বাংলাদেশে নারীদের শিক্ষার প্রসার ঘটেছে, কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বেড়েছে, এমনকি বিভিন্ন খাতে নারী-নেতৃত্বের উত্থানও দেখা যাচ্ছে। তবে নেতৃত্বের পদগুলোতে নারীদের উপস্থিতি এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে কম। মেধা বা সক্ষমতার অভাবে নয়, বরং কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা এখনও তাঁদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা, ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এই মন্তব্য করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) অনুষ্ঠিত ‘রাইজ অ্যান্ড লিড: বাধা ভেঙে ফেলা, ক্ষমতার বণ্টন ও বাংলাদেশে নারী নেতৃত্বের অগ্রগতি’ শীর্ষক এই আলোচনায় নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী নেতা এবং উন্নয়নকর্মীরা অংশ নেন। তারা কয়েক দশকের অগ্রগতি সত্ত্বেও কেন নারীরা এখনও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ের নেতৃত্বে পৌঁছাতে সংগ্রাম করছেন, তা নিয়ে আলোচনা করেন।
অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশ এবং ঢাকা ট্রিবিউনের যৌথ উদ্যোগে ‘অনির্বাণ–রাইজ অ্যান্ড লিড’ কর্মসূচির আওতায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বলা হয়, অসম সুযোগ, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক সংস্কৃতি, অনমনীয় কর্মব্যবস্থা এবং অবৈতনিক পরিচর্যা ও গৃহস্থালি কাজের অসম বোঝা— এখনও নারীদের নেতৃত্বের পর্যায়ে এগিয়ে যেতে বাধাগ্রস্ত করছে।
প্রধান অতিথি নারী ও শিশু-বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল বলেন, ‘‘শুধু আইন পরিবর্তন করলেই যথেষ্ট হবে না।’’
তিনি আরও বলেন “নেতৃত্ব কোনও পদ বা উপাধি নয়; এটি একটি মানসিকতা। নেতৃত্ব ও সমতা সম্পর্কে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হলে শুধু আইন ও প্রতিষ্ঠান দিয়ে টেকসই উন্নয়ন অর্জন করা সম্ভব নয়।”
তিনি স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ছোটবেলা থেকেই নেতৃত্বের গুণাবলি, আত্মসচেতনতা এবং মানসিক সুস্থতা বিকাশে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। একইসঙ্গে নারীর নেতৃত্ব বিকাশে কাজ করা সংগঠনগুলোর সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
‘নারীরা নেতৃত্বে আসার জন্য প্রস্তুত: আমাদের কর্মক্ষেত্র কি ক্ষমতা ভাগ করে নিতে প্রস্তুত?’ শীর্ষক প্রতিপাদ্যে রাইজ অ্যান্ড লিড কর্মসূচির ফলাফল উপস্থাপন করেন অক্সফাম ইন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম পরিচালক মাহমুদা সুলতানা।
তিনি বলেন, ‘‘অনেক নারী নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেন না তাদের যোগ্যতার অভাবে নয়, বরং বিদ্যমান ব্যবস্থা তাদের প্রতিকূল অবস্থায় ফেলে রাখে।’’
লিডারশিপ ল্যাব, চেঞ্জমন্ত্রের ফ্যাসিলিটেটর উমা চ্যাটার্জির সঙ্গে কর্মসূচির ফলাফল উপস্থাপন করে তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নারীদের জন্য সমান নেতৃত্বের সুযোগে রূপান্তরিত হয়নি।’’
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের আইএলও-মডেল হিসাব অনুযায়ী, শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণের হার ৩৮.৬ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ৮০.৪ শতাংশ।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২-এ নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৪২.৮ শতাংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণার ফলাফলে আরও দেখা যায়, কর্মরত নারীদের ৯৬.৬ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। যেখানে চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ এখনও সীমিত। এ ছাড়া নারীরা পুরুষদের তুলনায় সাত গুণেরও বেশি অবৈতনিক পরিচর্যা ও গৃহস্থালি কাজ করেন। ফলে নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছানোর মতো ক্যারিয়ার গড়ে তোলার জন্য তাদের হাতে কম সময় এবং কম সুযোগ থাকে।
কর্মসূচিতে নারীদের উচ্চপদে পৌঁছানোর পথে একাধিক বাধা চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক চর্চা, অনমনীয় কর্মব্যবস্থা, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, মেন্টর ও পেশাগত নেটওয়ার্কে সীমিত প্রবেশাধিকার, কর্মজীবনে বিরতি নেওয়াকে ঘিরে সামাজিক নেতিবাচক ধারণা, ক্ষমতার অসম বণ্টন এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চনা থেকে তৈরি স্থায়ী আত্মসন্দেহ।
আলোচনার সূচনা করে ঢাকা ট্রিবিউনের নিউজ এডিটর আনন্দ মোস্তফা বলেন, ‘‘নারীরা প্রতিটি খাতেই বারবার নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন। তবুও যোগ্যতার অভাবে নয়, বরং কাঠামোগত ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে নেতৃত্বের পর্যায়ে তাদের প্রতিনিধিত্ব এখনো কম।’’
তিনি আরও জানান, নারীর নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক করার সময় শেষ হয়েছে। এখন আমাদের এমন একটি কর্মক্ষেত্র প্রয়োজন, যেখানে সুযোগ নির্ধারিত হবে যোগ্যতা ও সক্ষমতার ভিত্তিতে, লিঙ্গের ভিত্তিতে নয়।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশের হেড অব ইনফ্লুয়েন্সিং, কমিউনিকেশনস, অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড মিডিয়া মো. শরিফুল ইসলাম। চেঞ্জমন্ত্রের ফ্যাসিলিটেটর রূপ সেনও এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
রাইজ অ্যান্ড লিড উদ্যোগের লক্ষ্য হলো— নারীর নেতৃত্ব, কর্মজীবনে পুনঃঅংশগ্রহণ এবং কর্মক্ষেত্রে অগ্রগতিকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। একইসঙ্গে নিয়োগকর্তা, নীতিনির্ধারক এবং উন্নয়ন অংশীদারদের আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে উৎসাহিত করা।