ঢাকাTuesday , 28 July 2026
  1. অন্যান্য
  2. আবহাওয়া
  3. খেলা
  4. চাকরি
  5. জীবনযাপন
  6. তথ্যপ্রযুক্তি
  7. প্রেস রিলিজ
  8. বাণিজ্য
  9. বাংলাদেশ
  10. বিনোদন
  11. বিশ্ব
  12. ভিডিও
  13. মতামত
  14. রাজনীতি
  15. শিক্ষা
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ইজারা, ড্রেজার ও ক্রনি ক্যাপিটালিজম গিলে খাচ্ছে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নদ-নদী

UttorbongoBD
July 28, 2026 6:25 pm
Link Copied!


দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নদ-নদীগুলোর বর্তমান সংকট কেবল পরিবেশগত নয়; এটি একই সঙ্গে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংকট। নদীকে কেন্দ্র করে যে অর্থনীতি একসময় শ্রমনির্ভর ছিল, তা ধীরে ধীরে ইজারা, মধ্যস্বত্বভোগী ও যন্ত্রনির্ভর পুঁজির নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এক সময়ের শ্রম ও সম্পদের নদী খ্যাত স্বচ্ছ জলপ্রবাহগুলো এখন লুঠেরাপুঁজির নিয়ন্ত্রিত অন্য য্য শ্রমবাজারে পরিণত হয়েছে।

ধোপাজান, যাদুকাটা, রক্তি, পাটলাই  কিংবা চলতি নদী একসময় ছিল সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসব নদী শুধু বালু-পাথরের উৎস ছিল না; এগুলো ছিল শ্রম, সংস্কৃতি, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং স্থানীয় অর্থনীতির ভিত্তি। আর সেই নদীকেন্দ্রিক জীবনব্যবস্থার অন্যতম প্রতীক ছিল “বারকি”- লম্বা, সরু কাঠের নৌকা, যার ওপর ভর করেই হাজারো শ্রমজীবী মানুষ জীবিকা নির্বাহ করতেন। আজ সেই বারকি ক্রমেই ইতিহাসে পরিণত হচ্ছে। কারণ নদীর মালিকানা বদলায়নি, কিন্তু নদীর ওপর মানুষের অধিকার বদলে গেছে।

ফলে সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন সেই শ্রমিকরাই, যাদের শ্রমে-ঘামে এই নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল।

যাদুকাটা নদীর প্রবীণ বারকি শ্রমিক, তাহিরপুর উপজেলার সূর্যেরগাঁও গ্রামের আব্দুর রশিদ এখন আর নদীতে যান না। সম্প্রতি তার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল যাদুকাটার অতীত ও বর্তমান নিয়ে। কথার ফাঁকে উঠে আসে এক নদীর বদলে যাওয়ার ইতিহাস, যেখানে স্মৃতির সঙ্গে মিশে ছিল দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা ও গভীর বেদনা। তার ভাষায়, “আমরা নদী থেকে জীবিকা তুলতাম, নদীকে কষ্ট দিতাম না। এখন নদীকে মেরে ফেলা হয়।” এই একটি বাক্যের মধ্যেই ধরা পড়ে কয়েক দশকের পরিবর্তনের নির্মম ইতিহাস। একসময় যাদুকাটা ছিল মানুষের জীবন-জীবিকার অবলম্বন; আজ তা দ্রুত মুনাফার উৎসে পরিণত হয়েছে। শ্রমনির্ভর নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির জায়গা দখল করেছে লুণ্ঠননির্ভর এক শোষণমূলক অর্থনীতি, আর সেখানেই যাদুকাটার সংকটের প্রকৃত সূত্রপাত।

আশির দশকে বালুমহাল ও পাথরমহাল ইজারা ব্যবস্থার বিস্তারের মাধ্যমে নদী ব্যবস্থাপনায় একটি মৌলিক পরিবর্তন আসে। সরকারের উদ্দেশ্য ছিল রাজস্ব বৃদ্ধি। কিন্তু বাস্তবে নদীর ওপর স্থানীয় মানুষের প্রথাগত অধিকার ক্রমে সংকুচিত হতে থাকে। ইজারার মাধ্যমে নদী ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় একটি পুঁজিপতি গোষ্ঠীর হাতে, আর স্থানীয় শ্রমিকরা হয়ে পড়েন এক অনায্য শ্রমবাজারের পণ্য। নদী থেকে আহরিত সম্পদের সবচেয়ে বড় অংশ আর শ্রমিকের হাতে থাকে না; তা কেন্দ্রীভূত হয় ইজারাদার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে।পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে নব্বইয়ের দশকে, যখন নদী ইজারা অর্থনৈতিক সম্পদের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাবেরও উৎসে পরিণত হয়। স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা বলছে, ইজারা পাওয়ার ক্ষেত্রে দক্ষতা বা স্থানীয় নির্ভরতার চেয়ে রাজনৈতিক যোগাযোগ অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর ফলে নদী ব্যবস্থাপনায় প্রতিযোগিতার পরিবর্তে গড়ে ওঠে প্রভাবনির্ভর একটি কাঠামো, যেখানে প্রকৃত শ্রমিক ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়েন।

দুই হাজার সালের পর ড্রেজারের ব্যাপক ব্যবহার এই সংকটকে নতুন মাত্রা দেয়। প্রযুক্তি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন প্রযুক্তি প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। ড্রেজারের মাধ্যমে অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন সম্ভব হলেও এর মূল্য দিতে হচ্ছে নদীকে। এতে নদীর তলদেশের স্বাভাবিক গঠন বদলে যাচ্ছে, তীরে ভাঙন বাড়ছে, স্বাভাবিক জলপ্রবাহের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং নদীর জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, যে কাজ একসময় শত শত শ্রমিক করতেন, সেখানে এখন কয়েকটি যন্ত্রই যথেষ্ট। ফলে কর্মসংস্থানও দ্রুত সংকুচিত হয়েছে।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো- বারকির মানুষ শুধু পেশা হারাননি, হারিয়েছেন তাদের সামাজিক পরিচয়ও। অনেকে কৃষিশ্রমিক, রিকশাচালক কিংবা দিনমজুর হয়েছেন। কিন্তু পেশা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেছে নদীকেন্দ্রিক একটি সংস্কৃতি। নদীর গান, নৌকা বাইচের প্রতিযোগিতা, যৌথ শ্রমের ঐতিহ্য- এসবই এখন হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির অংশ।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নদীকেন্দ্রিক এই অর্থনীতিতে প্রকৃত উৎপাদক ও প্রকৃত লাভভোগীর মধ্যে ব্যবধান ক্রমাগত বেড়েছে। স্থানীয় শ্রমিকদের অভিযোগ, শ্রমিকদের দোহাই দিয়ে ইজারা নেওয়া হলেও বাস্তবে সিদ্ধান্ত ও মুনাফার নিয়ন্ত্রণ থাকে ইজারাদার ও তাদের নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেটের হাতে। এই ব্যবস্থায় শ্রমিক শুধু শ্রম দেন, কিন্তু সম্পদের ওপর তার কোনো কার্যকর অধিকার থাকে না।

এ বাস্তবতায় প্রশাসনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখে। পরিবেশ সুরক্ষা, আইন প্রয়োগ এবং অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের ঘোষণা প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু মাঠপর্যায়ে অবৈধ ড্রেজার, অতিরিক্ত বালু উত্তোলন এবং নদী দখলের অভিযোগ বছরের পর বছর অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর কারণে আইনের প্রয়োগ প্রায়ই দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে আইন কাগজে থাকলেও নদীর বাস্তবতা ভিন্ন গল্প বলে।

অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকেও এই মডেল দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। রাষ্ট্র কিছু রাজস্ব পেলেও নদীর ক্ষয়, কৃষিজমির ক্ষতি, তীরভাঙন, জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকা হারানোর যে সামাজিক ও পরিবেশগত ব্যয় সৃষ্টি হচ্ছে, তার হিসাব সাধারণত রাজস্বের খাতায় ধরা পড়ে না। ফলে তাৎক্ষণিক আর্থিক লাভের বিনিময়ে ভবিষ্যতের প্রাকৃতিক সম্পদ ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এসব সমস্যার সমাধানের পথও রয়েছে। নদী ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও শ্রমিকদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বালু উত্তোলনে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, কঠোর পরিবেশগত তদারকি এবং অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ অভিযান পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে ইজারা ব্যবস্থাকে এমনভাবে সংস্কার করতে হবে, যাতে স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অংশগ্রহণ ও স্বার্থ সংরক্ষিত হয়। নদীকে কেবল রাজস্ব আহরণের উৎস হিসেবে দেখার পরিবর্তে একটি জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করাই হবে দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বারকি কেবল একটি নৌকা নয়; এটি হাওরাঞ্চলের শ্রম-ইতিহাস, আত্মপরিচয় এবং নদীকেন্দ্রিক সভ্যতার প্রতীক। সেই প্রতীক আজ বিলুপ্তির মুখে। যদি বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে হারিয়ে যাবে শুধু একটি পেশা নয়; হারিয়ে যাবে কয়েক প্রজন্মের জীবনসংগ্রাম, সংস্কৃতি এবং নদীর সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানের একটি মূল্যবান ঐতিহ্য।

হাওরাঞ্চলের এসব নদীকে বাঁচানো মানে শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়; এটি ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি, শ্রমের মর্যাদা এবং স্থানীয় মানুষের অধিকার পুনর্প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন নদী থেকে আহরিত সম্পদের সুফল নদীর তীরের মানুষও ন্যায্যভাবে ভোগ করতে পারবেন। অন্যথায় বারকির মানুষের দীর্ঘশ্বাস কেবল ধোপাজান বা যাদুকাটার পাড়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা আমাদের উন্নয়ন-দর্শনে গভীর অসাম্যের স্বাক্ষী হিসেবে থেকে যাবে।

 

 রাসেল আহমদ, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও জনপ্রতিনিধি

প্রকাশিত লেখাটি লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।

 





Source link

×

FIFA World Cup Live

FIFA World Cup সরাসরি দেখতে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।

📺 লাইভ দেখুন
error: Content is protected !!
🔴 LIVE html