ঢাকাTuesday , 15 September 2026
  1. অন্যান্য
  2. আবহাওয়া
  3. খেলা
  4. চাকরি
  5. জীবনযাপন
  6. তথ্যপ্রযুক্তি
  7. প্রেস রিলিজ
  8. বাণিজ্য
  9. বাংলাদেশ
  10. বিনোদন
  11. বিশ্ব
  12. ভিডিও
  13. মতামত
  14. রাজনীতি
  15. শিক্ষা
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বন্ধ হলো কত কারখানা, চাকরি গেল কতজনের? 


August 21, 2026 11:15 pm
Link Copied!


বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে কারখানার ফটকে এখন দুই ধরনের নোটিশ দেখা যাচ্ছে। একটিতে লেখা— স্থায়ীভাবে বন্ধ। অন্যটিতে—পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ছুটি। বাইরে থেকে দুটি সিদ্ধান্তকে একই রকম মনে হলেও এর অর্থ এক নয়। প্রথমটির অর্থ চাকরি হারানো; দ্বিতীয়টির অর্থ অনিশ্চয়তার মধ্যে চাকরি টিকে থাকা। কিন্তু গ্যাস ও বিদ্যুতের দীর্ঘ সংকট, কমে যাওয়া ক্রয়াদেশ, আর্থিক দুরবস্থা, শ্রম অসন্তোষ এবং বকেয়া ঋণের চাপে শিল্প খাতে এখন এই দুই বাস্তবতাই পাশাপাশি চলছে।

শুক্রবার (২১ আগস্ট) পর্যন্ত শিল্প পুলিশ, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও গণমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গত কয়েক মাসে একদিকে কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে, অন্যদিকে শত শত কারখানা উৎপাদন কমিয়েছে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। এর সঙ্গে চলছে শ্রমিক ছাঁটাই ও কর্মসংস্থান সংকোচন। ফলে প্রশ্ন উঠছে— এ পর্যন্ত আসলে কতগুলো কারখানা বন্ধ হয়েছে?

এর একক কোনও উত্তর নেই। কারণ সরকারি ও শিল্পসংগঠনের তথ্যভাণ্ডারে স্থায়ী বন্ধ, অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ, শ্রম আইনের বিশেষ ধারায় বন্ধ, সাময়িক উৎপাদন স্থগিত এবং শ্রমিক ছাঁটাই—এসব তথ্য সব সময় একই তালিকায় রাখা হয় না। ফলে প্রকৃত চিত্র বুঝতে হলে অন্তত চারটি আলাদা হিসাব দেখতে হয়।

ছয় মাসে ২৭ কারখানা বন্ধ, চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক

২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিজিএমইএ’র সদস্য অন্তত ৮০টি কারখানায় প্রায় ১৯ হাজার ১৮৮ শ্রমিক চাকরিচ্যুত বা ছাঁটাই হয়েছেন। এর মধ্যে ২৭টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে শিল্প পুলিশ, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

এটি পোশাক খাতের জন্য উদ্বেগজনক একটি সংখ্যা। কারণ একই সময়ে রফতানি খাতের বড় কারখানাগুলোর পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি কারখানাও টিকে থাকার লড়াইয়ে পড়েছে। কোথাও ক্রয়াদেশ নেই, কোথাও ব্যাংকঋণ ও নগদ অর্থের সংকট, কোথাও শ্রমিকের বকেয়া মজুরি নিয়ে বিরোধ, আবার কোথাও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতিতে।

তবে ২৭টি কারখানা বন্ধের তথ্য পাওয়া গেলেও এই ২৭টির পূর্ণ নামভিত্তিক তালিকা প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

শুধু সাত মাসেই তিন শিল্পাঞ্চলে বন্ধ ৯৫ কারখানা

এর চেয়েও বড় চিত্র উঠে এসেছে শিল্পাঞ্চলভিত্তিক তথ্যে। গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী অঞ্চলে গত সাত মাসে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে ৯৫টি কারখানা। এসব কারখানায় কাজ করতেন প্রায় ৬১ হাজার ৮৮১ জন শ্রমিক-কর্মচারী। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে— গাজীপুরে বন্ধ হয়েছে ৫৪টি কারখানা; নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী অঞ্চলে ২৩টি; সাভার-আশুলিয়া-ধামরাই এলাকায় ১৮টি তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

গাজীপুরের বন্ধ হওয়া ৫৪টি কারখানার প্রায় সবই তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতসংশ্লিষ্ট। শুধু এই জেলাতেই বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোতে প্রায় ৪৫ হাজার ৭৩২ শ্রমিক-কর্মচারী চাকরি হারিয়েছেন। এর মধ্যে বেক্সিমকো শিল্পপার্কের কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার কারণে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ— ২৭টি কারখানা বন্ধের ছয় মাসের হিসাব এবং ৯৫টি কারখানা বন্ধের সাত মাসের শিল্পাঞ্চলভিত্তিক হিসাব— একই উৎস ও একই পরিধির নয়। তাই দুটি সংখ্যা যোগ করে “১২২টি কারখানা বন্ধ” বলা সঠিক নয়। বরং এগুলো বাংলাদেশের শিল্প খাতের সংকটের দুটি ভিন্ন পরিসংখ্যান।

নাম পাওয়া যাচ্ছে যেসব বন্ধ কারখানার

প্রকাশ্য তথ্য ও শিল্প পুলিশের উদ্ধৃতি থেকে সাম্প্রতিক সময়ে বন্ধ হওয়া বেশ কয়েকটি কারখানার নাম পাওয়া গেছে।

গাজীপুর: গাজীপুরে বন্ধ হওয়া উল্লেখযোগ্য কারখানার মধ্যে রয়েছে— টিএমএস অ্যাপারেলস, নায়াগ্রা টেক্সটাইল, মাহমুদ জিন্স, হার্ডি টু এক্সেল, পলিকন লিমিটেড, অ্যাপারেল প্লাস, মাহমুদ জিন্স অ্যাপারেলস, টিআরজেড, দ্য ডেল্টা নিট। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত মাসে গাজীপুরে মোট ৫৪টি কারখানা বন্ধ হয়েছে।

সাভার-আশুলিয়া-ধামরাই: এই অঞ্চলে গত সাত মাসে স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া ১৮টি তৈরি পোশাক কারখানার মধ্যে উল্লেখযোগ্য— জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশন, বেস্ট ওয়ান সোয়েটার, এমএস সোয়েটার, সাভার স্পোর্টসওয়্যার, বার্ডা গ্রুপ, র‍্যামস ফ্যাশন অ্যান্ড এমব্রয়ডারি, প্রিয়াঙ্কা ফ্যাশন এবং জাভান টেক্স নিটওয়্যার। এসব কারখানা বন্ধ হওয়ার ফলে এ অঞ্চলে অন্তত ১০ হাজার ১২৭ শ্রমিক-কর্মচারী কর্মহীন হয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী: এই অঞ্চলে বন্ধ হওয়া কারখানার মধ্যে উল্লেখযোগ্য— গ্রিন বাংলা হোম টেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, এশিয়ান ফ্যালকন গার্মেন্টস, জিএল ফ্যাশন, মাস্টার টেক্সটাইল, ওয়েস্ট বেস্ট অ্যাটায়ার্স, এবং স্টার কাটিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং।

শিল্প পুলিশ জানিয়েছে, এই অঞ্চলে বন্ধ হওয়া বেশির ভাগ কারখানাই ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। আর্থিক সংকট ও পর্যাপ্ত ক্রয়াদেশের অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

গাজীপুরে স্থায়ীভাবে বন্ধ দুই কারখানা

সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে স্পষ্ট ও যাচাইকৃত স্থায়ী বন্ধের ঘটনা ঘটেছে গাজীপুরের বোর্ডবাজারে। ইউনিক ওয়াশিং অ্যান্ড ডাইং লিমিটেড এবং ইউনিক ডিজাইনার্স লিমিটেড গত ১৬ জুন থেকে বন্ধ থাকার পর স্থায়ীভাবে কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। আর্থিক সংকট ও অন্যান্য সমস্যার কারণে কারখানা দুটি বন্ধ করা হয়েছে বলে শিল্প পুলিশ জানিয়েছে।

দুটি কারখানা বন্ধ হওয়ায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় পড়েন। পরে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, সার্ভিস বেনিফিট ও অন্যান্য আইনগত পাওনা পরিশোধ নিয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে সমঝোতা হয়।

আশুলিয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ দুই কারখানা

গত ১ এপ্রিল আশুলিয়ার দুটি পোশাক কারখানা— ফ্যাশন ফোরাম লিমিটেড ও জেএ অ্যাপারেলস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। শ্রমিকদের অভিযোগ ছিল, সাম্প্রতিক শ্রম অসন্তোষের পর কারখানার ফটকে বন্ধের নোটিশ টানানো হয় এবং তাদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। দুটি কারখানা মিলিয়ে প্রায় ৪ হাজার শ্রমিক অনিশ্চয়তায় পড়েন। তবে এগুলো পরে পুনরায় চালু হয়েছে কিনা, সেই তথ্য নিশ্চিত না হওয়ায় এগুলোকে স্থায়ীভাবে বন্ধ কারখানার চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায় না।

লিথী গ্রুপের পাঁচ কারখানা একসঙ্গে বন্ধ

জুলাইয়ের শুরুতে গাজীপুরে লিথী গ্রুপের পাঁচটি পোশাক কারখানা একযোগে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এতে প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। এই ঘটনা দেখিয়েছে, শ্রমিক অসন্তোষ বা আর্থিক সংকট শুধু একটি কারখানার সমস্যা নয়; একটি শিল্পগোষ্ঠীর একাধিক কারখানাও একইসঙ্গে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে এসব কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণার পর পুনরায় চালু হয়েছে কিনা, সেটিও স্থায়ী বন্ধের হিসাব থেকে আলাদা করে যাচাই করা প্রয়োজন।

ইসলাম গার্মেন্টসও অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ

গাজীপুরে শ্রমিক অসন্তোষের জেরে ইসলাম গার্মেন্টস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এই ধরনের ঘটনা পোশাকশিল্পের আরেকটি দুর্বলতা তুলে ধরে— বেতন, সার্ভিস বেনিফিট বা অন্যান্য শ্রমসংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত সমাধান না হলে তা উৎপাদন বন্ধের দিকে গড়াতে পারে।

দুই বছরে বন্ধ ৪৫৭ শিল্প ইউনিট

গত দুই বছরের আরও বড় একটি হিসাব শিল্প খাতের গভীর সংকটের চিত্র তুলে ধরে। আগস্ট ২০২৪ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত দেশের সাতটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৪৫৭টি শিল্প ইউনিট স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ছিল— ১০৮টি বিজিএমইএ সদস্য কারখানা, ৩৫টি বিকেএমইএ সদস্য কারখানা, ৮টি বিটিএমএ সদস্য কারখানা এবং ১৯টি বেপজা-সংশ্লিষ্ট কারখানা। অর্থাৎ পোশাক, নিটওয়্যার, বস্ত্র ও রপ্তানিমুখী শিল্পের সঙ্গে যুক্ত উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রতিষ্ঠান এই বন্ধের তালিকায় রয়েছে। বাকি ২৮৭টি ছিল পোশাকবহির্ভূত শিল্প।

এই হিসাবে কারখানা বন্ধের প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, মালিকের আর্থিক সংকট, শ্রম অস্থিরতা এবং জ্বালানি সংকট। তবে শিল্পসংশ্লিষ্টরা ব্যাংকঋণের জটিলতা, কাঁচামালের সংকট, কারখানা স্থানান্তর, বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কথাও বলছেন।

নতুন সংকট: গ্যাস নেই, তাই উৎপাদন নেই

স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া কারখানার তালিকার বাইরেও এখন শিল্প খাতে নতুন একটি সংকট তৈরি হয়েছে—গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত করা। আগস্টের শুরুতে গাজীপুরে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় ১৭ থেকে ২০ শতাংশ শিল্পকারখানা তিন থেকে চার দিনের জন্য উৎপাদন বন্ধ বা ছুটি ঘোষণা করে। বিভিন্ন সূত্রে কারখানার সংখ্যা ৭০০ থেকে ৮০০ পর্যন্ত বলা হয়েছে।

সরকারি ছুটির সঙ্গে অতিরিক্ত ছুটি যুক্ত করে অনেক কারখানা কার্যত উৎপাদন বন্ধ রাখে। এতে হাজার হাজার শ্রমিক বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। কারখানার এই ছুটিকে স্থায়ী বন্ধ বলা যাবে না, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাস সংকট চললে এটি উৎপাদন কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ছুটি এবং শেষ পর্যন্ত শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

সর্বশেষ ময়মনসিংহের ভালুকা শিল্পাঞ্চলে তীব্র গ্যাস সংকটে ২০টি কারখানার শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকালে শ্রমিকরা কাজে যোগ দিলেও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দুপুরের খাবারের সময়ের মধ্যে ধাপে ধাপে তাদের ছুটি দেওয়া হয়।

শিল্প পুলিশ-৫ এর পুলিশ সুপার মো. আনছার উদ্দিন বলেন, ‘‘সকাল থেকে গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ায় কারখানাগুলোতে উৎপাদন চালানো সম্ভব হয়নি। শিল্পাঞ্চলের প্রধান কারখানাগুলোতে উৎপাদন গড়ে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। ভালুকা পৌর এলাকা ও তিতাস কার্যালয়ের আশপাশে গ্যাসের কিছুটা চাপ থাকলেও দূরবর্তী কারখানাগুলোতে প্রায় গ্যাস নেই।’’

শিল্প পুলিশের হিসাব অনুযায়ী ময়মনসিংহ শিল্পাঞ্চলে ২৯৩টি কারখানার মধ্যে ৯৯টি গ্যাসচালিত। বর্তমানে প্রায় সব গ্যাসচালিত কারখানাই সংকটে পড়েছে। জেনারেটর ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করে সীমিত উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে শিল্পাঞ্চলজুড়ে উৎপাদনব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বাংলা ট্রিবিউনকে  বলেন, ‘‘কারখানা বন্ধের প্রকৃত চিত্র বুঝতে হলে স্থায়ী বন্ধ, সাময়িক ছুটি এবং উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার ঘটনাগুলো আলাদা করে দেখতে হবে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কারখানা কয়েক দিনের জন্য ছুটি দিলেও এটিকে স্থায়ী বন্ধ বলা ঠিক হবে না। তবে দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি সংকট চলতে থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হবে, কারখানার আর্থিক চাপ বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।’’

তিনি বলেন, ‘‘গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। উৎপাদন কমে যাওয়ার পরও শ্রমিকদের বেতন, ব্যাংকঋণের কিস্তি, গ্যাস-বিদ্যুতের বিলসহ অন্যান্য স্থায়ী খরচ বহন করতে হচ্ছে। অন্যদিকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ডিজেল, এলপিজি বা সিএনজি ব্যবহার করলে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে। অথচ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে আগেই নির্ধারিত দামের কারণে এই অতিরিক্ত ব্যয় সব সময় পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করা সম্ভব হচ্ছে না।’’

মোহাম্মদ হাতেম আরও বলেন, ‘‘কারখানা টিকিয়ে রাখা এবং শ্রমিকের কর্মসংস্থান রক্ষা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জ্বালানি সংকট দ্রুত স্বাভাবিক না হলে অনেক দুর্বল ও আর্থিক সংকটে থাকা কারখানা আরও বেশি চাপে পড়বে। তাই শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংকটে থাকা, আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালুর জন্য আর্থিক সহায়তা ও নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন।’’

ছুটি কি শুধুই ছুটি, নাকি কর্মসংস্থান সংকোচনের শুরু?

শিল্প-মালিকদের একটি অংশের যুক্তি হলো— গ্যাস না থাকলে কারখানা খোলা রাখার অর্থই হয় না। শ্রমিক বসে থাকলেও বেতন দিতে হয়, কিন্তু উৎপাদন না হলে বিক্রি ও রফতানি আয় আসে না। অন্যদিকে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে বিকল্প উৎপাদনে গেলে ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে অনেক কারখানা বাধ্য হচ্ছে উৎপাদন কমাতে। কোথাও অতিরিক্ত শিফট বাতিল হচ্ছে, কোথাও শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠানো হচ্ছে, আবার কোথাও নতুন নিয়োগ বন্ধ রাখা হয়েছে।

এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সাময়িক ছুটি ধীরে ধীরে শ্রমিক ছাঁটাইয়ে রূপ নিতে পারে— এমন আশঙ্কা রয়েছে শ্রমিক সংগঠন ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

চার ধরনের বন্ধ, চার রকম প্রভাব

বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে কারখানাগুলোকে অন্তত চারটি ভাগে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, স্থায়ীভাবে বন্ধ কারখানা। এখানে শ্রমিকের চাকরি শেষ হয়ে যায়। বকেয়া মজুরি, সার্ভিস বেনিফিট ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে নতুন সংকট শুরু হয়।

দ্বিতীয়ত, অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ কারখানা। এখানে শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন কিনা, তা সব সময় পরিষ্কার নয়। কারখানা পুনরায় খুলতে পারে, আবার দীর্ঘ বন্ধের পর স্থায়ীভাবেও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

তৃতীয়ত, সাময়িক উৎপাদন বন্ধ বা ছুটি। গ্যাস, বিদ্যুৎ, কাঁচামাল বা ক্রয়াদেশের সংকটে কারখানা কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ উৎপাদন বন্ধ রাখতে পারে। এই সময়ে শ্রমিকের চাকরি টিকে থাকলেও আয় ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।

চতুর্থত, শ্রমিক ছাঁটাই। কারখানা চালু থেকেও উৎপাদন কমিয়ে শ্রমিক ছাঁটাই করা হতে পারে। ফলে শুধু বন্ধ কারখানার সংখ্যা দেখলে কর্মসংস্থান সংকটের পুরো চিত্র পাওয়া যায় না।

বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক এবং বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘গ্যাস ও বিদ্যুতের বর্তমান সংকটকে শুধু সাময়িক জ্বালানি সমস্যা হিসেবে দেখলে পরিস্থিতির গভীরতা বোঝা যাবে না। এটি ধীরে ধীরে বাংলাদেশের রফতানি শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থানের জন্য কাঠামোগত হুমকিতে পরিণত হচ্ছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘যেসব কারখানা ইতোমধ্যে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে, তাদের সংকটের পেছনে কমে যাওয়া ক্রয়াদেশ, আর্থিক দুরবস্থা, ব্যাংকঋণের চাপ ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির মতো একাধিক কারণ রয়েছে। এখন নতুন করে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হওয়ায় চালু কারখানাগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। অনেক কারখানা উৎপাদনের সময়সূচি পরিবর্তন করেছে। সরকারি ছুটির সঙ্গে অতিরিক্ত ছুটি সমন্বয় করেছে কিংবা সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালাচ্ছে। ফলে এগুলোকে এখনই স্থায়ী বন্ধ বলা না গেলেও দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে শ্রমিক ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধের ঝুঁকি আরও বাড়বে।’’

মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘‘কারখানা কয়েক দিনের জন্য বন্ধ রাখা এবং একটি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় উৎপাদন ব্যাহত হলে এই সাময়িক বন্ধও একসময় আর্থিক সংকটে রূপ নিতে পারে। উৎপাদন না হলেও শ্রমিকের বেতন, ব্যাংকঋণের সুদ, কারখানা রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য স্থায়ী খরচ বন্ধ থাকে না। অথচ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে ক্রেতার আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নতুন ক্রয়াদেশও কমে যেতে পারে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন শুধু নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করলেই হবে না; চলমান শিল্প ও বিদ্যমান কর্মসংস্থান রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে ছোট ও মাঝারি আর্থিক সক্ষমতার কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে। আর একটি কারখানা বন্ধ হওয়া মানে শুধু একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হারিয়ে যাওয়া নয়—এর সঙ্গে হাজার হাজার শ্রমিকের পরিবার, স্থানীয় অর্থনীতি এবং দেশের রফতানি সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’’

কারখানা বন্ধের অর্থ শুধু একটি তালা নয়

একটি কারখানা বন্ধ হওয়া মানে শুধু মালিকের ব্যবসা বন্ধ হওয়া নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে হাজার হাজার শ্রমিকের পরিবার, বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, ব্যাংক ও এনজিও ঋণ, স্থানীয় দোকানপাট এবং আশপাশের ক্ষুদ্র অর্থনীতি। গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে একটি কারখানা বন্ধ হলে তার প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের বাসা, দোকান, পরিবহন ও স্থানীয় বাজারে। আর সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় যখন শ্রমিক চাকরি হারানোর পরও তাঁর বকেয়া বেতন ও আইনগত পাওনা পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়।





Source link

×
📺

LIVE TV

Live Tv দেখতে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।

📺 লাইভ দেখুন
error: Content is protected !!
🔴 LIVE html