লিপস্টিক সাজের অন্যতম পরিচিত অনুষঙ্গ। কেউ হালকা রং পছন্দ করেন, কেউ আবার গাঢ় রঙের। কিন্তু ঠোঁটে লাগানো এই প্রসাধনী নিয়ে মাঝেমধ্যেই নানা সতর্কবার্তা ছড়ায়—লিপস্টিকে নাকি সিসা, ক্যাডমিয়াম বা ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতু থাকে, যা শরীরে ঢুকে ক্যানসারসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিষয়টি কি সত্যিই এতটা ভয়ংকর?
উত্তরটা একটু জটিল। কিছু লিপস্টিকে ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে গবেষণা হয়েছে এবং কিছু নমুনায় অনুমোদিত সীমার বেশি ধাতুও পাওয়া গেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে লিপস্টিক ব্যবহার করলেই ক্যানসার হবে। ঝুঁকি নির্ভর করে কোন পদার্থ কত পরিমাণে আছে, কত ঘন ঘন ব্যবহার হচ্ছে এবং শরীরে তার কতটা প্রবেশ করছে—এসব বিষয়ের ওপর।
লিপস্টিকে ভারী ধাতু আসে কীভাবে?
লিপস্টিকে ব্যবহৃত রং ও অন্যান্য কাঁচামালের সঙ্গে সিসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, নিকেলসহ বিভিন্ন ধাতু অনিচ্ছাকৃতভাবে মিশে যেতে পারে। এগুলো সবসময় ইচ্ছাকৃত উপাদান নয়; কাঁচামাল বা উৎপাদনপ্রক্রিয়ার দূষণ হিসেবেও থাকতে পারে।
বিভিন্ন দেশের বাজারের লিপস্টিকে এসব ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ২০১৫ সালের একটি গবেষণায় মালয়েশিয়ার বাজারের বিভিন্ন লিপস্টিক পরীক্ষা করে সিসা, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়াম পাওয়া যায়। তবে গবেষকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিশ্লেষণে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এসব ধাতুর কারণে তাৎক্ষণিক অ-ক্যানসারজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশের বাজার নিয়েও গবেষণা হয়েছে। ঢাকার বাজার থেকে সংগ্রহ করা ১৮টি লিপস্টিক পরীক্ষা করে গবেষকেরা সিসা, আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, নিকেল, তামা ও দস্তাসহ বিভিন্ন উপাদান পেয়েছেন। কিছু নমুনায় ক্রোমিয়ামের মাত্রা প্রসাধনীর জন্য নির্ধারিত সীমার ওপরে ছিল। তবে ত্বকের মাধ্যমে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ক্যানসার বা অ-ক্যানসারজনিত ঝুঁকি পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ লিপস্টিকে ভারী ধাতু পাওয়া যেতে পারে—এটি সত্য; কিন্তু সেখান থেকে সরাসরি ‘লিপস্টিক ক্যানসার করে’ বলা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়।
সিসা নিয়ে এত কথা কেন?
সিসা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। তাই প্রসাধনীতে এর উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক। তবে এখানে পরিমাণটিই গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) শত শত লিপস্টিক ও অন্যান্য প্রসাধনী পরীক্ষা করেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পরীক্ষা করা ৯৯ শতাংশের বেশি কসমেটিক লিপ প্রোডাক্টে সিসার মাত্রা ছিল প্রতি মিলিয়নে ১০ অংশের নিচে। প্রসাধনীতে অনিচ্ছাকৃত অশুদ্ধি হিসেবে সিসার জন্য ১০ পিপিএম পর্যন্ত মাত্রাকে এফডিএ সুপারিশকৃত সর্বোচ্চ সীমা হিসেবে বিবেচনা করে।
এফডিএর হিসাবে, লিপস্টিকের সিসা শরীরে প্রবেশের সম্ভাব্য প্রধান পথ হলো ঠোঁট চেটে বা অন্যভাবে অল্প পরিমাণ লিপস্টিক গিলে ফেলা। ত্বকের মাধ্যমে সিসা শোষিত হওয়ার পরিমাণ খুবই কম।
তাই ‘সিসা’ শব্দটি দেখলেই আতঙ্কিত হওয়ার বদলে বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড, মান নিয়ন্ত্রণ ও অনুমোদিত পণ্য বেছে নেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ঠোঁট কালচে হওয়ার জন্য শুধু লিপস্টিককে দায়ী করা যাবে?
না। লিপস্টিকের কোনও উপাদানে অ্যালার্জি বা জ্বালাপোড়া হলে ঠোঁটে প্রদাহ তৈরি হতে পারে। পরে সেই জায়গার রং গাঢ় হয়ে যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে পিগমেন্টেড কনট্যাক্ট চিলাইটিস বলা হয়।
ডার্মনেটের তথ্য অনুযায়ী, লিপস্টিক ও অন্যান্য লিপ কসমেটিক থেকে অ্যালার্জিক বা ইরিট্যান্ট কনট্যাক্ট চিলাইটিস হতে পারে। সুগন্ধি, ফ্লেভারিং, রং, কিছু তেল ও সংরক্ষণকারী উপাদান এর কারণ হতে পারে।
তাই লিপস্টিক ব্যবহারের পর দীর্ঘদিন জ্বালা, চুলকানি, শুষ্কতা, ফেটে যাওয়া বা অস্বাভাবিক কালচে দাগ দেখা দিলে সেটিকে শুধু লিপস্টিকের রং বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
গাঢ় রঙের লিপস্টিক কি বেশি ক্ষতিকর?
গাঢ় রঙের লিপস্টিক মানেই বেশি ক্ষতিকর—এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। রঙের গাঢ়ত্ব নয়, বরং কোন রঞ্জক ও অন্যান্য উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেগুলোর মান কেমন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৪ সালের একটি গবেষণায় ঘানার বাজারের ১২টি লিপস্টিক পরীক্ষা করে ক্রোমিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, নিকেল, তামা, ক্যাডমিয়াম ও সিসাসহ বিভিন্ন ধাতু পাওয়া যায়। কিছু নমুনায় নির্ধারিত সীমার বেশি ধাতুও ছিল। তবে গবেষকদের তাৎক্ষণিক অ-ক্যানসারজনিত ঝুঁকি মূল্যায়নে ঝুঁকির মাত্রা একের নিচে ছিল। দীর্ঘমেয়াদি ও বেশি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা এবং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন গবেষকেরা।
লিপস্টিক কেনার সময় কী করবেন?
উপাদানের তালিকা দেখুন। প্যাকেটের গায়ে উপাদানের তালিকা, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও মেয়াদের তথ্য আছে কি না খেয়াল করুন।
সন্দেহজনক পণ্য এড়িয়ে চলুন। নকল বা অননুমোদিত প্রসাধনীতে কাঁচামাল ও মান নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা বেশি থাকতে পারে।
অস্বস্তি হলে ব্যবহার বন্ধ করুন। ঠোঁটে জ্বালা, চুলকানি, ফোলা, ফেটে যাওয়া বা দীর্ঘস্থায়ী রং পরিবর্তন হলে ওই পণ্য ব্যবহার না করাই ভালো।
মেকআপ পরিষ্কার করে ঘুমান। ঘুমানোর আগে লিপস্টিক পরিষ্কার করে ময়েশ্চারাইজিং লিপ বাম ব্যবহার করতে পারেন। দিনের বেলায় বাইরে গেলে এসপিএফযুক্ত লিপ প্রোডাক্টও ব্যবহার করা যায়।
শেষ কথা
লিপস্টিক নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই, আবার একে একেবারে ঝুঁকিমুক্ত বলারও সুযোগ নেই। গবেষণায় কিছু প্রসাধনীতে ভারী ধাতু ও অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তবে ‘লিপস্টিকে নির্দিষ্ট কয়েকটি উপাদান থাকলেই ক্যানসার হবে’—এমন সরল সিদ্ধান্তের পক্ষে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
তাই নিরাপদ ও মানসম্মত প্রসাধনী বেছে নিন, সন্দেহজনক পণ্য এড়িয়ে চলুন এবং ব্যবহারের পর অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিন। সাজের পাশাপাশি কী ব্যবহার করছেন, সেটাও জানা জরুরি।