি প্রতিবন্ধী শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করতে, তাদের থেরাপি প্রদানের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত করতে এবং সামাজিক কুসংস্কার দূর করতে সহায়তা করেছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা সেলের উপ-পরিচালক মো. জয়নাল আবেদীন জোর দিয়ে বলেন যে, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার জন্য দ্রুত শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ (ইন্টারভেনশন) অপরিহার্য।
নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা (এনডিডিপি) ট্রাস্ট-এর সহকারী পরিচালক মো. আবু তৈয়ব খান বলেন, দ্রুত শনাক্তকরণই হলো এক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মূল ভিত্তি। তিনি দেশব্যাপী প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবার মানোন্নয়নে পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর সম্প্রসারণ, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্থাপন, দক্ষ জনবল বৃদ্ধি এবং এনজিওগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করার সরকারি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট (ইসিডি) নেটওয়ার্ক (বেন) এর সদস্য সচিব জনাবা জান্নাতুন নাহার বলেন, “বর্তমানে বাংলাদেশে অনেক শিশুর বিলম্বিত বিকাশ সময়মতো শনাক্ত হয় না, যার প্রধান কারণ হলো কমিউনিটি পর্যায়ে কার্যকর স্ক্রিনিং টুলের সীমাবদ্ধতা এবং দুর্বল রেফারেল ব্যবস্থা।” তিনি বলেন যে, বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন একটি সহজ, কার্যকর এবং জাতীয়ভাবে মানসম্মত প্রাথমিক স্ক্রিনিং টুল, যা ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে তা নিয়ে জেপিইউএফ এর সাথে কাজ করার কথা জানান।
সাইটসেভার্স বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃতা রেজিনা রোজারিও দ্রুত শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের প্রক্রিয়া উন্নত করতে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে আরো জোরালো সমন্বয়ের আহ্বান জানান।
চাইল্ড সাইট ফাউন্ডেশনের সিনিয়র প্রজেক্ট ম্যানেজার এবং ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ এশিয়ার ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. জহুরুল ইসলাম জুয়েল বলেন, “প্রতিরোধযোগ্য প্রতিবন্ধিতা হ্রাসের ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি স্ক্রিনিং বা বাছাই প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল প্রযুক্তির সংযোজন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে “প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক কর্নার” সম্প্রসারণ এবং পুনর্বাসন, রেফারেল ও সেবাপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়াতে সরকার ও এনজিওগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সিডিডি’র নির্বাহী উপদেষ্টা জনাব এ.এইচ.এম নোমান খান, দেশব্যাপী দ্রুত প্রতিবন্ধী শিশুদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা ও এনজিওগুলোকে আরো জোরালো ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
বৈঠকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় প্রতিবন্ধী শিশুদের দ্রত শনাক্তকরণ প্রক্রিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করা, রেফারেল ও ফলো-আপ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা, সমাজভিত্তিক পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্প্রসারণ, সেবা প্রদানকারীদের সহায়তা প্রদান, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার প্রসার এবং এ বিষয়ক সেবার জন্য টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়।