বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সম্পত্তি ভোগের অধিকার নিশ্চিত করতে পাস করা সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের বিরোধিতা করায় বিরোধী দলের নেতাদের কঠোর সমালোচনা করেছেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। শরিয়াহ আইনের দোহাই দিয়ে এই বিলের বিরোধিতা করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
চিফ হুইপ বলেন, ‘বিলটিতে শরিয়াহ আইন চালু করা হবে—এমন কোনও কথা নেই। একইসঙ্গে তার প্রশ্ন, শরিয়াহর দোহাই দেওয়া হলে প্রচলিত অন্য আইনগুলোও কি শরিয়াহ আইন অনুযায়ী হতে হবে? সন্তানরা বাবা-মায়ের কাছ থেকে সম্পত্তি নিয়ে পরে তাদের ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দেবে—এটা হতে পারে না।’
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রসঙ্গত, গত ৬ সেপ্টেম্বর দাতার জীবনকাল পর্যন্ত সম্পত্তির ভোগস্বত্ব সংরক্ষণ করে সন্তান, নাতি-নাতনি বা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরের সুযোগ রেখে ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬ সংশোধিত আকারে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। তবে বিলটি শরিয়াহ ও মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের সাংঘর্ষিক কি না, তা যাচাইয়ে ইসলামী আইন ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন কমিটির বিরোধীদলীয় সদস্যরা।
সংবাদ সম্মেলনে সম্পত্তি হস্তান্তর বিল প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, ‘বাবা-মা বৃদ্ধ বয়সে তাদের সম্পদ সন্তানকে দান বা হস্তান্তর করার পর অনেক সময় সন্তানরা তাদের দেখাশোনা করে না। এমনকি বাবা-মাকে ভিক্ষা করতে হয়, কিংবা বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে হয়। এই পরিস্থিতি থেকে তাদের সুরক্ষা দিতেই আইনটি করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘শরিয়াহ আইনের দোহাই দেওয়া হয়েছে। আমি আপনাদের কাছে প্রশ্ন করতে চাই, শরিয়াহ আইন চালু হবে, এ রকম কোনও কথা উনাদের লেখায় নেই। আপনারা যদি পাঠ করেন, তাহলে নিশ্চয় দেখবেন।’
চিফ হুইপ বলেন, ‘শরিয়াহ আইন চালু করবে না, অথচ সেই শরিয়াহ আইনের দোহাই দিয়ে কিন্তু বিলটার বিরোধিতা করছে।’
এর ব্যাখ্যায় তিনি প্রচলিত আইন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ‘দেশে ফৌজদারি আইনসহ বিভিন্ন আইন প্রচলিত রয়েছে, যেগুলো শরিয়াহ আইন নয়। ফলে একটি নির্দিষ্ট আইনের ক্ষেত্রে শরিয়াহর দোহাই দিয়ে আপত্তি জানালে প্রচলিত অন্য আইন নিয়েও একই প্রশ্ন তোলা যায়।’
বাবা-মায়ের অধিকার রক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে চিফ হুইপ বলেন, ‘সন্তানরা বাবা-মায়ের কাছ থেকে সম্পত্তি নিয়ে তাদের ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দেবে—এটা হতে পারে না। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের শেষ জীবনের নিরাপত্তা ও সম্পত্তি ভোগের অধিকার নিশ্চিত করতেই আইনটি করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘মা-বাবাকে সম্মান করা এবং তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে নিজেদের সম্পত্তি জীবদ্দশায় ভোগের অধিকার দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ এ ধরনের সুরক্ষা দেওয়ার আইন আগে ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।
ধর্মীয় দলগুলোর আপত্তির বিষয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, ‘জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনায় ৩৩টি দল অংশ নিয়েছে। কোনও একটি দল বা ব্যক্তি ইসলামি দলের পরিচয়ে বক্তব্য দিলেই সেটিকে সব ইসলামি দলের বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।’ এ সময় প্রচলিত আইন ও বিবাহসংক্রান্ত আইন নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন তোলেন তিনি।
৯ কার্যদিবসে ছয় বিল পাস
তৃতীয় অধিবেশনের কার্যক্রম তুলে ধরে চিফ হুইপ জানান, ৯ কার্যদিবসের এই অধিবেশনে ছয়টি বিল উত্থাপিত ও ছয়টি বিল পাস হয়েছে। কার্যপ্রণালি-বিধির ৬৮ বিধিতে দুটি নোটিশের ওপর আলোচনা হয়েছে। ৭১ বিধিতে ১৪টি নোটিশের ওপর আলোচনা হয়েছে। একই বিধির আরেক পর্যায়ে প্রায় ১২৪টি নোটিশের ওপর আলোচনা হয়েছে। ১৪৭ বিধিতে একটি এবং ৩০২ বিধিতে একটি নোটিশ উত্থাপিত হয়েছে।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী ১৫টি প্রশ্নের উত্তর সরাসরি দিয়েছেন এবং অধিবেশনে মোট ১ হাজার ৬৭৮টি প্রশ্নোত্তর হয়েছে।
গুম ও মানবাধিকার আইন নিয়ে ১৬ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা
গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার-সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের আগে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করার কথা তুলে ধরেন চিফ হুইপ। তিনি জানান, দুটি আইন নিয়ে ১৬ জন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। তাদের পরামর্শ ও মতামত নোট করা হয়েছে। পাশাপাশি আইনজীবী, বিচারক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র করতে দুই থেকে আড়াই বছর লাগে
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়ে আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে চিফ হুইপ বলেন, ‘লং মার্চ করে যদি বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করা যেত, গ্যাস সমস্যার সমাধান করা যেত, তবে সবার আগে আমরা লং মার্চ করতাম। ২০০ বা ৫০০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র করতে ন্যূনতম দুই থেকে আড়াই বছর সময় লাগে।
১০১টি এমওইউ পর্যালোচনা হচ্ছে
চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি ‘বন্ধুরাষ্ট্রের’ জাহাজকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তি বাতিলের বিষয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, সরকারের করা ১০১টি এমওইউ নিয়েই আলোচনা ও পর্যালোচনা চলছে। এর ফল দ্রুত জানানো হবে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমরা ১০১টা এমওইউ নিয়েই আলোচনা করছি এবং সেটা অতি শিগগিরই ফল আপনারা পাবেন।’
বিরোধী দলের সঙ্গে দূরত্ব বাড়েনি
সংসদ কার্যকর করার বিষয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, ‘সরকারি দল ও বিরোধীদলের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়েনি; বরং দুই পক্ষ কাছাকাছি এসেছে। বিরোধীদলের নেতা একটি ‘ন্যারেটিভ’ তৈরির চেষ্টা করছেন।’
লংমার্চের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, লং মার্চ করে যদি বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করা যেত, তাহলে সরকারই আগে লংমার্চ করতো।’