ঢাকাSaturday , 12 September 2026
  1. অন্যান্য
  2. আবহাওয়া
  3. খেলা
  4. চাকরি
  5. জীবনযাপন
  6. তথ্যপ্রযুক্তি
  7. প্রেস রিলিজ
  8. বাণিজ্য
  9. বাংলাদেশ
  10. বিনোদন
  11. বিশ্ব
  12. ভিডিও
  13. মতামত
  14. রাজনীতি
  15. শিক্ষা
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সেলিম আল দীন, বিদ্যায়তনিক মধ্যবিত্ত ও নাটকের রাজনৈতিক অবয়ব : একটি পুনর্বিচার

UttorbongoBD
August 18, 2026 3:35 pm
Link Copied!


নাটক, কিংবা যাকে আমরা প্রাতিষ্ঠানিক অর্থে ‘ড্রামা’ বা ‘থিয়েটার’ বলে দাগিয়ে দিই, তার পেছনে একটা আস্ত রাষ্ট্রীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইকোনমি কাজ করে। সেলিম আল দীন—যাকে আমরা একাত্তর-উত্তর বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে মুখস্থ করে রেখেছি—তার কাজগুলোকে কেবল কিছু সুন্দর দৃশ্যপট, কাব্যিক সংলাপ কিংবা গ্রামবাংলার লোকায়ত উপাদানের সরল জোগান হিসেবে দেখলে বড়ো ধরনের ভুল করা হবে। ভুলটা হলো বিদ্যায়তনিক অলসতা। সেলিম আল দীন শুধু নাট্যকার নন; তিনি এমন এক তাত্ত্বিক পরিসর তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যা আমাদের চেনা শহরের মধ্যবিত্তের মননকাঠামোকে এবং তাদের ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বকে একাধারে চ্যালেঞ্জ করে।

প্রশ্ন হলো, সেলিম আল দীন আমাদের এই সমাজ-রাজনীতি-সংস্কৃতির বাজারে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, তিনি কেবল প্রথাগত নাট্যমঞ্চের জন্য টেক্সট বানাননি, তিনি একটা ডিসকোর্স বা বয়ান দাঁড় করিয়েছিলেন। যে বয়ানের ভেতর দিয়ে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর, তাদের মৌখিক ঐতিহ্য এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের বাইরে থাকা শরীরগুলো নাটকের পাটাতনে এসে হাজির হয়। অথচ, আমাদের মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী সমাজ এই উপস্থিতিটাকে বারবার ‘লোকজ রোমান্টিকতা’ বা ‘শোকগাথা’র মোড়কে মুড়ে একধরনের সেফ জোনে ফেলে রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

আমরা যখন থিয়েটার বলতে বুঝি, তখন অবচেতনভাবেই মাথায় এসে ভর করে ইউরোপীয় প্রসেনিয়াম থিয়েটারের ফ্রেম—সামনে দর্শক, মাঝখানে বাক্সবন্দি মঞ্চ, আলোর কারসাজি এবং অভিজাত বিনোদনের একটা পূর্বনির্ধারিত কাঠামো। সেলিম আল দীন তার দীর্ঘ নাট্যযাত্রায় এই ইউরোপীয় প্রসেনিয়ামের আধিপত্যকে সরাসরি অস্বীকার না করলেও, এর একচ্ছত্র বা একক সত্যতার জায়গাটিতে বড়ো ধরনের ধাক্কা দিয়েছিলেন।

গ্রাম থিয়েটারের ধারণাটা কেবল এই নয় যে, ঢাকা শহরের বাইরে কিছু মানুষ গিয়ে মঞ্চ বানাল কিংবা গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষকে নাটকে অভিনয় করাল। এর রাজনৈতিক অর্থনীতি অন্য জায়গায়। ঢাকা কেন্দ্রিক যে বুদ্ধিজীবী, যারা নিজেদের আধুনিকতার একমাত্র ঠিকাদার ভাবে, তারা নাটককে নির্দিষ্ট কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক এক্সারসাইজের জায়গায় নামিয়ে এনেছিল। সেলিম আল দীন সেই জায়গাটায় গোড়াতেই গলদ ধরেছিলেন। তিনি দেখালেন যে, বাংলার জনমানুষের হাজার বছরের পারফরম্যান্স ট্র্যাডিশন—তা সে গাজীর গান হোক, আলকাপ হোক, কিংবা যাত্রাপালা হোক—সেগুলোর নিজস্ব ব্যাকরণ আছে। সেই ব্যাকরণকে ভাঙচুর না করে, তার ভেতরকার অভ্যন্তরীণ গতিবিদ্যাকে বুঝতে না পারলে আপনি কখনোই এমন কোনো নাটক তৈরি করতে পারবেন না যা এই অঞ্চলের মাটির সঙ্গে ডায়ালগ তৈরি করতে পারে।

এখানেই আসে ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব’-এর প্রশ্ন। এটিকে অনেকে নিছক আধ্যাত্মিক বা তাত্ত্বিক জাবরকাটা বলে উড়িয়ে দিতে পারেন। কিন্তু আপনি যদি একে নৃতাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিতে দেখেন, তবে বুঝবেন—এই তত্ত্বের মূল কথা হলো প্রথাগত বাইনারি বা দ্বৈততাকে ভেঙে ফেলা। দৃশ্যমান এবং অদৃশ্যমান, শহর এবং গ্রাম, উচ্চবিত্তের শিল্প এবং প্রান্তিকের লোকসংস্কৃতি—এই ভেদরেখাগুলোকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সেলিম আল দীন এমন এক স্পেস বা জায়গার সন্ধান করছিলেন, যা বহুত্ববাদী। কিন্তু মুশকিল হলো, আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজ এই তত্ত্বের তাত্ত্বিক গভীরতা বা পলিটিক্সকে হজম না করে একে একটা ‘আধ্যাত্মিক লেভেল’ পরিয়ে নিজেদের ড্রয়িংরুমের টেবিলে সাজিয়ে রাখল।

সেলিম আল দীনের প্রাতিষ্ঠানিক অবদানের কথা বলতে গেলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসকে কেবল একটা ‘ভালো উদ্যোগ’ বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয় নামক রাষ্ট্রীয় ও জ্ঞানউৎপাদী মেশিনারি কীভাবে কাজ করে, তা আমরা কমবেশি সবাই জানি। একটি ঔপনিবেশিক শিক্ষা কাঠামোর ভেতর নিজস্ব ডিসিপ্লিন দাঁড় করানো চাট্টিখানি কথা নয়। সেলিম আল দীন সেটি পেরেছিলেন। কিন্তু কেন পেরেছিলেন?

ইংরেজি সাহিত্যের অনুকরণে বাংলা নাটক পড়ানোর যে ধারা চলছিল, তিনি তার বিরুদ্ধে গিয়ে নিজস্ব ডিসিপ্লিন বা বিদ্যাশাখা গড়ে তোলার জেদ ধরেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, যতক্ষণ না আপনি আপনার নিজস্ব মিথ, আপনার নিজস্ব ভাষা এবং আপনার নিজস্ব ভাষ্যকে প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যবইয়ের ভেতর ঢোকাতে পারছেন, ততক্ষণ আপনার শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত আরেকটা পরমুখাপেক্ষী উৎপাদন কেন্দ্র হয়েই থাকবে।

কিন্তু এখানেই একটা প্যারাডক্স বা স্ববিরোধিতা আছে। যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতর দাঁড়িয়ে তিনি এই বিভাগটি দাঁড় করালেন, সেই কাঠামোটাই আবার কালক্রমে একধরনের আমলাতান্ত্রিক এবং মধ্যবিত্ত সুলভ সুবিধাবাদী বলয়ে বন্দি হয়ে পড়ল। নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে যে ধরনের গ্র্যাজুয়েট বের হওয়া শুরু হলো, তাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত সেই প্রসেনিয়াম নির্ভর বা টিভি নাটকের চেনা ছকেই নিজেদের আটকে ফেলল। সেলিম আল দীনের তাত্ত্বিক আঘাত বা ভাঙচুরের জেদটা প্রাতিষ্ঠানিক সিলেবাসের গ্যাঁড়াকলে পড়ে অনেক সময় নিছক ‘একাডেমিক রুটিন’ হয়ে গেল। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমাদের মূল্যায়নটা হওয়া দরকার নির্মোহ। সেলিম আল দীন একা একটা বিভাগ বা একটা প্রবণতা তৈরি করতে পেরেছিলেন ঠিকই, কিন্তু আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার যে মধ্যবিত্তিক ও ঔপনিবেশিক কাঠামো, তা শেষ পর্যন্ত তার চিন্তার বিপ্লবী তেজকে অনেকাংশেই লঘু বা ডাইলুটেড করে দিয়েছে।

সেলিম আল দীনের নাটকগুলোর ভাষা নিয়ে কথা বলতে গেলে আমাদের শুধু ‘কাব্যিক’ বা ‘লোকায়ত’ এই চিরাচরিত ফ্রেমে আটকে থাকলে চলবে না। তার নাটকের ভাষা একটা রাজনৈতিক অবস্থান। বাংলা গদ্য বা নাট্যভাষার ক্ষেত্রে ভদ্রবেশী মধ্যবিত্তের যে শহুরে ও পরিশীলিত ভাষা, সেলিম আল দীন তার ভেতরে সচেতনভাবে এমন সব শব্দ, আঞ্চলিক টান এবং বহুতল অর্থবহ বাক্যবিন্যাস নিয়ে এলেন, যা শহুরে ভদ্রসমাজকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। 

যেমন ধরুন ‘কিত্তনখোলা’ বা ‘চাকা’-এর কথা। ‘চাকা’ নাটকের সেই লাশ পরিবহনের গল্পটি কেবল একটি মর্মান্তিক বা রূপক ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্র এবং প্রান্তিক মানুষের মরদেহের সঙ্গে ক্ষমতার কী ধরনের বোঝাপড়া, তার একটা নিদারুণ ব্যবচ্ছেদ। সমাজ যখন কোনো মৃতদেহকে বা কোনো প্রান্তিক ঘটনাকে আড়াল করতে চায়, তখন নাটকের চাকা কীভাবে ঘুরে চলে—সেটাই সেলিম আল দীন ধরেছেন। এখানে ভাষার যে বুনন, তা কোনো শহুরে মার্জিত কথোপকথন নয়; এটি মেহনতি মানুষের জীবনের রুক্ষ বাস্তবতার সঙ্গে মিশে থাকা ভাষা।

আবার যখন আমরা ‘নিমজ্জন’-এর মতো সুবিশাল ক্যানভাসে যাই, তখন দেখি তিনি ইতিহাসের গভীরে ঢুকে ক্ষমতার কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করছেন। কিন্তু মুশকিল হলো, সেলিম আল দীনের এই জটিল ও বহুস্তরীয় টেক্সটগুলোকে আমাদের নাট্যনির্দেশক ও অভিনেতারা বারবার একধরনের গতানুগতিক লোকজ স্টাইলাইজেশনের মধ্যে নামিয়ে এনেছেন। মঞ্চে পাটের বস্তা ঝুলিয়ে দেওয়া, কিংবা প্রাকৃতিকভাবে গান গাওয়ার একটা ভান ধরা—এগুলো দিয়ে সেলিম আল দীনের প্রকৃত পলিটিক্সকে ঢাকা পড়ে গেছে। সেলিম আল দীন যে ইতিহাসের গভীরে গিয়ে মানুষের অস্তিত্বের সংকটকে ধরতে চেয়েছিলেন, আমাদের নাট্যবাজার তাকে সস্তা লোকরঞ্জনবাদে রূপান্তরিত করেছে। এই রূপান্তরটা একটা সাংস্কৃতিক ট্র্যাজেডি।

আমাদের সাংস্কৃতিক বাজারে একটা অদ্ভুত ট্রেন্ড আছে—যারা মারা যান কিংবা যাদের আমরা ‘আইকন’ বানিয়ে ফেলি, তাদের নিয়ে একধরনের ভক্তিয়ালী বা সেন্টিমেন্টাল প্রোপাগান্ডা চালানো হয়। সেলিম আল দীনও এই মধ্যবিত্তের ‘আইকন প্রডাকশন’ বা প্রতিমা তৈরির রাজনীতির শিকার। প্রতি বছর তার জন্ম বা মৃত্যুবার্ষিকীতে কিছু সেমিনার হয়, কিছু কথামালা ঝরে, তার নামে বড়ো বড়ো ব্যানার টানানো হয়। কিন্তু তার যে মৌলিক জিজ্ঞাসা—আমাদের নাট্যচর্চা কেন স্বাধীন হতে পারছে না, কেন আমাদের থিয়েটার আজও কর্পোরেট বা রাজধানীর অনুগত বিনোদন হয়ে বেঁচে আছে—সেই প্রশ্নগুলো সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়।

আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ নিজের আরামদায়ক পজিশন ছেড়ে কখনো সত্যিকার ডিসকমফোর্টে যেতে চায় না। সেলিম আল দীন তার জীবদ্দশায় বারবার সেই ডিসকমফোর্ট বা অস্বস্তির জায়গাগুলোতে হাত দিয়েছিলেন। তিনি যখন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণকেন্দ্রিক ‘নিও এথনিক থিয়েটার’ বা এই জাতীয় নিরীক্ষার কথা বলছিলেন, তখন তিনি আসলে আমাদের তথাকথিত ‘বাঙালি মুসলমান’ বা ‘বাঙালি হিন্দু’—এই দুই প্রধান জোচ্চোর জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের বাইরে গিয়ে এক ব্রড কালচারাল স্পেসের কথা বলছিলেন। কিন্তু আমাদের মধ্যবিত্ত এই বৈচিত্র্য বা বহুমুখিতাকে হজম করতে পারেনি। তারা সেলিম আল দীনকে একটা ‘নিরাপদ লোকনাট্যকার’ হিসেবে ক্যাটাগরাইজ করে খালাস পেতে চেয়েছে।

তাহলে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছি? সেলিম আল দীন কি তবে আমাদের সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদের শিকার হয়ে একধরনের জাদুবাস্তবতার মোড়কে বন্দি হয়ে থাকবেন? নাকি তাকে পাঠ করার জন্য আমাদের নতুন কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার বা ক্যাটাগরি তৈরি করতে হবে?

সেলিম আল দীনের কাজের ভেতর যে খটকা বা অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট সুর ছিল, তাকে টিকিয়ে রাখতে হলে তার স্তবগান গাওয়ার চেয়ে তার কাজের সমালোচনামূলক ব্যবচ্ছেদ বেশি জরুরি। রাষ্ট্র বা ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাঠামো আমাদের যে ইতিহাস শেখায়, তার বাইরে গিয়ে মানুষ কীভাবে নিজেদের মতো করে পারফর্ম করে, বেঁচে থাকে, আনন্দ করে এবং দ্রোহ করে—তার একটা প্রামাণ্য দলিল।

আজকের এই কর্পোরেট সংস্কৃতির যুগে, যেখানে সোশ্যাল মিডিয়ার রিলস আর ওটিটি প্ল্যাটফর্মের চটজলদি বিনোদন আমাদের মননশীলতাকে গ্রাস করে নিচ্ছে, সেখানে সেলিম আল দীনের নাটক বা তার তত্ত্বের দিকে ফিরে তাকানো মানে কেবল নস্টালজিয়ায় ভোগা নয়। সেটি হলো এক ধরনের রাজনৈতিক প্রতিরোধ। সেই প্রতিরোধ তখনই সম্ভব, যখন আমরা সেলিম আল দীনকে কেবল পাঠ্যবইয়ের বন্দি কোনো ক্লাসিক বা মধ্যবিত্তের রবিবারের সাংস্কৃতিক খোরাক হিসেবে না দেখে, আমাদের উপনিবেশ-উত্তর সমাজের এক নির্মম ও তীক্ষ্ণ তাত্ত্বিক আয়না হিসেবে পাঠ করতে পারব। সেই পাঠের সাহসটুকু অর্জন করাই হবে সেলিম আল দীনের প্রতি প্রকৃত বুদ্ধিবৃত্তিক সম্মান প্রদর্শন।





Source link

×
📺

LIVE TV

Live Tv দেখতে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।

📺 লাইভ দেখুন
error: Content is protected !!
🔴 LIVE html